২০২০: বছরজুড়ে দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় বিপর্যস্ত বিশ্ব

নিউজ ডেস্কঃপরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ঙ্কর রেকর্ড গড়েছে ২০২০। ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণ বছরও ছিল এটি। করোনা মহামারির মধ্যেও দুর্যোগ-দুর্ঘটনা ও অঘটনে বরাবরের মতোই এবছরও নাকাল হয়েছে বিশ্ব। মহামারির এবছরে বহু দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়েছে বিশ্ববাসী; ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, বন্যাসহ নানান দুর্যোগ আর এসবের কারণে মানুষের প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি।

কালের গর্ভে চলে যাচ্ছে আরেকটি বছর। সময়ের হিসেবে বছরটি চলে গেলেও ২০২০-এর নেতিবাচক প্রভাব ও ক্ষয়ক্ষতির ছাপ মানুষের মনে থেকে যাবে দীর্ঘদিন। বিদায়ী বছরের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় করোনা মহামারি। এর বাইরেও বহু প্রাকৃতিক দুর্যোগও দেখেছে বিশ্ব।

দাবানল ও ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব ছিল বছরব্যাপী। অস্ট্রেলিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত থেকে চীন- বিশ্বের বহু দেশ ও অঞ্চলকে ভুগিয়েছে দাবানল, অগ্ন্যুৎপাত নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বছরজুড়ে বিশ্বব্যাপী ৪৮টি দাবানল, আগ্নেয়গিরি ও বন-জঙ্গলে অগ্ন্যুৎপাতের সঙ্গে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের দাণ্ডবও ছিল।

বছর চলে যাচ্ছে, কিন্তু এটি বিশ্ববাসীর ওপর কি ক্ষতি ও প্রভাব রেখে যাচ্ছে তা পেছন ফিরে দেখা যাক। মানুষের জন্য কতটা স্বরণীয় হয়ে থাকবে সামনের সময়ে সেটাও দেখে নেওয়া যাক বছরজুড়ে তার তাণ্ডবে…

দাবানলে শুরু:

অস্ট্রেলিয়া: বিদায়ী বছরে জানুয়ারির প্রথম দিনই অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলের শুরু। যেটা টানা মার্চ মাস পর্যন্ত চলেছে। সরাসরি আগুনে ৩৩ জন ও দাবানলের অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আরও ৪৪৫ জনসহ মোট ৪৭৮ জন মানুষ প্রাণ হারান।

দাবানলে এক কোটি ৩০ লাখ একর বন পুড়ে যায়। ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যে দাবানলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। নিউ সাউথ ওয়েলসে দাবানলে মারা যায় প্রচুর মাছ। রাজধানী ক্যানবেরাতেও জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়। মার্চ মাসে পাঁচ হাজার কোলাস মারা যায়। দাবানলে মোট ৩শ’ কোটি প্রাণীর মৃত্যু বা বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটে। নভেম্বর মাসে কুইন্স অঙ্গরাজ্যে দাবানলে ৭৪ কিলোমিটার পুড়ে যায়। এটি ১২২ কিলোমিটার একটি বনের অর্ধেকের বেশি।

যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে এপ্রিল মাসে দাবানলে এক হাজার একর জমি পুড়ে যায়। ফ্লোরিডায় দাবানলে হাজারো মানুষকে বাড়ি থেকে সরিয়ে নিতে হয়। আরিজোনা থেকেও অগ্ন্যুৎপাতের কারণে বহু মানুষকে ঘরছাড়া করতে হয়। নর্থ ক্যালিফোর্নিয়ায় দাবানলে পুড়ে যায় ২৩ হাজার একর।

সেপ্টেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়ায় ৪৯টি নতুন দাবানলের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৩৬ জনের মৃত্যু হয়। অক্টোবরেও দাবানল চলতে থাকে। এক লাখের বেশি মানুষকে ঘরছাড়া হতে হয়। নভেম্বরে নেভাডায় নতুন দাবানলে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

ইউক্রেন: ইউক্রেনের চেরনোবিলে অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে। এতে চারজনের মৃত্যু, ৯ জন আহত ও ১১০টি বাড়ি পুড়ে যায়। ইউক্রেনের লুশাঙ্কে ১১ জনের মৃত্যু ও ১৭ জন আহত হন অক্টোবরে।

ভারত: ফেব্রুয়ারিতে বনে অগ্ন্যুৎপাতে কেরালা রাজ্যে অন্তত তিনজন বন কর্মকর্তা মারা যান। একই রাজ্যে মার্চ মাসে এক শিশুসহ তিন জনের মৃত্যু হয় অগ্ন্যুৎপাতে।

চীন: চীনের সিচুয়ান প্রদেশে বনে অগ্ন্যুৎপাতে ১৮ দমকল কর্মীসহ ১৯ জন মারা যান।

ফিলিপাইন: বছরের শুরুতেই ফিলিপাইনে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে অন্তত ৩৯ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। দেশটির পর্যটন আকর্ষণীয় অঞ্চল তালে ১২ জানুয়ারি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণহানির পাশাপাশি হাজারো মানুষকে ঘরবাড়ি থেকে সরিয়ে নিতে হয়। অনেক অঞ্চল অগ্ন্যুৎপাতের ছাইয়ে ঢেকে যায়। এ ঘটনায় হতাহতের পেছনে কর্তৃপক্ষের অসচেতনতাকে দায়ী করা হয়।

আমাজন: পৃথিবীর ফুসফুস’খ্যাত ব্রাজিলের আমাজনের রেইনফরেস্টে জুন মাসে দাবানলের ঘটনা বেড়েছে ২০ শতাংশ। ১৩ বছরের মধ্যে এক মাসে এটি সর্বোচ্চ দাবানল ব্রাজিলের কর্মকর্তারা জানান, ১৮৮০ সাল থেকে নিয়ে ২০১৯ পর্যন্ত দুই হাজার ২৪৮টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে আমাজনে।

তুরস্ক: তুরস্কে হাজারো গাছ পুড়ে যায়। হ্যাথান প্রদেশে পৃথক দাবানলে ১০ জন আহত হন। পৃথক ঘটনায় তুরস্কে অনেক কৃষিভূমি পুড়ে যায়। গ্রিসেও ঘটে অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা। ডিসেম্বরে কাসটামুন প্রদেশের ইনেবোলু জেলায় অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে। ১০ ঘণ্টার চেষ্টায় এটির নিয়ন্ত্রণ আনেন দমকল কর্মীরা।

এছাড়া স্কটল্যান্ডে গরম হাওয়া থেকে সৃষ্ট অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদেও দাবানলের ঘটনা ঘটে। তাতে কিছু বাড়ি খালি করতে হয় ও আগুন নেভাতে হিমশিম খেতে হয় ফায়ার ফাইটারদের। অক্টোবর মাসে শ্রীলংকা, লেবানন ও ইসরায়েলেও দাবানলে ঘটনা ঘটে। আলজেরিয়ার রাজধানীতে দাবানলে দু’জন মারা যান। এর বাইরে আরও কিছু ছোট দাবানল ও অগ্ন্যুপাতের ঘটনা ঘটে।

এসব কারণে করোনা মহামারিতে সব কিছু থমকে থাকার পরও বিদায়ী বছরটি ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণ বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ তিনটি বছরের একটি বলেছে ওয়ার্ল্ড মেটেওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন।

২০২০ সালের বৈশ্বিক জলবায়ু প্রতিবেদনে বলা হয়, সমুদ্রের তাপমাত্রা রেকর্ড স্তরে পৌঁছেছে। রিপোর্টে বলা হয়, কোভিড-১৯ এর কারণে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কিছুটা কমলেও বিশ্ব এখনও তাপমাত্র ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জলবায়ুর প্রভাবে মানুষের স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যা জটিল আকার ধারণ করছে।

জুনে ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব:

চলতি বছরের মে মাসে ভারতের পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশে আছড়ে পড়া সাইক্লোন আম্পান শতাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। টাইফুন বাভিতে উত্তর কোরিয়ায় ভয়াবহ বন্যা, টাইফুন হাইশেন আর অক্টোবরে ফিলিপিন্সে আঘাত হানা শক্তিশালী ঝড় গনিও বিশ্ব গণমাধ্যমে উঠে আসে।

দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত বিশ্ব:

আগাস্টে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ভিডিও পুরো দুনিয়াকে আতঙ্কিত করেছে। ওই ঘটনায় দুই শতাধিক লোকের মৃত্যু হয়। মজুদ রাসায়নিকের গুদামে বিস্ফোরণের এ ঘটনা যেন স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞে মানুষ আর পৃথিবীর কী পরিণতি হতে পারে।

আগাস্টেই ভারতের কেরালায় এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিমান দুর্ঘটনায় পড়লে মৃত্যু হয় ১৯ জনের। এছাড়াও, চলতি বছর ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের বিশাখাপত্তমে একটি রাসায়নিক প্ল্যান্ট থেকে গ্যাস লিকেজের ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়, আহত হয় ৫ হাজারের বেশি মানুষ।

এছাড়া চলতি বছর চীনের বেশ কয়েকটি খনিতে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। মিয়ানমারের কাচিনে জেড পাথরের খনিতে ভূমিধসের ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ১৭৪ জনের। ইরানে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ১৭৬ আরোহীর সবার মৃত্যুর পর মে মাসে পাকিস্তানের আবাসিক এলাকায় আছড়ে পড়া একটি বিমানের ৯৯ আরোহীর ৯৭ জনের মৃত্যু হয়।

প্রকৃতি কেড়েছে প্রাণ ও সম্বল:

মে মাসে সোমালিয়ায় হঠাৎ বন্যায় ২৪ জনের মৃত্যু হয়। চীনে বছরের মাঝামাঝি বন্যায় নিখোঁজ ও মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪১-এ। ব্রহ্মপুত্রের বন্যায় ভারত ও নেপাল মিলিয়ে মৃত্যু হয় ১৮৯ জনের। এজিয়ান সাগরে অক্টোবরের ৭ মাত্রার ভূমিকম্প গ্রিস ও তুরস্কে ৮১ জনের প্রাণ কেড়ে নেয়। জুনে মেক্সিকোতে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প ৬৪০ কিলোমিটার দূরের এলাকাকেও কাঁপিয়ে দেয়।

মানুষ সৃষ্ট দুর্যোগে অস্তিত্ব সঙ্কটে প্রকৃতি:

আর্কটিক সার্কেলের ভেতর সাইবেরিয়ার নরিলস্ক শহরের কাছে আমবারনায়া নদীতে ২০ হাজার টন তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় মে’তে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে জরুরি অবস্থাও জারি করতে হয়। মরিশাসের প্রবালপ্রাচীরে আটকে যাওয়ার পর ভেঙে পড়া জাপানি নৌযান ওয়াকাশিও থেকেও প্রায় ১ হাজার টন তেল সমুদ্রে ছিটকে পড়ে।

স্বপ্নের দামে বেচা প্রাণ:

দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইউরোপে অভিবাসনপ্রত্যাশী অনেক নৌকা ডুবি ও প্রাণহানিরও ঘটনা ঘটেছে চলতি বছরও। অক্টোবরে সেনেগাল উপকূলের কাছে এমনই এক ঘটনায় অন্তত ১৪০ অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যুর খবর দিয়েছে অভিবাসন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইওএম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here