কোনোদিন একসঙ্গে ৩ হাজার টাকা গুনে দেখিনি

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি:মানুষদের কাছে হাত পেতে একটি দুটি করে টাকা চেয়ে নিয়েছি। সারাদিন মানুষদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে যা পেয়েছি তা দিয়ে বাজার করে জীবিকা নির্বাহ করেছি। কোনো দিন এক সঙ্গে ৩হাজার টাকা গুনে দেখেনি। জীবনের এই প্রথম এক সঙ্গে ৩ হাজার টাকা পেলাম। আমরা যারা এখানে কাজ করছি তারা সবাই এই টাকা পেয়ে খুশি। এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার চৌরখুলী গ্রামে নির্মিত প্যাকেজিং ফ্যাক্টরি ‘অবলম্বনে’ কাজ করা শ্রমিক সোনামতি বেগম।

এ ফ্যাক্টরিতে চাকরি নেয়ার আগে সোনমতি বেগম ভিক্ষা করতেন। সোনামতি বেগমের মতো এই ফ্যা্ক্টরিতে  চাকরি পেয়েছেন আরো ৪৩ ভিক্ষুক।

মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ ৪৩ জন ভিক্ষুকের হাতে তাদের কর্মজীবনের প্রথম মাসের বেতন তুলে দেন।

এ সময় উপজেলা নির্বাহী অফিসার এস এম মাহফুজুর রহমান, উপজেলা সমাজসেবা অফিসার রাকিবুল হাসান শুভসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

গত ১ মে মাসের জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ফিতা কেটে এলাকার ভিক্ষুকদের কর্মসংস্থানের জন্য নির্মিত প্যাকেজিং ফ্যাক্টরি ‘অবলম্বন’ এর উদ্বোধন করেন।

গত ডিসেম্বর মাস থেকে কোটালীপাড়া উপজেলার কুশলা ইউনিয়নের চৌরখুলী গ্রামে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ও সরকারি অর্থায়ণে এ প্যাকেজিং ফ্যাক্টরির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে এ ফ্যাক্টরির নির্মাণ কাজ শেষ হয়। এ ফ্যাক্টরিতে ৪৩ জন ভিক্ষুককে চাকরি দেয়া হয়। চাকরি পাওয়ার পর ৪৩ জন ভিক্ষুকের হাত হয়ে উঠে কর্মজীবীর হাত।

কুশলা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম বাদল বলেন, কুশলা ইউনিয়নের চৌরখুলী গ্রামের ৪৩ নারী-পুরুষ জন্ম-জন্মান্তরে ভিক্ষাবৃত্তি পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে এ পেশা থেকে উত্তরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু কখনোই তাদেরকে এ পেশা থেকে সরানো করা যায়নি। তাদের কর্মসংস্থানের জন্য সরকারি অর্থায়নে ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যেগে চৌরখুলী গ্রামে এ প্যাকেজিং ফ্যাক্টরি নির্মাণ করা হয়। উপজেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগকে এলাকাবাসী স্বাগত জানিয়েছে। এলাকার ভিক্ষুকরা এখন ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়ে এ প্যাকেজিং ফ্যাক্টরি চাকরি করছেন।

কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার এস.এম মাহফুজুর রহমান বলেন, কোটালীপাড়ায় প্যাকেজিং ফ্যাক্টরিতে উৎপাদিত কাগজের প্যাকেটের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ কারণে সরকারি অর্থায়নে ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে এ ফ্যাক্টরির নির্মাণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আমরা আধুনিক মেশিনপত্র ক্রয়ের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে আরো ১০ লাখ টাকা পেয়েছি। গত ১ মাস ধরে এই ফ্যাক্টরিতে নিয়োগপ্রাপ্ত শ্রমিকরা কাজ করছেন। আজকে আমরা তাদের প্রথম মাসের বেতন দিলাম। এখানে কাজ করার আগে সব শ্রমিককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল।

তিনি আরো বলেন, এই ফ্যাক্টরিতে যে ৪৩ জন ভিক্ষুক কাজ করছেন তাদের প্রতিমাসে ৩ হাজার টাকা করে বেতন দেয়া হবে। এছাড়া এ ফ্যাক্টরিতে উৎপাদিত কাগজের তৈরি প্যাকেট বিক্রির লভ্যাংশের একটি অংশ তারা পাবেন। ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের এ উদ্যোগ সফল হলে পরিবর্তন হবে চৌরখুলীসহ গোটা কোটালীপাড়া। এভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তনের মধ্যে দিয়েই আমরা উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো। একদিনেই এটা হয়তো সম্ভব হবে না, তবে একদিন হবেই নিঃসন্দেহে!

জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা বলেন, ভিক্ষা নয় এখন থেকে কর্মময় হলো ৪৩ জন ভিক্ষুকের জীবন। এসব ভিক্ষুকরা এখন কাজ করে তাদের সংসার চালাতে পারবেন। এটি আমাদের একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এ ধরনের উদ্যোগ দেশকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাবে। আমাদের দেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত ও উন্নত সমৃদ্ধ হবে। এ ক্ষুদ্র উদ্যোগটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেশকে ভিক্ষুক মুক্ত করতে সহায়তা করবে বলে আমার বিশ্বাস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here