বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার বন্ধে ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিনিধিঃদেশে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার বাড়ছে। খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধী কর্মকা-ের মাধ্যমে অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণের জন্য বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে সারাদেশে লাইসেন্স বা অনুমোদন প্রাপ্ত প্রায় ২ লাখ বৈধ অস্ত্র রয়েছে। তবে ওসব বৈধ অস্ত্রের মালিকদের পরিচয় সুনির্দিষ্টভাবে কোনো ডিলারের কাছে সংরক্ষিত নেই। গত ৮ বছরে সারাদেশ থেকে বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে প্রায় ৪ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। আর ওই সময়ে সারাদেশে ৫ শতাধিক বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রধারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে। ৩ শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছে। তার মধ্যে দেড় শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশজুড়েই বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার বন্ধে দেশের সকল আগ্নেয়াস্ত্রের ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আর অপরাধীর পরিচয় জানতে অটোমেটেড ব্যালেস্টিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (আবিস) নামের একটি সফটওয়্যারের প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিচ্ছে পুলিশ।  বৈধ অস্ত্রের ডাটা তৈরিতে সিআইডি দেশের ৬৪ জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করবে। সেজন্য দেশের সব জেলার সিআইডির বিদ্যমান অফিসে বৈধ অস্ত্রের মালিকরাও অস্ত্রের নমুনা দিতে পারবে। প্রতিটি আগ্নেয়াস্ত্রেরই কিছু স্বতন্ত্র কোড আছে। যা অনেকটা মোবাইল ফোনের আইএমইআই-এর মতো। তাতেই অস্ত্রের ধরন কী বোঝা যায়। নতুন করে কোন অস্ত্র কিনলে এখন থেকে সঙ্গে সঙ্গে ওই অস্ত্রের কোড সিআইডিকে দেয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের জানানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য, আধিপত্য বিস্তার, পূর্ব শত্রুতা, জমিজমার বিরোধ, ছিনতাই, ডাকাতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের পাশাপাশি বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারের অভিযোগের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। প্রভাবশালী রাজনীতিক থেকে শুরু করে শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, ঠিকাদারসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষজনের আত্মরক্ষার্থে যে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে, তা অপরাধ জগতে চলে যাওয়ার তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে। এমনকি বৈধ অস্ত্র অবৈধভাবে ভাড়াও দেয়া হচ্ছে। আর প্রকাশ্যে ওসব অস্ত্র উঁচিয়ে একদিকে যেমন ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে, তেমনি চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, এমনকি সরকারী উচ্ছেদ অভিযান ঠেকাতেও ব্যবহার হচ্ছে। ওসব অস্ত্র দিয়ে খুনের ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু নির্বাচনে বৈধ অস্ত্রের অবৈধ মহড়া দেখা গেছে। রাজনৈতিক দলের পদ-পদবি ব্যবহার করে অনেকেই সরকারি নিষেধাজ্ঞা না মেনে জেলা/উপজেলা শহরের সরকারি অফিসে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের চিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়েছে অবৈধ অস্ত্রও।
সূত্র জানায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগ্নেয়াস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার বন্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কারণ অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবসায়ীরা তৎপর হয়ে উঠে। সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশে অস্ত্র ঢুকে। আবার কখনো সীমান্তে কর্মরত বেশ কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতাতেও চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আসা হয়। সীমান্ত পার হলেই ওসব মারণাস্ত্র সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, জঙ্গী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, উগ্রপন্থী, জঙ্গী গোষ্ঠীসহ অপরাধ জগতে চলে যাচ্ছে। সীমান্ত পেরিয়ে দেশে আসা অস্ত্র পরবর্তীতে সারাদেশে ওসব অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ছে। অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীরা আবারো তৎপর। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করলেও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানি কমছে না।
সূত্র আরো জানায়, চট্টগ্রাম মহানগরের লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের এক রাজনীতিকের দুটি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে ওই রাজনীতিক অবৈধ কর্মকা- পরিচালনা করছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র বাতিল সংক্রান্ত নির্দেশনা দেয়া হয়। তারপর ওই রাজনীতিকের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করে আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়। তাছাড়া সারাদেশে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি। গ্রাম থেকে শহরের অলিগলিতে প্রায়ই অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। গুলি করে অহরহ চুরি, ছিনতাই হচ্ছে। পাড়া-মহল্লার ঝগড়া-বিবাদে গুলির ঘটনা ঘটছে। কিশোর গ্যাংয়ের হাতে অস্ত্র মিলছে। মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের নেটওয়ার্ক ঠিক রাখতে অস্ত্র ব্যবহার করছে। আর সন্ত্রাসী, আন্ডারওয়ার্ল্ডের হাতে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি তো পুরনো বিষয়। তাছাড়া যেই আগ্নেয়াস্ত্র আত্মরক্ষার্থে ব্যবহারের কথা, ওই আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারে প্রতিপক্ষের হতাহতের ঘটনা ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশে বিগত ১০ বছরে বিক্রি হওয়া সব আগ্নেয়াস্ত্রের তথ্যের হিসাব নেয়া হচ্ছে। আর সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অস্ত্রের ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)। গত ১০ বছরে দেশে যতো অস্ত্র বিক্রি হয়েছে সেসবের যাবতীয় তথ্য অস্ত্র ব্যবসায়ীদের কাছে চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ আর্মস ডিলার এ্যান্ড ইম্পোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবসায়ীদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে, এখন থেকে অস্ত্র বিক্রির সময় যতো টেস্ট করা হবে সব টেস্টের নমুনাও (গুলির খোসা) সিআইডিকে দিতে হবে। সিআইডি সেটা তাদের ডাটাবেজে সংরক্ষণ করবে।
অন্যদিকে সিআইডি সংশ্লিষ্টদের মতে, অটোমেটেড ব্যালিস্টিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এবিআইএস) নামে সিআইডির একটি সফটওয়্যার আছে। ওই সফটওয়্যারের অধীনে সারাদেশে যতো লাইসেন্স করা অস্ত্র আছে সেসব অস্ত্রের ডাটাবেজ করা হবে। প্রত্যেকটি অস্ত্রেরই একটি ইউনিট ফিচার আছে। ওই ফিচারকে সিআইডির ডাটাবেজে স্টোর করে রাখা হবে। সিআইডি যখন কোন ক্রাইম সিনে যাবে তখন সেখানে গুলির ঘটনা ঘটলে প্রথমেই জানার চেষ্টা করা হবে সেটি বৈধ না অবৈধ অস্ত্র। কিন্তু কোন ডাটাবেজ না থাকার কারণে সেটা বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন সিস্টেম কার্যকর করা হলে সহজেই বের করা যাবে যে অস্ত্র থেকে গুলি করা হয়েছে সেটি বৈধ নাকি অবৈধ। আর বৈধ অস্ত্র হলে সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রের মালিককে তলব করে তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করা যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here