পরিবারের সবাইকে হারিয়ে নিঃস্ব ৯ বছরের মীম

নিজস্ব প্রতিনিধিঃমাদারীপুরের শিবচরে পদ্মা নদীতে বালুবোঝাই বাল্কহেডের সঙ্গে স্পিডবোটের ধাক্কায় পিতা-মাতা ও দুই বোনকে হারিয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেল শিশু মিম। সবাইকে হারিয়ে নিঃস্ব মীম সারি করে রাখা লাশের মাঝে প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরকে বাবা-মা ও দুইবোনের লাশ চিনিয়ে দিয়েছে। এ সময় চিৎকার করে কাঁদছিল শিশুটি। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার কেউ নেই। বাবা-মা ও দুই বোনের লাশ নিয়ে বাড়ি যেতে হবে তাকে। অথচ কথা ছিল দাদির লাশ দাফন করে মা-বাবার সঙ্গে বাসায় ফিরবে। কিন্তু তা আর হলো না। চিরতরে একা হয়ে গেল মীম।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান জানান, সোমবার ভোরে পদ্মা নদীর কাঁঠালবাড়িতে বাল্কহেডের সঙ্গে স্পিডবোটের সংঘর্ষে ২৬ জনের প্রাণহানির ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ৯ বছর বয়সী মীম। এক আত্মীয়ের মৃত্যুর খবর শুনে মা-বাবা আর দুই বোনের সঙ্গে সে খুলনার তেরোখাদা উপজেলার পারুফল এলাকায় যাচ্ছিল। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রাজধানীর মিরপুরে থাকতো মীম। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মা-বাবা ও দুই বোনকে হারিয়ে এখন এতিম শিশুটি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভোরে মুন্সিগঞ্জের শিমুলিয়া থেকে ৩০-৩৫ জন যাত্রী নিয়ে মাদারীপুরের শিবচরের বাংলাবাজারের দিকে আসছিল স্পিডবোটটি। ঘাটের কাছাকাছি এলে নোঙর করা বালুবোঝাই একটি বাল্কহেডকে ধাক্কা দিয়ে স্পিডবোটটি উল্টে যায়। নিখোঁজ হয় স্পিডবোটে থাকা সব যাত্রী। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও নৌ পুলিশ উদ্ধার অভিযান শুরু করে। জীবিত উদ্ধার করা হয় পাঁচজনকে। তাদের শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ঘটনাস্থল থেকে ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিন শিশু ও এক নারী রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ বেশি যাত্রী নেওয়ায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিনিয়ত কিছু অসাধু মালিক-শ্রমিক স্পিডবোট চালাচ্ছে। এতে প্রায়ই প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। স্পিডবোট দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহতের ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার না হলে পরবর্তীতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

স্পিডবোট দুর্ঘটনা নিয়ে মাদারীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, মূলত মুন্সিগঞ্জ থেকে চালকরা গোপনে এই স্পিডবোটে যাত্রী তুলে নিয়ে আসছে। এই ঘটনায় নৌ পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়েছে। দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে। এ ব্যাপারে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. রহিমা খাতুন বলেন, এই দুর্ঘটনায় স্থানীয় সরকার অধিদফতরের উপপরিচালক আযহারুল ইসলামকে প্রধান করে ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি ঘটন করা হয়েছে। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। এই ঘটনায় দোষীরা কেউ ছাড় পাবে না বলেও জানান তিনি।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এদিকে কাঁঠালবাড়িতে স্পিডবোট দুর্ঘটনায় নিহত ২৬ জনের মধ্যে ২৫ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে।

নিহতরা হলেন- মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার মৌলতীকান্দি এলাকার আজিত মোল্লার ছেলে আলম মোল্লা (৩৮), একই উপজেলার গুয়াতলা এলাকার আদম আলী মোল্লার ছেলে শাহাদাত হোসেন (৪২), রাজৈর উপজেলার শঙ্কারদি এলাকার তারা মিয়া মীরের ছেলে তাহের মীর (৩০), সদর উপজেলার শ্রীনদী এলাকার আবদুল মান্নান মোল্লার ছেলে আব্দুল আহাদ (৩০)।

খুলনার তেরোখাদা উপজেলার পারুফল এলাকার মৃত আলম মিয়ার ছেলে মনির মিয়া (৩৮), তার স্ত্রী হীনা বেগম (৩৬), তাদের মেয়ে রুমি আক্তার (৩) ও সুমি আক্তার (৫)।
বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার আশা এলাকার রক্তু হোসেনের ছেলে সাইদুল হোসেন (২৭) একই উপজেলার পূর্বষট্টি এলাকার সাদেক বেপারীর ছেলে রিয়াজ হোসেন (৩৩) ও সাইফুল ইসলাম (৩৫), একই উপজেলার মনির হোসেন (৩৫), বরিশালের বন্দর থানার তেদুরিয়া এলাকার মো. আলী আহমেদের ছেলে আনোয়ার চৌকিদার (৫০), বানারীপাড়া উপজেলার হাশেম বেপারীর ছেলে আলাউদ্দিন বেপারী (৪৫)। কুমিল্লার তিতাস উপজেলার ইউসুফপুর এলাকার মৃত আবদুল মান্নানের ছেলে জিয়াউর রহমান (৩৮), দাউদকান্দি উপজেলার মাইখারকান্দি এলাকার মৃত আবদুল হাশেমের ছেলে মো. কাওসার আহমেদ (৪০) একই এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে মো. রুহুল আমিন (৩৬)।

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার মাইগ্রো এলাকার মৃত পান্নু সরদারের ছেলে আরজু সরদার (৪০) এবং আরজুর দেড় বছর বয়সী ছেলে ইয়ামিন। চাঁদপুরের মতলব উত্তর থানার মোহনপুর এলাকার মৃত আলী হোসেন বেপারীর ছেলে মো. দেলোয়ার হোসেন (৪৫)। নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার রাজাপুর এলাকার হাফিজুর রহমানের ছেলে জোবায়ের মোল্লা (৩০)। মুন্সিগঞ্জের সাতপাড় এলাকার চান মিয়া শেখের ছেলে সাগর শেখ (৪১), ঢাকার পীরেরবাগ এলাকার নুরে আলমের ছেলে খোরশেদ আলম (৪৫), ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার রাজাবাড়িয়া এলাকার মৃত আব্দুল কুদ্দুস শিকদারের ছেলে নাসিরউদ্দিন (৪৫), পিরোজপুর জেলার সদর উপজেলার চরখানা এলাকার মো. ওহিদুর ছেলে বাপ্পী (২৮) ও ভান্ডারিয়া উপজেলার পসারিয়াবুনিয়া এলাকার রঞ্জন অধিকারীর ছেলে জনি অধিকারী (২৬)।

শিবচরের বাংলাবাজার ফেরিঘাটের ট্রাফিক পরিদর্শক আশিকুর রহমান জানান, মুন্সিগঞ্জের শিমুলিয়া থেকে ৩০-৩৫ জন যাত্রী নিয়ে মাদারীপুরের শিবচরের বাংলাবাজারের দিকে আসছিল স্পিডবোটটি। ঘাটের কাছাকাছি এলে নোঙর করা বালুবোঝাই একটি বাল্কহেডে ধাক্কা দিয়ে স্পিডবোটটি উল্টে যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here