দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারিভাবে এলপিজির উৎপাদন এবং বিতরণ বৃদ্ধির উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিনিধিঃগ্যাস স্বল্পতায় দেশেও ক্রমান্বয়ে এলপিজির জরপ্রিয়তা বাড়ছে। সরকার নতুন করে পাইপলাইনের গ্যাস নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়াতে এলপিজি এখন রান্নার প্রধান জ¦ালানি হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এলপিজির চাহিদা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। কিন্তু চাহিদা বাড়লেও এলপিজির দাম নিয়ে গ্রাহকের অভিযোগের অন্ত নেই। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন বাড়িয়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজার নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। মূলত সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতেই সরকারি পর্যায়ে এলপিজির উৎপাদন এবং বিতরণ বাড়ানো হবে। তাতে এলপিজি বিতরণে সরকারি অংশিদারিত্ব বাড়বে। এর ফলে ধারণা করা হচ্ছে এলপিজির দর নিয়ন্ত্রণ এবং বিতরণ পর্যায়ে সরকারের প্রভাব সৃষ্টি হবে। ওই লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেড শুরুতে এক লাখ টনের একটি প্ল্যান্ট স্থাপন করবে। তাছাড়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন পৃথকভাবে এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণের চেষ্টা করছে। জ¦ালানি এবং খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে দেশে এলপিজির মোট সরবরাহের মধ্যে মাত্র ২ ভাগ সরকারিভাবে সরবরাহ করা হয়। আর বাকি ৯৮ ভাগ এলপিজি বেসরকারিভাবে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ফলে এলপিজির বাজারের ওপর সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। এমন অবস্থায় সরকারিভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগও কার্যকর করা কঠিন। যদিও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সম্প্রতি সরকারিভাবে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করছে। তবে শেষ পর্যন্ত গ্রাহক পর্যায়ে ওই দাম ধরে রাখা যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে মাথাপিছু এলপিজি ব্যবহারের পরিমাণ ৬ কেজি। পৃথিবীর এলপিজি ব্যবহারের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১০ নম্বরে। আর মাথাপিছু ৫৯ কেজি এলপিজি ব্যবহার করে এক নাম্বারে রয়েছে জাপান। ওই দেশে রান্না-বান্না ছাড়াও পরিবহনের জ¦ালানি হিসেবেও এলপিজি ব্যবহার হয়।
সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে এলপিজি গ্রাহকের সংখ্যা ৩৮ লাখ। যা মোট গ্যাস গ্রাহকের চাইতেও বেশি। দেশে এখন প্রতিবছর ১০ লাখ টন এলপিজি আমদানি করা হয়। আর সরকারি বিভিন্ন প্ল্যান্ট থেকে উৎপাদন হয় ১৭ হাজার টন। দেশে মোট ব্যবহৃত এলপিজির ৮৪ ভাগই গৃহস্থালীতে ব্যবহার হচ্ছে। আর ১৬ ভাগ এলপিজি অন্যান্য খাতে ব্যবহার হয়। সেখানে সরকার যদি বাজারের ১০ থেকে ১২ ভাগ অংশিদারিত্বে থাকে তাহলে বাজারে কেউ সঙ্কট সৃষ্টি করে দাম বাড়াতে পারবে না।
সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন তথ্যানুযায়ী ছোট আকারের জাহাজে দেশে এলপিজি পরিবহন হয়। তাতে এলপিজির পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। ভারতের হলদিয়া এবং ধামরা পোর্ট ব্যবহার করে এলএনজি আমদানি করাতে সেখানে টনপ্রতি এলপিজির পরিবহন ব্যয় ৬০ ডলারের মধ্যে থাকে। আর দেশে আড়াই থেকে তিন হাজার টনের জাহাজ ব্যবহার করাতে এলপিজির টনপ্রতি পরিবহন ব্যয় ১৩০ ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে। তাতে এদেশে এলপিজি পরিবহন ব্যয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু মংলা বন্দরের হাড়বাড়িয়া হয়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার টনের জাহাজ এলেও এলপিজির পরিবহন ব্যয় এখনই টনপ্রতি ৫০ ডলার কমিয়ে ৮০ ডলারে নামিয়ে আনা সম্ভব। আর মাতারবাড়িতে এলপিজি টার্মিনাল হলে ওই পরিবহন ব্যয় ভারতের চাইতে কমিয়ে আনা সম্ভব।
এদিকে জ¦ালানি বিভাগ সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার এলপিজির কোনো ব্যবসা করে না। বেসরকারি উদ্যোক্তারাই দেশের বেশিরভাগ এলপিজি বিপণন করে। কিন্তু সাধারণ গ্রাহকের মধ্যে এলপিজির দাম নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। ওসব অভিযোগের সুরাহা করার জন্য সরকারি কর্মকর্তারা একাধিবার আলোচনা করেছে। কিন্তু ফলপ্রসূ কোন কিছুই করে ওঠা সম্ভব হয়নি। যদি সরকারি এলপিজির পরিমাণ বেশি থাকতো তাহলে বাজারের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারতো সরকার। যা এখন সম্ভব হচ্ছে না।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে জ¦ালানি বিভাগের সাম্প্রতিক এক বৈঠকে এলপি গ্যাস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান জানান, চট্টগ্রামের সীতাকু-ের লতিফপুর মৌজার সন্দ্বীপ চ্যানেলে ১০ একর জমি ইজারা নিয়েছিল এলপি গ্যাস লিমিটেড। কিন্তু পরে বন বিভাগ জানিয়েছে এই জমিতে তারা বনায়ন করবে। তবে বনায়নের কথা বলেও সেখানে বন বিভাগের তরফ থেকে প্রকল্প নির্মাণে বাধা দেয়া হলেও জমিটি ফেলে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে মাতারবাড়ি মেগা প্রকল্পে এলপিজি টার্মিনাল করার জন্য ৫০ একর জমি বরাদ্দ রয়েছে। তবে সেখানে এখনো ভূমি উন্নয়নের কাজই শেষ হয়নি। ফলে সেখানে এখনই কাজ করা সম্ভব নয়। ওই বৈঠকে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যেখানে ভূমি এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে ১০ একর খাস জমি এলপি গ্যাস লিমিটেডকে বরাদ্দের প্রস্তাব করবে জ¦ালানি বিভাগ। তাছাড়া টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় এলপিজি সিলিন্ডার উৎপাদনের জন্য পৃথক একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। যেখানে বছরে ২০ লাখ সিলিন্ডার উৎপাদন করা হবে। আন্তর্জাতিকমানের ওই সিলিন্ডার কারখানা নির্মাণের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে তা বিপিসির মাধ্যমে জ¦ালানি বিভাগে পাঠানো হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here