দেশে দীর্ঘমেয়াদি করোনার শিকার ১৫ শতাংশ মানুষ!

নিউজ ডেস্কঃদেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ার করে বলছেন, কোভিড তো বটেই, নতুন করে উদ্বেগের বিষয় হতে যাচ্ছে লং কোভিড।

তারা বলছেন, কোভিড পরবর্তী সময়েও নানা ধরনের শারীরিক জটিলতাই মূলত লং কোভিডের লক্ষণ আর বাংলাদেশে কোভিড আক্রান্তদের এক বড় অংশের মধ্যেই নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা গেছে।

সম্প্রতি দেশে করা এক গবেষণায় বলা হচ্ছে, যারা কোভিড আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশের মধ্যে লং কোভিডের উপসর্গ রয়েছে।

টেলিফোনে কথা বলার সময় এমন অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছিলেন নিলুফা আজাদী। বলছিলেন, গত বছরের অগাস্টের ১০ তারিখে কোভিড পজিটিভ হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি।

মূলত কোভিড আক্রান্ত স্বামীর সেবা করতে গিয়ে নিজেও আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি।

তার ফুসফুসের ৭৫% শতাংশ সংক্রমিত হয়েছিল।

কিছুদিন পর পরীক্ষা করে তার কোভিড নেগেটিভও আসে। তবে কোভিড ভাল হলেও শুরু হয় নতুন ধরনের শারীরিক সমস্যা।

কোভিড পরবর্তী সময়েও দীর্ঘদিন ধরে তাকে শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভুগতে হয়েছে। এমনকি কোভিডের পরেও টানা নয় মাস তাকে শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য অক্সিজেন নিতে হয়েছে।

“দু’মাস আগেও আমি অক্সিজেন নিয়েছি। অর্থাৎ প্রায় নয়মাস ধরে আমি অক্সিজেন নিয়েছি।”

কোভিডের পরও প্রচণ্ড শরীর ব্যথায় ভুগতে থাকেন তিনি। “হাতে-পায়ে প্রতিটা জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যথা এখনো,” বলেন তিনি।

সেই সাথে তার শরীরও ফুলে যায়।

“আমার শরীর যা, ফুলে তার ডাবল হয়ে যায়। আমার হাঁটা-চলা বন্ধ হয়ে যায়,” বলেন নিলুফা আজাদী।

চলতি বছরের মার্চে কোভিডে আক্রান্ত হয়েছিলেন মইনুর সুলতানা। কোভিড সেরে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে দুর্বলতায় ভুগেছেন তিনি। সাথে ছিল শরীরে ব্যথাও।

মইনুর সুলতানা জানান, কোভিডের পর তার মাথার বেশিরভাগ চুলই পড়ে গেছে।

“গোছায় গোছায় এক গাদা করে চুল পড়েছে। এখনো পড়ছে,” বলেন তিনি।

নিলুফা আজাদী এবং মইনুর সুলতানা যে ধরণের সমস্যায় ভুগছেন একে বলা হচ্ছে লং কোভিড।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ব জুড়েই কোভিডের পর এখন এই লং কোভিড মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ মেয়াদে লং কোভিড মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকরহয়ে উঠতে পারে।

দেশের যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৭ জন গবেষকদের একটি দল লং কোভিড নিয়ে গবেষণা করেছেন।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. মোঃ. ফিরোজ কবির যিনি এই গবেষণায় অংশ নিয়েছেন তিনি জানান, ২০২০ সালের মে মাস থেকে শুরু করে এ বছরের মে মাস পর্যন্ত এক বছর ধরে এই গবেষণা চালানো হয়েছে।

বাংলাদেশের দুই হাজারের বেশি কোভিড রোগীর উপর গবেষণাটি করেছেন তারা। এতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ১৫ শতাংশ কোভিড রোগী লং কোভিডে ভুগছেন।

তিনি জানান, যুক্তরাজ্যে মোট আক্রান্ত কোভিড রোগীদের মধ্যে এই হার বাংলাদেশের তুলনায় কম। সেখানে ১০ শতাংশের কিছু বেশি রোগীর মধ্যে লং কোভিডের উপসর্গ পাওয়া গেছে মাত্র।

কবির লং কোভিডের বিভিন্ন উপসর্গ ব্যাখ্যা করে বলেন, এ ক্ষেত্রে, মাথাব্যথা, ভুলে যাওয়া, শরীর ব্যথা, দুর্বলতা, হৃৎস্পন্দনের ওঠানামার মতো উপসর্গ থাকে।

আর এটি তিন মাস থেকে শুরু করে দেড় বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

কবির জানান, কোভিডের ক্ষেত্রে বলা হয় যে, যাদের বয়স বেশি কিংবা আগে থেকেই কোন ধরনের শারীরিক সমস্যা থাকে তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। তবে তিনি বলেন লং কোভিডের এই যুক্তি সবসময় খুব একটা কাজ করে না।

তাদের গবেষণা অনুযায়ী, মধ্যবয়সীদের মধ্যেই লং কোভিডের উপসর্গ বেশি পাওয়া যায়। ৩০ থেকে শুরু করে ৫৫ বছর বয়স পর্যন্ত মানুষের মধ্যে লং কোভিডে ভোগার প্রবণতা বেশি।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, আমাদের দেশে এই শ্রেণির মানুষই মূলত “ওয়ার্কিং ক্লাস” অর্থাৎ এই বয়সীরাই সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করে থাকে এবং অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে। লং কোভিডের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তাই অর্থনীতিতেও পড়বে বলে মনে করেন তিনি।

কবির জানান, সাধারণত কোভিড নারীদের তুলনায় পুরুষদের বেশি হয়, কিন্তু লং কোভিডের ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো। লং কোভিডে আক্রান্তের প্রবণতা পুরুষের চেয়ে নারীদের মধ্যে বেশি।

এর কারণ হিসেবে তারা ধারণা করছেন যে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা শারীরিক কর্মকাণ্ডে কম অংশ নেয়া এবং পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার পুরুষদের তুলনায় কম গ্রহণ করার সম্পর্ক থাকতে পারে।

তবে বিষয়টি নিয়ে তারা এখনো গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লং কোভিড মানুষের শারীরিক ও মানসিক-দুই ক্ষেত্রেই ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

তারা বলছেন, কোভিড আক্রান্ত মানুষ সুস্থ হওয়ার অনেক দিন পর্যন্ত তার শরীরে নানা ধরনের শারীরিক অসুস্থতা থাকে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, লং কোভিডের কারণে মানুষের স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তিনি বলেন, এসময় তার ঘুম কম হতে পারে, মাঝে অনেক বেশি উত্তেজিত হয়ে যায় আবার অনেক সময় হতাশ হয়ে যায়। একে বলা হয় ভাবনার ওঠানামা।

“কখনো রাগ খুব বেড়ে যায়, কানে ঝি ঝি শব্দ করে, মাথা ঘোরে, বমি ভাব হয়, বুক ধড়ফড় করে-এগুলো স্নায়ুতন্ত্রীয়,” বলেন চৌধুরী।

এছাড়া বংশগত রোগ থাকলে সেটিও প্রকাশিত হয় লং কোভিডের কারণে।

চৌধুরী বলেন, “যেমন কারো আগে হয়তো ডায়াবেটিস ছিল না, কিন্তু তার বংশে রোগটি ছিল। অর্থাৎ তিনি সুপ্ত রোগী ছিলেন। লং কোভিডের কারণে এটি প্রকাশ হতে পারে। একই রকম ঘটনা ঘটতে পারে উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রেও।”

এছাড়া হার্টের প্রদাহ, মাসের পর মাস ধরে ফুসফুসের প্রদাহ, বিনা কারণেই দুর্বলতা, চুল ঝরে যাওয়া, ওজন বেড়ে যাওয়া বা একেবারে কমে যাওয়ার মতো উপসর্গও দেখা যায়।

চৌধুরী বলেন, চিকিৎসা ক্ষেত্রে বর্তমানে একটি বিষয় আলোচনায় উঠে এসেছে। আর সেটি হচ্ছে, পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের সমস্যা।

তিনি বলেন, পুরুষদের যেহেতু কোভিড বেশি হয়। একটি বিশেষ সময়ের পরে তাদের শুক্রাণুর কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। যার কারণে বন্ধ্যত্বের সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে জানান তিনি।

নারীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রভাব আছে কিনা সে বিষয়েও গবেষণা চলছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এ পর্যন্ত ১১ লাখের বেশি মানুষ কোভিড আক্রান্ত হয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here