আলামত ও সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে খালাস পেয়ে যাচ্ছে অধিকাংশ সাইবার অপরাধী

নিউজ দেস্কঃ  সারাদেশে বর্তমানে সাইবার বা ডিজিটাল অপরাধ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। দিন দিন সাইবার অপরাধ বেড়েই চলেছে। কিন্তু আলামত ও সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে দেশের অধিকাংশ সাইবার অপরাধীই খালাস পেয়ে যাচ্ছে। আর সারাদেশের সাইবার বা ডিজিটাল অপরাধীদের বিচারের জন্য মাত্র একটি সাইবার ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। ফলে প্রতিদিনই ওই ট্রাইব্যুনালে সারাদেশ থেকে বাদী, বিবাদী ও সাক্ষীরা এসে সাইবার অপরাধীদের বিচার প্রত্যাশায় ভিড় জমাচ্ছে। সাইবার বা ডিজিটাল অপরাধীরা ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, গুগল, স্কাইপি ব্যবহার করে নানা অপরাধমূলক কর্মকা- চালাচ্ছে। ইন্টারনেট, স্মার্টফোনের ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া আইডি ও আইডি হ্যাক করে নানা ধরনের অপরাধ ঘটানো হচ্ছে। ডিজিটাল অপরাধীরা জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাসবাদ থেকে শুরু করে মিথ্যা মানহানিকর তথ্য প্রচার, বিভিন্ন এ্যাপসে অশ্লীল ছবি, ভিডিও এবং মেসেজ পাঠিয়ে প্রতারণা ও উত্ত্যক্ত করছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব রটিয়ে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্টের চক্রান্ত করা হচ্ছে। ওই ধরনের ডিজিটাল অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় দেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। পুলিশের সাইবার ইউনিট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডিজিটাল অপরাধ। কিন্তু ওই ধরনের অপরাধী তুলনামূলকভাবে কম ধরা পড়ছে। আবার ধরা পড়লেও শাস্তি পাওয়ার নজির আরো কম। ফলে ডিজিটাল অপরাধ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেসবুকে অপপ্রচার ও গুজব আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মের নামে অপপ্রচার চালিয়ে দেশে অরাজক ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে অনেক অঘটন ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্ম দেয়া হচ্ছে। তাতে মানুষজনকে হত্যা, আহত, ধন সম্পদ বিনষ্ট করার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। আবার অনেকে সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অপমান-অপদস্থের শিকার হচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার করে শুধু জঙ্গীবাদ বা সন্ত্রাসবাদই ছড়িয়ে দেয়া হয়নি, বরং এটিএম বুথ থেকে টাকা চুরি, অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা চুরি, সার্ভার কিংবা ডিভাইস থেকে তথ্য চুরি করার মতো ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জঙ্গী মতপ্রকাশ, নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কথা বলা, বিজ্ঞানচিন্তা কিংবা অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিরুদ্ধে বক্তব্যের জন্যও ডিজিটাল প্রযুক্তির অপরাধও মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে।
সূত্র জানায়, ঢাকায় অবস্থিত দেশের একমাত্র সাইবার ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ৩৫০ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বিগত ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র ৩টি মামলার বিচার কাজের মধ্য দিয়ে সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। আর ২০১৪ সালে ট্রাইব্যুনালে ৩২টি মামলার বিচার কাজ চলে। পরের বছর বিচারের জন্য আসে ১৫২টি মামলা। আগের বছরগুলোর চেয়ে ২০১৬ সালে বিচারের জন্য আসে ২ শতাধিক মামলা। আর ২০১৭ সালে ৫৬৮টি এবং ২০১৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য মামলা ২৬৭টি আসে। গত ৬ বছরে সাইবার অপরাধের ঘটনায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় ৩ হাজার ৬৫৯টি মামলা হয়েছে। তার মধ্যে সাইবার ট্রাইব্যুনালে গেছে এক হাজার ৫৭৫টি মামলা এবং ৫২২টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। তার মধ্যে মাত্র ২৫টি মামলায় আসামিদের সাজা হয়েছে। আর সাইবার ট্রাইব্যুনালে ৬০ শতাংশের বেশি মামলায় অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারায় আসামিরা খালাস পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীরা পারিবারিক ও সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছে। অভিযোগ করেও বিচার না পেয়ে কেউ কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিগত ২০২০ সালে ১৯৭টি মামলা হয়েছে। ওসব মামলায় ৪৫৭ ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ঢাকার সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী ২০১৯ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মোট মামলার সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১৮৯টি। সেগুলোর মধ্যে ৭২১টি মামলা থানায় এবং আদালতে ৪৬৮টি। তার মধ্যে বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিকের সংখ্যা ছিল ৪৪ জন। তবে ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে মামলা কম হয়েছে। গত ৬ বছরে ৪ হাজার সাইবার মামলা হয়েছে। অপরাধের শিকার ৭০ শতাংশই নারী। কিন্তুমাত্র ২৫ জনের সাজা হয়েছে। পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (সিডিএমএস) পরিসংখ্যান মতে, সারাদেশে ২০১৩ সালে ৩৫টি ও ২০১৪ সালে ৬৫টি মামলা হয়। ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালে মামলা হয় ৫৯৭টি। যার মধ্যে ১৩৭টিই হয় ঢাকায়। ২০১৬ সালে সারাদেশে মামলা হয় ৮৭৯টি, যার মধ্যে ঢাকায় ২০৬টি। ২০১৭ সালে মামলা হয় এক হাজার ২৮টি। তার মধ্যে ঢাকায় হয় ২৩৬টি। ২০১৮ সালে মামলা হয় এক হাজার ৫৫টি, যার মধ্যে ৩৩৩টি ঢাকায়। আর ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালে শুধু ঢাকায় মামলা হয়েছে ৯১২টি। সাইবার অপরাধীদের শিকার ৫২২ জনকে নিয়ে পুলিশের এক গবেষণায় দেখা যায়, ভুক্তভোগীদের ৭০ শতাংশই নারী। তাদের মধ্যে ২৫ বছরের কমবয়সী নারী ৫৭ শতাংশ। সাইবার অপরাধের ধরনের মধ্যে রয়েছে জঙ্গী-সংক্রান্ত এক শতাংশ, চাঁদাবাজি ৭ শতাংশ, সাইবার পর্নোগ্রাফি ১৪ শতাংশ, হ্যাকিং ২০ শতাংশ, মানহানি ১৮ শতাংশ, ভুয়া আইডি ২০ শতাংশ ও অন্যান্য ৬ শতাংশ। সাইবার অপরাধের ভিকটিম ৫৮ শতাংশই ফেক আইডি এবং আইডি হ্যাক করে মানহানিকারী অপরাধীর শিকার।
এদিকে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (বিটিআরসি) তথ্যানুযায়ী, গতবছর ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। তার মধ্যে ৭০ ভাগই সাইবার অপরাধের ঝুঁকিতে রয়েছে। ব্যবহারকারীদের মধ্যে ২০ ভাগ কোনো না কোনোভাবে সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িত। মাত্র ১০ ভাগ ব্যবহারকারী সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন। একই তথ্যানুযায়ী দেশে বর্তমানে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। আর সাইবার অপরাধের ৭৫ ভাগ অভিযোগই ফেসবুককেন্দ্রিক। ইন্টারনেটের মাধ্যমে হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হওয়া ৪৯ শতাংশই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। সাইবার ভুক্তভোগীদের মধ্যে ফেসবুক আইডি হ্যাকের শিকার হয়েছে এক হাজার ১১২ জন, যার মধ্যে ৬০৬ জন পুরুষ ও ৫০৬ জন নারী। মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণার শিকার হয়েছে ৩৪৯ জন, যার মধ্যে ২৭০ জন পুরুষ ও ৭৯ জন নারী। যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ২১৮ জন, যার মধ্যে ৪৫ জন পুরুষ ও ১৭৩ জন নারী। ফেসবুক, মেসেঞ্জারে ভুয়া আইডি দিয়ে ৫১৩ জনকে প্রতারণা করা হয়েছে। প্রতারণার শিকার হয়েছে ১৯৫ জন পুরুষ ও ৩১৮ জন নারী। একই বছরে ৩৭ জন ই-মেইল হ্যাকের শিকার হয়েছে। আর ৩২৩ জন পুুরুষ ও ২৯১ জন নারী মিলিয়ে অন্যান্য হয়রানির শিকার হয়েছে মোট ৬১৪ জন।
অন্যদিকে সাইবার ট্রাইব্যুনালের আইনজীবীদের মতে, বর্তমানে ডিজিটাল অপরাধের মাত্রা অনেক বেড়েছে। সেজন্য মামলার বিচার দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তি জরুরি। বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত হলে সাইবার অপরাধ কমে আসবে। আর সাইবার আইনও তেমন শক্ত না। আর যেটুকু আছে তারও যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। সেজন্যই সাইবার অপরাধ বাড়ছে। ফেসবুকের মাধ্যমে নানাভাবে মানুষকে হেনস্থা করা হচ্ছে। কুৎসা রটিয়ে সম্মানহানির ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। এমনকি সরকারকে নানা ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতেও কেউ কেউ ফেসবুকে সক্রিয় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ডিজিটাল অপরাধ ঠেকাতে হলে সরকারের সর্বোচ্চ মনিটরিং জরুরি।
এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাইবার ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানান, ডিজিটাল বাংলাদেশ হওয়ার পর দেশব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তি সহজলভ্য হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুযোগে সারাদেশে তৈরি হয়েছে ডিজিটাল অপরাধী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দেয়ার কারণেই বেশিরভাগ ডিজিটাল অপরাধের ঘটনা ঘটছে। ট্রাইব্যুনালে মামলার অভিযোগগুলো হচ্ছে কটূক্তি, পোস্টের মাধ্যমে মানহানি করা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা এবং ধর্মের অবমাননা। ডিজিটাল অপরাধীদের ৬০ শতাংশ অভিযোগ প্রমাণের অভাবে খালাস পেয়ে গেলেও তাদের সবাই যে নির্দোষ নিরপরাধ তা মানতে রাজি নয় তদন্তে দায়িত্বরত সাইবার ইউনিটের পুলিশ কর্মকর্তারা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here