নাচতে নাচতে মৃত্যু: ৫০০ বছর আগে এসেছিল এই মহামারি

নিউজ ডেস্কঃনৃত্য বা নাচ বিনোদনের খোঁড়াক মেটাতে এক অনন্য উপাদান। যে কাউকে মুহূর্তেই মুগ্ধ করতে পারে একটি সুন্দর নাচ। তবে শরীর দুলিয়ে নানান অঙ্গভঙ্গি শুধু বিনোদন নয় বরং মৃত্যুদূত হয়ে এসেছিল মানুষের কাছে। ১৫১৮ সালের সেই দিনটি ছিল অন্যান্য দিনের মতোই। তবে ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গ শহরের সেই সকালটা খানিকটা বদলে যেতে থাকে যখন রাস্তায় নেমে নাচতে শুরু করলেন এক দল মানুষ!

নৃত্যরত নর-নারী ঢলে পড়ছে মৃত্যুর কোলে, নাচতে নাচতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে পুরো শহরভর্তি লোক, তবু থামছে না! এরকম দৃশ্য কি কখনো কল্পনা করেছেন? তবে কল্পনা না করলেও এমন একটি ঘটনা ঘটেছে বাস্তবেই! ১৫১৮ সালে ফ্রান্সে ঘটেছিল এরকম এক রহস্যপূর্ণ, অথচ অমীমাংসিত ঘটনা! হঠাৎই সবকিছু কি এক যাদুর ছোঁয়ায়  বদলে যেতে লাগলো!

 ফ্রাউ ত্রাফেয়া নামের এক নারী হঠাৎ শহরের রাস্তায় নেমে এলেন নাচতে নাচতে

ফ্রাউ ত্রাফেয়া নামের এক নারী হঠাৎ শহরের রাস্তায় নেমে এলেন নাচতে নাচতে

প্রায় ৫০০ বছর আগে এই মহামারি ছড়িয়ে পড়েছিল ফ্রান্স-এ। রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা ফরাসি শহর স্টারসবুর্গে,  নয় নয় করে কয়েক হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবে আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। রোগীরা যতক্ষণ না তাদের প্রাণ চলে যেত, ততক্ষণ নেচেই যেতেন। শুরুটা হয়েছিল খুব স্বাভাবিকভাবেই! ফ্রাউ ত্রাফেয়া নামের এক নারী হঠাৎ শহরের রাস্তায় নেমে এলেন নাচতে নাচতে। আপাতদৃষ্টিতে এটাকে পাগলামিই বলা যায়। কিন্তু দৃশ্যপট বদলে গেল খানিক পরেই। একে একে নৃত্যরত ত্রাফোয়ার দল ভারী হতে লাগলো। একে একে তার চারপাশের সবাই যোগ দিল তার নাচে। আর খুব দ্রুতই অবস্থা চলে গেলো আয়ত্বের বাইরে।

পুরো দেশে এই রোগ মহামারি হয়ে দেখা দিল

পুরো দেশে এই রোগ মহামারি হয়ে দেখা দিল

কল্পকাহিনীর মতো শোনালেও এই ঘটনা সম্পূর্ণ বাস্তব। সেই নাচ শুরু হলো ঠিকই, শেষ হবার নাম ছিল না কোনো। একটানা ১ সপ্তাহ চলার পর, ভিন্ন জায়গা থেকে আসা আরো ৩৪ জন যোগ দিল এই নাচে। একমাসে এই সংখ্যাটা দাঁড়ালো ৪০০ জনেরও বেশি মানুষে! ৪০০ জন মানুষ একটানা একসঙ্গে শুধু নেচেই যাচ্ছেন, সম্পূর্ণ বিরতিহীনভাবে। কেন এরকম হচ্ছে কেউ জানেন না, কেউ বুঝতে পারছেন না, কোনো এক অদৃশ্য শক্তি তাদের নাচিয়ে নিচ্ছে, শুধু নেচেই যাচ্ছেন তারা!

মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত মানুষ নাচতে থাকল

মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত মানুষ নাচতে থাকল

নৃত্যের মিছিল ধীরে ধীরে মৃত্যুর মিছিলে পরিণত হয়। যখন রাস্তায় একটানা নাচতে নাচতে মারা যায় এক ডজনেরও বেশি মানুষ! এদের বেশিরভাগই মারা যায় একটানা নাচার ফলে ডিহাইড্রেশনে, স্ট্রোকে এবং ক্লান্তিতে। আশ্চর্যের বিষয়, সর্বপ্রথম নাচ শুরু করা নারী ফ্রাউ ত্রাফেয়া তখনো বেঁচে ছিলেন এবং নেচে চলেছিলেন! দীর্ঘ একমাস বিরামহীন নাচতে থাকেন তিনি। একমাস পর নৃত্যদলের শেষ মানুষ হিসেবে তিনিও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন।

৪০০ জন মানুষ একটানা একসঙ্গে শুধু নেচেই যাচ্ছেন, সম্পূর্ণ বিরতিহীনভাবে, এর কারণ এখনো বের করতে পারেননি কেউ

৪০০ জন মানুষ একটানা একসঙ্গে শুধু নেচেই যাচ্ছেন, সম্পূর্ণ বিরতিহীনভাবে, এর কারণ এখনো বের করতে পারেননি কেউ

তবে ঠিক কেন এমনটা হয়েছিল সে বিষয়ে পরিষ্কার কোনো বিশ্লেষণ এখনো পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর কারণের নেই কোনো সঠিক তথ্য প্রমাণ। শুধু বুদবুদ হয়ে রয়েছে কিছু ধারণা। ইতিহাসবিদ জন ওয়ালার এর ধারণা, এমনটা হয়েছিল মূলত শহরের সব মানুষের মানসিক ভাঙনের জন্য। শহরটি এরইমধ্যেই অনেক বেশি সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলো। শহরের মানুষেরা ক্ষুধায় কাতর ছিল এবং রোগশোকে আক্রান্ত ছিল শহরের বেশিরভাগ মানুষ। কাজেই তারা একসঙ্গে ভেঙে পড়েছিল, এরকম মানসিক ভাঙনের ফলেই এক ধরনের মনোবৈকল্যের শিকার হয়ে তারা এমন নাচ শুরু করেছিল, নিজেদের অজান্তেই।

একটানা ১ সপ্তাহ চলার পর, ভিন্ন জায়গা থেকে আসা আরো ৩৪ জন যোগ দিল এই নাচে

একটানা ১ সপ্তাহ চলার পর, ভিন্ন জায়গা থেকে আসা আরো ৩৪ জন যোগ দিল এই নাচে

কিন্তু মানসিক ভাঙন থেকে মনোবৈকল্য একসঙ্গে সবার হবে কেন ? প্রশ্ন থেকেই যায়। আরেকটি জনপ্রিয় ধারণা হচ্ছে, এরগট ফাঙ্গাস নামে এক প্রজাতির ফাঙ্গাস এই ঘটনার জন্য দায়ী। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এরগট ফাঙ্গাস বিষাক্ত একটি ফাঙ্গাস হওয়ার কারণে মানুষ নাচতে শুরু করবার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়াটা ছিল খুব স্বাভাবিক! এই ফাঙ্গাসের আক্রমণ মানুষকে এতক্ষণ ধরে নাচের শক্তি দিত না।

তাহলে, এই ধারণাটিতেও আসলে কিছুই পরিষ্কার হয় না। ঠিক কেন শুরু হয়েছিল এই নাচ এবং ঠিক কি কারণে একটানা নাচতে নাচতে মৃত্যু হলো এতগুলো মানুষের, এই রহস্য আজো অজানা। বিশেষজ্ঞরা এর নাম দিয়েছেন ড্যান্সিং প্লেগ! তবে কি এটি শুধুই একটি ছোঁয়াছে রোগ বা প্লেগ? এই ঘটনায় হয়তো বিশেষজ্ঞদের অনুমানই সঠিক, অথবা হয়তো এর পেছনে রয়েছে অমীমাংসিত কোনো রহস্য!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here