বরিশাল থেকে ঈদ উপহার পাঠিয়ে নীরব প্রতিবাদ করলেন প্রভাষক আমিনুর রহমান

 

নিউজ ডেস্ক: আজ ৩রা মে, সোমবার বরিশাল জেলার সোনালী ব্যাংকের কর্পোরেট শাখা হতে চালানের মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অনুকূলে ঈদ উপহার বাবদ সরকার প্রদত্ত বেসরকারি শিক্ষক হিসেবে প্রাপ্ত চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা এবং বাড়ি ভাড়া ১০০০ টাকা, মোট ১৫০০ (এক হাজার পাঁচশত) টাকা পাঠালেন প্রভাষক মোঃ আমিনুর রহমান।

উপহার প্রদানকারী এই শিক্ষক বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা হাইস্কুল এন্ড কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক।

প্রভাষক আমিনুর রহমানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে অন্য আরো দু’জন শিক্ষকের প্রতিবাদের পথকে অনুসরণ করেছি।”
তিনি আরো বলেন, করোনা মহামারীর কালীন সময়ে রোহিঙ্গা থেকে শুরু করে সকল শ্রেণী পেশার মানুষদের পাশে সরকার যেভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে, দেশের বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত করছে, পুলিশ, প্রশাসন, ডাক্তারদের জন্য যেরুপ থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে; সে তুলনায় বেসরকারি শিক্ষকগণ সরকারের কাছ থেকে একটি টাকাও পায় নি বরং সরকার চিকিৎসা বাবদ মাত্র ৫০০ টাকা প্রদান করছে। আমরা যে রোহিঙ্গাদের চেয়েও মানবেতর জীবনযাপন করছি সরকারের সেদিকে বিন্দু পরিমাণ দৃষ্টি নেই। বাংলাদেশের কোথাও ১০০০ টাকায় বাসাভাড়া পাওয়া যায় কিনা তা একমাত্র কর্তৃপক্ষই ভালো জানেন। কারণ আমার বিশ্বাস মাননীয় প্রধান মন্ত্রীকে কোন মন্ত্রী, আমলা বা কুটনৈতিক শিক্ষক নেতারা এই অমানবিক ও অপমানজনক তথ্য দেন নি। আমি আশা করেছিলাম, বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ জন্মবার্ষিকী উদযাপন ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যে কোন একটি সুসংবাদ আমাদেরকে দেবেন। কিন্তু আমরা বেসরকারি শিক্ষক সমাজ হতাশ হয়েছি! অবশেষে ভেবেছিলাম পূর্ণাঙ্গ ঈদ বোনাসটি অন্তত পাবো। তাও পেলাম না! ”
তাই প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আমার সাধ্যমতো ঈদ উপহার পাঠিয়েছি।”

তিনি তার ফেসবুক আইডিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট খোলা চিঠি পোস্ট সহ এই চিঠিটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও শিক্ষা মন্ত্রলায়েও ইমেইল করে পাঠিয়েছেন বলে জানান। ২০১৯ সালেও তার এই খোলা চিঠি বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল, প্রিন্ট মিডিয়া ও সোস্যাল মিডিয়ায় বহুল প্রচারিত হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে বেশ আশার আলো জাগিয়েছিল। তিনি খোলা চিঠিতে যা লিখেছেন, তা হুবহু তুলে ধরা হলো-

মাতৃতুল্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।
সালাম ও কদমবুচি গ্রহণ করবেন। প্রথমেই করোনা মহামারী কালীন পরিস্থিতি মোকাবেলা ও অভূতপূর্ব উন্নয়নের জন্য আপনাকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।

আমি একটি এমপিও ভুক্ত হাইস্কুল ও কলেজের কলেজ শাখার রসায়ন বিষয়ের প্রভাষক। বরিশাল জিলা স্কুল থেকে বিজ্ঞান শাখা থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি ও বরিশাল বিএম কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বিএম কলেজ থেকেই দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে রসায়ন বিষয়ে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নেই। উল্লেখ্য পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেনিতে বৃত্তি লাভও করেছিলাম! কিন্তু ভাগ্যদোষে আমি আজ ১৮ বছর যাবত বেসরকারি শিক্ষক প্রভাষক পদেই চাকুরী করে আসছি। তাই আপনার সরকারি শিক্ষকদের মুখে প্রায়শই শুনতে হয় ” আমাদের যোগ্যতা নাই।” নেই কোন প্রমোশন, মেধা যাচাইয়ের সুযোগ! কপালগুনে আনুপাতিক হারে কেউ কেউ জ্যেষ্ঠতার বদৌলতে সহকারী অধ্যাপক হন। আর আমি সারা জীবনে সহকারী অধ্যাপকও হতে পারবো না আর কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ পদের জন্য আবেদন করার সুযোগটুকুও পাই নি! ২০২০ সালের শিক্ষানীতি অনুসারে এখন শুনছি প্রভাষকরা পদন্নোতি পেয়ে ‘সিনিয়র প্রভাষক’ পদে অলংকৃত হবেন! মাঝে মাঝে নিজেকে খুব অভিশপ্ত মনে হয়!

মা! অতি দুঃখের সাথে আপনাকে অবহিত করতে হচ্ছে যে, আমি আমার বেতনের সাথে ১০০০ টাকা বাড়ি ভাড়া আর ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পাই! তার উপর বেতনের ১০% কল্যান ও অবসরের জন্য কেটে নেয়া হয়! যে টাকা হাতে পাই তা দিয়ে না পারি সংসার চালাতে! না পারি শ্রেনীকক্ষে শতভাগ মননিবেশ করতে! না পারি রিকশা চালাতে! না পারি আত্মহত্যা করতে!

মাগো! প্রাইভেট না পড়ালে বর্তমান দ্রব্যমূল্যের এই বাজারে সংসার, ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, বাসাভাড়া, ডাক্তার , ঔষধ, বাবা-মায়ের খরচ সামলাবো কি করে? আবার অধিকাংশ বিষয়ের শিক্ষকগনদের প্রাইভেট পড়ানোর সুযোগও নেই, পড়ানও না। তাদের দীর্ঘ দুঃখ কষ্টের কথা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন! এই কষ্টের কথা বলার এবং শোনার মত এ দেশে বিশ্বস্ত দ্বিতীয় জন আপনি ছাড়া আমাদের কেউ নেই!

আমাদের ভাগ্যে তো আর ঈদ কুরবানি নাই! তবুও আশা নিয়ে বেঁচে আছি! আপনার মুখ দিয়েই জাতীয়করণের ঘোষণা আসবে ইনশাল্লাহ। আপনি মানবতার মা, আপনি যদি আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসে একটিবার বেসিকদের কষ্ট দেখতেন! আমরা কি দিয়ে ভাত খাই, রোদ বৃষ্টিতে পুরানো সেই ছাতাটা নিয়ে কিভাবে এক পোষাকে বছরের পর বছর অতিবাহিত করছি যদি দেখতেন, তাহলে আপনি চোখের পানি ধরে রাখতে পারবেন না! বড় বড় নামীদামী কিছু কলেজ, কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান প্রধানগণ, কিছু সুবিধাভোগী ও সরকারি শিক্ষক নেতা ও আমলাদের কারণে আমরা ৯৫% শিক্ষার্থীর গ্রামবাংলার অবহেলিত শিক্ষক অবহেলিতই রয়ে গেছি!

মাগো! দেশটাকে ডিজিটাল করলেন আর জাতি গড়ার কারিগরদের অবহেলইই রেখে দিলেন!
একটা উৎসব এলে স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মাকে একটু নতুন পোষাক কিনে দেবো নাকি ১ কেজি মাংস কিনবো? খুব চাপা কষ্ট নিয়ে অভিনেতাসুলভ হাসি দিয়ে সমাজে বেঁচে আছি! আপনি নিজে একবার, অন্তত একবার ভেবে দেখুন ২৫% উৎসব ভাতা দিয়ে কি ঈদের বাজার হয়? আপনি জাতির পিতার সুযোগ্যা কন্যা। আপনারতো কারো পরামর্শ নেয়া দরকার নেই! আপনার একটু মানবতার দৃষ্টিই যথেষ্ট।

সারাজীবন অন্যের সন্তান পড়িয়ে মানুষ করতে পেরেছি কি না জানি না ;তবে উচ্চ শিক্ষিত করছি! আমার চাকুরী শেষে বা আকস্মিক মৃত্যুতে আমার পরিবারের পাশে এসে এই উচ্চ শিক্ষিত ছাত্রছাত্রী দাঁড়াবে না! তাই আপনার মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে বিনীত অনুরোধ আধুনিক শিক্ষানীতি, শিক্ষাব্যবস্থা ও পরিকল্পনার পাশাপাশি আমাদের ও আগামীর ভবিষ্যৎ নিয়েও একটু ভাববেন। আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘায়ু দাণ করুন। আপনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি। আল্লাহ আমাদের দেশ ও দেশের মানুষকে করোনার হাত থেকে মুক্ত করুন এই দোয়াই করি।

ইতি,
আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী শিক্ষক
মোঃ আমিনুর রহমান শামীম
প্রভাষক, রসায়ন
চাঁদপাশা হাইস্কুল ও কলেজ
বাবুগঞ্জ, বরিশাল।

গত ২৯ এপ্রিল বি. বাড়িয়ার গোপীনাথপুর আলহাজ্ব শাহ আলম ডিগ্রি কলেজের ব্যাংকিং বিষয়ের প্রভাষক মোঃ বাকি বিল্লাহ সর্বপ্রথম কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অনুকূলে তার বাসাভাড়ার ১০০০ টাকা ফেরত দেন। এরপর দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে ২মে, রবিবার লালমনিরহাট জেলার সারপুকুর, আদিতমারির সরল খাঁ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ রশিদুল আলম এবং আজ তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে ৩মে সোমবার বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা হাইস্কুল এন্ড কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রভাষক মোঃ আমিনুর রহমান তাদের বাসাভাড়া ও চিকিৎসা ভাতার ১৫০০/- টাকা মাউসির মহা পরিচালকের অনুকুলে ফেরত ও ঈদ উপহার হিসেবে পাঠান।

শিক্ষকদের এই নীরব প্রতিবাদকে স্বাগত জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষক, শিক্ষানুরাগী ও সুশীল সমাজ। তাদের ধারণা মানুষ গড়ার কারিগরদের যথার্থ মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি। সাধারণ শিক্ষকদের অনেকেই এই টাকা ফেরত দেবেন বলে সোস্যাল মিডিয়া ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে বেশ চাঞ্চল্য ও তোলপাড় শুরু হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here