গাছে বেঁধে সাংবাদিক নির্যাতন: মূল হোতা আওয়ামী লীগ নেতার ভাই

নিজস্ব প্রতিনিধিঃসুনামগঞ্জে এক সাংবাদিককে গাছে বেঁধে নির্যাতনের মূল হোতা স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার ভাই ও একজন ইউপি সদস্য। তারা ওই এলাকায় প্রশাসনের চোখের সামনেই নদী থেকে অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ।

নির্যাতনে আহত দৈনিক ‘সংবাদ’-এর তাহিরপুর প্রতিনিধি কামাল হোসেন এখন সুনামগঞ্জ জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তারা মাথা ও কপালসহ শারীরের বিভন্ন স্থানে আঘাতে চিহ্ন আছে। তিনি একই সঙ্গে উপজেলা প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদকও।

 

তিনি হাসপাতাল থেকে টেলিফোনে জানান, তাহিরপুরের বাদাঘাট ইউনিয়নের ঘাঘটিয়া এলাকায় যাদুকাটা নদীতে অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলনের খবর পেয়ে সোমবার (১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরের দিকে সেখানে যান। গিয়ে দেখেন শ্রমিক নিয়োগ করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা পাথর ও বালু তুলছেন। তিনি প্রথমে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ তাকে ছবি ও ভিডিও ফুটেজ দেয়ার অনুরোধ করে। এরপর তিনি খবরের জন্য ছবি তোলেন ও ভিডিও করেন। তখন সেখানে উপস্থিত এই অবৈধ ব্যবসার ‘গডফাদার’ মাহমুদ আলি কোথাও ফোন করে। এরপরই সে সাংবাদিক কামালের কাছে গিয়ে জামার কলার ধরে তার হাতে থাকা ভোজালি দিয়ে মাথায় কোপ দিলে তিনি সরে গেলে তার কপালে লাগে।

ওই সময় তারা সেখানে ২০-৩০ জন ছিলেন। এরপর তাকে রড দিয়ে আঘাত ও কিল ঘুষি দেয়া হয়। তখন তিনি জ্ঞান হারান।

কামাল জানান, ‘‘যখন জ্ঞান ফেরে তখন আমি দেখি আমাকে হাত-পা বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পাশের বাদাঘাট চকবাজারে নিয়ে গিয়ে গাছের সাথে বাঁধা হয়। আমি প্রতিবাদ করলে তারা আবারো মারপিট করে।”

খবর পেয়ে দুপুর দুইটার দিকে আরেকজন সাংবাদিক আবির হাসান পুলিশ নিয়ে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে তাহিরপুর উপজেলা হাসপাতাল ও সেখান থেকে সুনামঞ্জ জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান। আবির হাসান জানান, ‘‘আমরা সেখানে গিয়ে তাকে গাছের সঙ্গে বাঁধা অবস্থাতেই পাই। তবে পুলিশ যাওয়ার আগেই দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।”

আহত সাংবাদিক কামাল অভিরযোগ করেন, তার ওপর হামলার মূল পরিকল্পনাকারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মোশাররফ তালুকদারের ভাই মুশাহিদ তালুকদার ও স্থানীয় ইউপি মেম্বার মনির উদ্দিন। তারও ঘটনাস্থলে ছিলেন। তাদের নির্দেশেই হামলা হয়েছে। তারা অনেক দিন ধরেই অবৈধভাবে পাথর ও বালু তোলার সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা আছে। বাধ কাটার মামলাও আছে। প্রতি বছরই তাদের এই অবৈধ কাজ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট হয়, কিন্তু কোনো কাজ হয় না।

তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মোশাররফ তালুকদার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,‘‘আমরা ভাই মুশাহিদ ঘটনার সময় সেখানে ছিলোনা। আর মনির মেম্বার অকে জনপ্রিয়। সে তিন বারের মেম্বার।” তবে তিনি বলেন,তারা পাঁচ ভাই। মুশাহিদ সবার ছোট। সবাই প্রাপ্ত বয়স্ক। যার যার ব্যবসা স্বাধীনভাবে করে। সে কি করে সব সে জানেনা। এলাকার অনেকেই গোপনে এবং রাতে পাথর ও বালু তোলে। তিনি নিজে পাথরের ব্যবসা করেন।

এই ঘটনায় মোট পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। আসামিরা হলেন, মাহমুদ আলী শাহ, রইস উদ্দিন, দীন ইসলাম, মুশাহিদ তালুকদার ও মনির উদ্দিন মেম্বার। পুলিশ সন্দেহজনকভাবে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে এজাহারভুক্ত কাউকেই এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। থানার সাব-ইন্সপেক্টর দীপঙ্কর বিশ্বাস জানান, ‘‘এজাহারভুক্তরা পলাতক আছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”

আহত সাংবাদিক কামাল জানান, তার পরিবারের সদস্যরা এখন আতঙ্কের মধ্যে আছেন। মামলা করায় তার বাড়িতে হামলার আশঙ্কা করছেন তিনি।

তাহিরপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম জানান, তারা মঙ্গলবার উপজেলায় প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন। আসামিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘সফস্বল সাংবাদিকদের কোনো ধরনেরই নিরাপত্তা নাই। আর্থিক বা শারীরিক কেনোটাই না। অধিকাংশ সাংবাদিক বেতন পান না। আবার প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও দুর্বৃত্তদের চাপের মুখে থাকতে হয়।” তার মতে, হামলা হুমকি এড়াতে সাংবাদিকদের একসঙ্গে চলার বিকল্প নাই। সূত্র: ডয়েচে ভেলে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here