কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে লাঠিসোটা তুলে দেয়া ইসলামের শিক্ষা নয়

প্রভাষক আমিনুর রহমান শামীম :একজন ব্যক্তিকে আমাদের বিভিন্ন কারণে পছন্দ বা ভালো নাও লাগতে পারে। কোন ব্যক্তির মতাদর্শ, দর্শন, জীবন যাপন কিংবা আচরণের সব কিছু আমাদের ভালো লাগবে এমনটা আশা করাটাও ভুল। ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক, ধর্মীয় অনুশাসন বিধিবিধান ইত্যাদি বিষয়ে একমত, ঐক্যমত কিংবা সহমত মানব সৃষ্টির ইতিহাস থেকেই খুঁজে পাওয়া যাবে না।তাই বলে সহমর্মিতা, মনুষ্যত্ব থাকবে না এমন কাজের শিক্ষা পৃথিবীর কোন শিক্ষক বা আলেমগণ কোন কালেই শিক্ষা দেন নি।

একজন অতিথি রাষ্ট্র প্রধানকে রাষ্ট্রীয় নীতি অনুসারে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়াটার বিরোধীতা, তিনি উপস্থিত থাকা অবস্থায় দেশের মধ্যে ভাংচুর, অগ্নি সংযোগ, অরাজকতা সৃষ্টি করা কি নিজেদেরকে নিজেরাই লজ্জা দেয়ার সামিল নয়? বিশ্বের কাছে নিজেদের খাটো করা নয়? কোথায় আমাদের বিবেক? কোথায় আমাদের ইসলামের শিক্ষা? কোথায় আমাদের ইসলামের ইতিহাস? আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) শত্রুদের হাত থেকে তাঁর সাহাবিদের জীবন রক্ষার জন্য মক্কা নগরী থেকে ভিন্নধর্মাবলম্বী রাজার কাছে পাঠিয়েছিলেন কেন?

কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে লাঠিসোটা, দা, চাকু, ততরবারি তুলে দিয়ে শান্ত দেশকে অশান্ত করার নাম কি ইসলাম? কোমলমতি এই শিক্ষার্থীদের হাতে লাঠিসোটা তুলে দিয়ে শান্ত দেশকে অশান্ত করা ইসলামের শিক্ষা নয়। ইসলামের হেফাজতের মালিকতো স্বয়ং আল্লাহ। যারা প্রকৃত ইসলামকে বিকৃত করে সহজ সরল মানুষকে নিজেদের স্বার্থে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন, রাষ্ট্রে অশান্তি সৃষ্টি করছেন, ইসলামকে কলুষিত করছেন তারা আর যাই মুখে বলেন, বার বার প্রমাণ করে দিলেন আপনারা ১৯৭১ এর পরাজিত শক্তির প্রেতাত্মা।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে আওয়ামী লীগ নয়৷ ৭০ এর নির্বাচনে বাঙলার ৭৫% গণমানুষের রায়, মহান মুক্তিযুদ্ধে ৮৫% মানুষের অংশ গ্রহণ করার পরে যে ২৫% স্বাধীনতা বিরোধী পাকিস্তানি শাসকদের দোসর ও দালালরা রয়েছে তারাই আজকে আমাদের মহান স্বাধীন সুবর্ণ জয়ন্তী কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। তারা বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারছে না৷ তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মেনে নিতে পারছেন না। তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে মেনে নিতে পারছেন না। তাদের কলুষিত কলবে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

বাংলার মানুষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ও মুজিব সৈনিকদের বিভক্তিতে হতাশ হলেও ভীতসন্ত্রস্ত নয়। বাংলার মানুষ আজ তথাকথিত কমিউনিস্ট আলেমদের নিয়ে আতংকিত। বাংলার মানুষের প্রত্যাশা ছিলো মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের যে রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে তাদের প্রত্যেকেই মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবে দাবিতে একই প্লাটফর্মে দাঁড়াবেন। প্রত্যাশা ছিলো, বঙ্গবন্ধু যে শুধু আওয়ামী লীগের নয় ; তিনি সবার এটা সকল স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিগুলো প্রমাণ করবেন।

আমাদের প্রতিবেশী ও বন্ধু রাষ্ট্র ভারত নিঃসন্দেহে একটা শক্তিশালী ও জনসংখ্যার দিক দিয়ে বৃহৎ রাষ্ট্র। মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীও আমাদের বীর সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেছে। তাঁরাও আমাদের বীর যোদ্ধাদের সাথে জীবন দিয়েছেন।
ভারত বাংলাদেশ এই দু’দেশের অনেক অমীমাংসিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমাধান হয়েছে, কিন্তু কিছু কিছু বিষয় সমাধানের পথে আছে, কিছু বিষয় ভারত সরকার তাদের বিভিন্ন রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার তথা অভ্যন্তরীণ আলাপ আলোচনা করে বাংলাদেশর সাথে সুসম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েই সমাধান করবে। তাছাড়া ভারতের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের প্রতিটি দাবি ও স্বার্থের পক্ষে সমর্থন দিয়ে আসছে। তাহলে আমাদের ভারত বিদ্বেষের কারণ কি? তাহলে কি ধরে নেবো একমাত্র কারণ আমরা হিন্দু-মুসলিম ধর্ম?

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান করাচীতে ১৯৭১ এ গ্রেফতার অবস্থায়ও বলেছিলেন,”আমি বাঙ্গালী, আমি মানুষ, আমি মুসলমান।”

আমি বাঙালীঃ বাঙ্গালী 🇧🇩 ও বাংলাদেশী নিয়ে বহুবার লিখেছি। অবুঝদের বুঝানো যায়, ঘুমন্তকে জাগানো যায় কিন্তু জাগ্রত ও জ্ঞানী পাপীদের হিংসা, বিদ্বেষ আর অযৌক্তিক গোড়ামি থেকে সরল পথে নিয়ে আসা খুবই কষ্টের!
আমি পণ্য নই যে বাংলাদেশী হবো। আমরা একটা জাতি, আমাদের জাতীয়তা বোধ যদি থেকে থাকে তাহলে হলে আমরা বাঙ্গালী।

বিশ্বের সকল দেশে আমাদের একটা প্রশংসা আছে, আমরা একটি অতিথিপরায়ণ জাতি। আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, পারিবারিক মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের জায়গা থেকে চরম শত্রুকেও বাঙ্গালী জাতির অতিথি আপ্যায়নের একটা সুনাম ছিলো, আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে এসেও আমরা খাটি বাঙ্গালী হতে পারি নাই!

আমি মানুষঃ মানুষ কি? যার মন আছে এবং মনে হুশ আছে তাকে মানুষ বলে। বাঙ্গালীর সমুদ্রের মত বিশাল মন আছে। কিন্তু সমস্যাটা হলো আমরা প্রচন্ড আবেগী। কখনো হাসি, কাঁদি, অভিমান করি, কখনো প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের আগুনে জ্বলি, কখনো ক্ষমতার জন্য, অর্থসম্পদের জন্য, নিজেদের আখের গোছাতে সহজ সরল মানুষ গুলোকে ব্যবহার করি। আমরা গুটি কয়েক চতুর গোষ্ঠী এই সহজ সরল মানুষ গুলোর উপর মিথ্যা স্বপ্নের একটা বিশ্বাস স্থাপন করে, সামান্য স্বার্থের লোভ দেখিয়ে, ধর্মের দোহাই দিয়ে মগজধোলাই দিয়ে কিংবা অসত্য তথ্য দিয়ে ভুল বুঝিয়ে পরিবেশ পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করি। এই সোনার মানুষগুলোকে দ্বারা অমানুষের মত অমানবিক, পৈশাচিক ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড করাই। আমরা নামে বাঙ্গালী হলেও মানুষও হতে পারি নাই!

আমি মুসলমানঃ মুসলমান কে? ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের মুসলমান বলা হয়। যারা মহান আল্লাহ ও তার পবিত্র কোরআন এর নির্দেশনা অনুযায়ী চলেন, আল্লাহর প্রিয় হাবিব হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)কে অনুসরণ কতে তাঁর সুন্নত অনুসারে নিজেকে গড়ে কিয়ামতের বিচারের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন, জান্নাতুল ফেরদৌসের উদ্দেশ্যে শত কষ্ট, অভাব, পরীক্ষার পরেঈ ঈমানের সাথে জীবন পরিচালনা করেন তারাই মুসলমান। কিন্তু মাওলানা ভাসানীর সেই উক্তিটি আজ আবার মনে পড়ে গেলো ” নীল নদের পানি যেমন নীল নয় তেমনি জামায়াত ইসলাম, ইসলাম নয়।”

মহান আল্লাহ’র প্রিয় হাবিব, নবীদের নবী, বাদশাহদের বাদশাহ,শিক্ষকদের শিক্ষক, আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) চাইলে বিলাসবহুল জীবন যাপন করতে পারতেন৷ কিন্তু তিনি অতি সাধারণ জনগণের মত জীবন যাপন করেছেন! দুঃখী অসহায়দের মত জীবন যাপন করেছেন! এ কথাগুলো আমাদের সমাজের অনেক সনামধন্য আলেম ব্যক্তিগণও পবিত্র কোরআনের তাফসীর ও মাহফিলে আমাদের শোনানোর জন্য বলে থাকেন। কিন্তু ইদানীং তাদের অনেকেই যাকাত, ফেতরা, মাদ্রাসা মসজিদ, কমপ্লেক্স, খানকাহ’র উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা চাঁদা নিচ্ছেন। আমরাও দিচ্ছি। আমরা অনেকেই মনোবাসনা পূর্ণ করার অন্ধ বিশ্বাসে তাদের প্রতিষ্ঠান গুলোতে প্রতিনিয়ত দান করে যাচ্ছি৷ আবার আমরা অনেকেই সত্যিকার অর্থে আল্লাহ’র রাস্তায় দান করে থাকি, ইসলামের বিধান অনুযায়ী যাকাত, ফিতরা দিয়ে থাকি।

এই দানের টাকা দিয়ে আজ অনেক নামধারী আলেম ওলামা, পীর, আল্লামারা রাজনৈতিক দল বানাচ্ছেন, কেউ কেউ দল চালাচ্ছেন, কেউ কেউ রাজধানীর মত যায়গায় শুধু অফিসই নয়, বিলাশ বহুল বাড়ি, কোটি টাকার গাড়ি, ছেলে মেয়েদের বিদেশে বিয়েসাদী, লেখাপড়া সহ তাদের উন্নত মুসলিম দেশগুলোর নাগরিক হিসেবে মানুষ করেছেন, করছেন।

এদের অধিকাংশেরই চাকরি বা হালাল কোন ব্যবসা নেই। আমাদের যাকাত, ফিতরা, দান অনুদানই তাদের একমাত্র উপার্জন। আর এই ধর্ম ব্যবসায়ী ধনী ভিক্ষুকেরাই মাহফিলের সময় সাধারণ জনগণের সামনে সবার প্রিয় নবীজির কথা বলেন আর কাঁদেন!

কোটি টাকার নতুন চকচকে রেজিস্ট্রেশনবিহীন প্রাডো গাড়িতেও চড়েন কেউ কেউ!নবীজির শুকনো রুটি আর খেজুর খেয়ে জীবন যাপনের ইতিহাস যখন সুর দিয়ে বলেন তখন রুমাল ভিজিয়ে ফেলেন এই ভিক্ষুক চাঁদাবাজ ভন্ডরা!অথচ এরা খেতে বসলে বাজারের সেরা মাছ, মাংস, দুধ, দধি, মিস্টি, ফলমূল সহ টেবিল ভর্তি খাবারের আইটেম ছাড়া বসেন না। আমরাও বসাই না!

আজ পর্যন্ত শুনেছেন, এই সব আলেমরা আমাদেরটা পেয়েই গেছেন কিন্তু তারা সমাজের মানুষের জন্য কখনো কিছু করেছেন? তারা তাদের নিজেদের বাড়িতে কোনদিন নিজের রোজগারের টাকায় কাউকে দাওয়াত দিয়ে খাইয়েছেন? তাদেরকে তাদের বাড়িতে নিজের বাবামায়েদের জন্য কোনদিন দোয়া বা মিলাদের আয়োজন করতে দেখেছেন?
না, আমি সবার কথা বলছি না! অনেক ভালো আলেম ওলামা আমাদের বাংলাদেশে এখনও আছেন। আর যারা আল্লাহ’র ডাকে তার মেহমান হিসেবে চলে গেছেন তাদের অবদানের কথা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, আমি কাউকে ব্যক্তিগত ভাবে বলছি না। ইদানীং কালের কিছু অর্থলোভী, দুনিয়াবি, মাওলানা নামধারী ভন্ডদের কারণে ইসলাম যে কলুষিত হচ্ছে সে কথাই বলছি!

তাই আরো স্পষ্ট করে বলছি, সেদিন আর দূরে নয়, জনগণ যেদিন সত্যগুলো স্বচক্ষে দেখবে সেদিন এই চাঁদাবাজ, ভন্ড ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্রত্যাখ্যান করবে। আর আমাদের স্বাধীনতার স্বপক্ষের মুসলিম সন্তানরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে আদায় করবে। নবীর সুন্নত হিসেবে দাড়ি রাখবে। বাবা-মা আত্মীয় স্বজনদের জন্য নিজেরাই দোয়া করবে, নিজেরাই মৃত ব্যক্তির জানাজা নামাজ পড়াবে। কারণ একটি দাগকে ছোট করতে হলে একটা বড় দাগ টানতে হবে।

(শিক্ষিক নেতা, লেখক ও কলামিস্ট)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here