দ্বিগুণ লাভের আশায় ৭ কোটি টাকা খুইয়েছেন তারা

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ২০১৪ সালে সেনাবাহিনীর ল্যান্স কর্পোরাল পদে থেকে অবসরে যান কুষ্টিয়ার মো. আইয়ুব হোসাইন। পেনশনের টাকায় ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসায় লোকসান হয়। পরে অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় টাকা লগ্নি করলে দ্বিগুণ লাভের প্রস্তাব পান। লাখে ৬ হাজার ৩০০ টাকা দেবার প্রস্তাবে এসএস আবাসন নামে একটি প্রতিষ্ঠানে ৪ লাখ টাকা লগ্নি করেন তিনি। টাকা দেয়ার পর গতকাল লাভের ২৫ হাজার ২০০ টাকা তুলতে গিয়ে জানতে পারেন প্রতারণার শিকার হয়েছেন তিনি।

বুধবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সিআইডি কার্যালয়ে প্রতারণার শিকার অবসরপ্রাপ্ত এ সেনাসদস্য কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ভাবছিলাম প্রতিষ্ঠানটিতে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যরাও আছেন। প্রতারণার সুযোগ নেই। লাখে ৬ হাজার ৩০০ টাকা পাবার আশায় ৪ লাখ টাকা লগ্নি করেছি। এখন লাভ তো দূরে আসল টাকাও নাই। আমার তো ভাই সব শেষ।’

ভুক্তভোগী আইয়ুব হোসাইন বলেন, ‘আমি মূলত: এসেছিলাম চাকরির ইন্টারভিউ দেয়ার জন্য। ইন্টারভিউ আর দেয়া হয়নি। উল্টো না বুঝেই প্রতারণার ফাঁদে পড়ি। আমাকে কিছু ডকুমেন্ট দেয়া হয়। এক লাখে ৬ হাজার ৩০০ টাকা দেবে। এরমধ্যে এরমধ্যে তারা ৬ লাখ টাকার ফেরত হিসেবে ৩ হাজার ৩০০ টাকা কেটে নেবে।’

সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার যাই এসএস আবাসনের নতুন অফিসে। সেখানে গিয়ে দেখি সিআইডি পুলিশ। অফিসের অন্যদের সাথে আমাকেও আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে আমি সব বলি। সিআইডি জানায়, এরা সবাই প্রতারক। এখন আমি টাকা ফেরত পাবো কিনা জানি না। একটি টাকাও লাভ পাইনি। এখন আসল ফেরত পাবো কিনা তাও জানি না।

শুধু আইয়ুব আলী নয় এমন ৬ শতাধিক ভুক্তভোগীর তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি।

সিআইডি বলছে, একেকজনের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১৩ লাখ পর্যন্ত টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেছে এসএস আবাসন নামে ওই প্রতিষ্ঠানটি।

রিয়েল এস্টেট ব্যবসার অন্তরালে গ্রাহকদের ৩০ মাসে দ্বিগুন লাভের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারনা করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতকারী চক্রের ৯ সদস্যকে মঙ্গলবার রাতে ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে সিআইডি। এঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে আজ ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা হয়েছে।

গ্রেফতাররা হলেন- আল আমিন (৩৮), মো. মামুন (৩৯), মো. মোজাম্মেল হোসেন (৫০), সাইফুল ইসলাম (৫১), আব্দুল হালিম (৪৮), জাহাঙ্গীর আলম (৪২), শাহাদাত হোসেন সুমন (৩৮) আমিনুল ইসলাম (২৪)।

এ সময় প্লট, ফ্ল্যাট বুকিং আবেদন ফরম ৫০টি, এসএস আবাসনের লেনদেন সংক্রান্ত রেজিষ্টার ৭টি, এসএস আবাসনের অর্থ বিনিয়োগ চুক্তিপত্র ১০০ টাকা সমমানের নন-জুডিশিয়াল ষ্ট্যাম্প ১২ বারটি, আবেদন ফরম ৩৫টি, লেনদেন সংক্রান্ত খাতা ১৭টি, ডেবিট ভাউচার ২টি, মানি রিসিট ৬টি, এসএস আবাসনের কমিশন শিট ৬ পাতা, এছাড়াও জব্দ করা হয় নগদ ১৪ লাখ টাকা।

প্রতিষ্ঠানটির ৯ জনকে গ্রেফতার করা হলেও মূলহোতা ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, মো. রাশেদুর রহমান লেখা পলাতক রয়েছেন।

বুধবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সিআইডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেট্রোর অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘গ্রেফতাররা পরস্পর যোগসাজশে গত দেড় বছর ধরে আবাসিক এলাকায় রিয়েল এস্টেট ব্যবসার নামে বিভিন্ন লোভনীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে গ্রাহকদের অধিক মুনাফা দেয়ার প্রলোভন দিয়ে গ্রাহকদের নিকট হতে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে আসছে।’

ছয় শতাধিক ভুক্তভোগীর তথ্য আমরা পেয়েছি। তাতে প্রায় ৭ কোটি টাকার বেশি আত্মাসাৎ করেছেন। তদন্তে এই প্রতারিতের সংখ্যা ও আত্মসাৎকৃত টাকার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

গ্রাহকদের টাকা নিয়ে তারা ঠিকানা পরিবর্তন করে বিভিন্ন স্থানে নতুন নতুন অফিস খুলে গ্রাহকদের টাকা আত্মসাৎ করে আসছে।

সিআইডি ঢাকা মেট্রো-পশ্চিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, টাকা লগ্নি করলে লাখ টাকায় ৬ হাজার ৩০০ টাকা লাভের প্রলোভন দেখিয়ে এই চক্রটি ৬ শতাধিক লোকের কাছ থেকে ৭ কোটি টাকার ও বেশি টাকা আত্মসাৎ করেছে।

প্রতারণার কৌশল: ক্যান্টনমেন্ট এর পাশেই মাটিকাটায় এসএস আবাসনের অফিস। ফ্লাট কিনতে আগ্রহীরা আসলে ৩০ মাসে টাকা দ্বিগুণের লোভনীয় প্রস্তাব দেয়া হয়। আবার কেউ বিনিয়োগকারীকে আনতে পারলে ৬ শতাংশ কমিশনের প্রলোভন দেখানো হয়। এই ফাঁদে পা দেয়াদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যের সংখ্যাই বেশি। এমন প্রলোভনে তারা টাকা বিনিয়োগ করে। অনেকে লাভ বাবদ টাকাও পায়। তবে কিছুদিন পর তা বন্ধ হয়ে যায় এবং অফিস পরিবর্তন করে যোগাযোগও বন্ধ করে দেয়।

সোস্যাল মিডিয়া ও অনলাইনে বিজ্ঞাপন প্রচার: শেখ ওমর ফারুক বলেন, প্রতারক চক্রটি সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ও অনলাইনে এই প্রতারণামূলক লোভনীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। অনেকেই লোভে পড়েই বিনিয়োগ করেন। বিনিয়োগের আগে পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করেননি। প্রতারণার শিকার হবার পর সিআইডি’তে শতাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন।

প্রতারক চক্রের মূলহোতা রাশেদুর রহমান নজরদারিতে: এক প্রশ্নের জবাবে শেখ ওমর ফারুক বলেন, প্রতারক চক্রটির মূলহোতা রাশেদুর রহমান নজরদারিতেই রয়েছেন। তার পালানোর সুযোগ নেই। এই ঘটনার সাথে অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা কিংবা কোনো সরকারি দফতরের কর্মকর্তা জড়িত থাকার তথ্য আমরা পাইনি। পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here