হারিয়ে যাচ্ছে পিঁড়িতে বসা ‘হাঁটুর সেলুন’

কুমিল্লা প্রতিনিধি:এক সময় শীলবাড়ি, গায়ের বাজার, খেয়াঘাট, আর বট বৃক্ষের ছায়ায় বসিয়ে চুল দাঁড়ি কাটার কাজ করতেন নাপিত বা নরসুন্দর। তখন শুধু ধানের বিনিময় চুল-দাড়ি কেটে দিতেন। নাপিতরা একটি কাঠের বাক্সে তাদের যন্ত্রপাতি রাখতেন। যার মধ্যে ক্ষুর, কাঁচি, চিরুনি, সাবান, ফিটকারি, পাউডার ও লোশন থাকতো।

এগুলো দিয়ে মানুষকে সুন্দর করার কাজ করতেন তারা। বসাতেন জল চৌকি কিংবা পিঁড়িতে। গলায় সাদা কাপড় পেঁচিয়ে মাথাকে দুই হাঁটুর মাঝে ঢুকিয়ে পিতলের চিরুনি আর কাঁচি দিয়ে কচ কচ করে কাটতেন চুল। মোটা চুলের ব্রাশে লোশন মেখে ফেনা তোলে পাতি ক্ষুর দিয়ে করা হতো সেভ। এভাবে পিঁড়িতে বসিয়ে গ্রামবাংলার মানুষের চুল-দাড়ি কাটার সেই পরিচিত দৃশ্য এখন আর সচরাচর চোখে পড়ে না।

নব্বই দশকেও ওদের দেখা যেত। এখন আর সহসা সেই নাপিতদের দেখা মিলে না। সভ্যতার বির্বতনে মানব জীবনের গতিধারায় এসেছে পরিবর্তন, লেগেছে নতুনত্বের ছোঁয়া। জেন্স পার্লারগুলোতে বাহারি রংঙের হেয়ার স্টাইলের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে হাট- বাজারে পিঁড়িতে বসা ‘হাঁটুর সেলুন’। এখন আর সর্বত্র এই সেলুনের দেখা পাওয়া যায় না।

হারিয়ে যাচ্ছে পিঁড়িতে বসা ‘হাঁটুর সেলুন’

হারিয়ে যাচ্ছে পিঁড়িতে বসা ‘হাঁটুর সেলুন’

 

তবে হাঁটুর সেলুনের দেখা পাওয়া গেছে মুরাদনগর উপজেলার নবীপুর গ্রামে। সেখানে প্রতিদিন সকালের আড়ং বসে। সেই আড়ংয়ের এক কোনে নরসুন্দরের কাজ করেন বলাই চন্দ্র শীল। তিনি নবীপুর শীল বাড়ির অবনী চন্দ্র শীলের ছেলে ।

বলাই শীল বলেন, ‘পঞ্চাশ বছর ধরে এই পেশায় আছি। বাপ দাদার রেখে যাওয়া আদি পেশা তাই ধরে রেখেছি। এখন আর কাজে মজা নেই। এক সময় গ্রামে আমাদের হাওন ছিল। বছর শেষে হাওন থেকে দেড়-দুইশ মণ ধান পেতাম। তরি -তরকারীও খুব একটা কিনা লাগতনা। ওই দিনগুলোই ভালো ছিল। এখন দিন শেষে ৮০-৯০ টাকা কাজ করতে পারি। আমার কাছে যারা আসেন তাদের বেশির ভাগই বয়স ষাটের ঊর্ধ্বে।’

তিনি আরোন বলেন, ‘আগে সাপ্তাহিক বাজার ছাড়াও সারা বছর মানুষ আমাদের বাড়িতে এসে বাবার কাছে পিঁড়িতে বসে চুল কাটাতো। চুলের কি স্টাইল হবে তা মুরুব্বিরা ঠিক করে দিতো। অনেকে এসে বলতেন মাথা একেবারে মুন্ড করে দিবা। মুন্ড মানে চার দিক একরকম ছোট হবে। চুল হাতে ধরা যাবে না। কারো চুল সামনে দিয়ে একটু বড় হলে মুরুব্বিরা আবার বাচ্চার কান ধরে নিয়ে আসতেন। এক সঙ্গে চার-পাঁচজন মানুষ আসতেন, তখন অনেক জাঁকজমক ছিল। বেশি লোক জমায়েত হয়ে গেলে বাবা ওক্কায় ধরিয়ে দিতেন।

নাপিতরা একটি কাঠের বাক্সে তাদের যন্ত্রপাতি রাখতেন। যার মধ্যে ক্ষুর, কাঁচি, চিরুনি, সাবান, ফিটকারি, পাউডার ও লোশন থাকতো। 

নাপিতরা একটি কাঠের বাক্সে তাদের যন্ত্রপাতি রাখতেন। যার মধ্যে ক্ষুর, কাঁচি, চিরুনি, সাবান, ফিটকারি, পাউডার ও লোশন থাকতো।

 

সিরিয়াল পাওয়ার জন্য গাছতলায় বসে ওক্কা টানতেন। শীল বাড়িতে গিয়ে চুল কাটার রেওয়াজ ১৯৯৫ পর উঠে গেছে। হাট-বাজারে দু’একজন পাওয়া গেলেও কাজের খড়ায় ভুগছেন তারা। তাই অনেক শীল পেশা বদলীয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। এক সময় শুধু শীলরা এ কাজ করতেন। বর্তমানে চন্ডাল, মালি, ধোপাসহ অন্যান্যরাও এ পেশায় প্রবেশ করেছে।

সেলুনগুলো উন্নত ডেকোরেশন আর বাহারি রঙের সাজ সরাঞ্জামে সাজানো হয়েছে। এতে অনেক রকম হেয়ার স্টাইল ঝুলানো থাকে। কিছু স্টাইল হয় সেলিব্রেটি, নায়ক, গায়ক, খেলোয়ার, ইউটিউবার, ডিজে, টিকটক নামে। ওই স্টাইল দেখে কাটা হয় চুল। সময়ের সঙ্গে সেলুন পেশার চাকচিক্য ও কদর বেড়েছে। বেড়েছে আয়। কমেছে হাট-বাজারে বট বৃক্ষের শীতল ছায়ার নিচে কিংবা প্রখর রোদ্রে লোহার উঁচু শিখে টানানো ছাতায় ঘেরা পিঁড়িতে বসা সেলুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here