২০২০: হিসাব-নিকাশেই বছর পার বিএনপির

এস এম আতিক হাসান:২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করার কারণে পুরো পাঁচ বছর সংসদের বাইরে থাকতে হয়েছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে। অনেক নাটকীয়তার পর ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও বিএনপির ‘ফলাফল সরকারের নিয়ন্ত্রিত ছিল’ বলে অভিযোগ ছিল দলটির। এজন্য বিএনপি ‘নির্বাচনী জালিয়াতি’কে দুষলেও সরকারি দল আওয়ামী লীগ বলেছে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার কথা। নির্বাচনের পরের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে বিএনপি বছরজুড়ে আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে থাকলেও বিদায়ী বছরে অর্থাৎ ২০২০ সাল মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে অনেকটা কর্মসূচিহীন ছিল দলটি।

সফলতা-ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত ২০২০ সাল কেমন কেটেছে বিএনপির? উত্তরটা এক কথার নয় বটে, তবে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ, দলীয় প্রধান দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি, করোনাকালে সাংগঠনিক কার্যক্রম ও ত্রাণ কর্মসূচি, করোনায় দলের একাধিক নেতার মৃত্যু এবং বছরের শেষ ভাগে এসে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে আরও একটি বছর পার করলো বিএনপি। আসুন পাঠক একনজরে দেখে নিই বিএনপির ২০২০:

ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ
বিদায়ী বছরের শুরুটা হয়েছিল অনেকটা চাঙ্গা ভাব নিয়ে। ঢাকার দুটি সিটি (উত্তর ও দক্ষিণ) করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে বছরের শুরুতেই ঢাকার রাজনীতিতে নিজেদের অস্তিত্ব ও প্রভাব নতুন করে জানান দিয়েছিল বিএনপি। ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে বেশ প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছিল এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি। মিছিল-গণসংযোগের ফলে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছিল। যদিও দুই সিটিতেই টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের কাছে হেরে যান বিএনপির প্রার্থীরা। অবশ্য নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে হরতালও ডাকে দলটি, ওই হরতালের দিন শীর্ষ কয়েকজন নেতাকে রাজপথেও দেখা যায়।

খালেদা জিয়ার মুক্তি
দুটি মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাভোগ করছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। দলীয় নেতাকর্মীরা নানা সময়ে তথাকথিত মানববন্ধন ও কিছু ধরাবাঁধা কর্মসূচির মধ্যেই বেগম জিয়ার মুক্তির চেষ্টা চালায়। দলীয় প্রধান কারাগারে থাকার পরও বিএনপির মতো একটি বৃহৎ শক্তির দল সরকারের সব বাধা অগ্রাহ্য করে বড় কোনও আন্দোলন গড়ে তুলেতে পারেনি। বেগম জিয়ার মুক্তির দাবিতে দলের সব কর্মসূচিই নিষ্ফল হয়। শেষ পর্যন্ত করোনা মহামারির শুরুর দিকে মানবিক দিক ও বয়স বিবেচনায় শর্তসাপেক্ষে খালেদা জিয়াকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন মুক্তি দেয় সরকার। পরে সেই মুক্তির মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়। মুক্তির পর থেকেই খালেদা জিয়া আছেন তাঁর গুলশানের বাসা ‘ফিরোজা’য়। এখানে থেকে এখন পর্যন্ত খালেদা জিয়া সিনিয়র কয়েকজন নেতা ও চিকিৎসক ছাড়া কাউকে সাক্ষাৎ দেননি। এরইমধ্যে দিনের পর দিন রাজনীতিতে বেগম জিয়ার নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা নিয়েও দল ও দলের বাইরে কথা উঠে। তবে এখন পর্যন্ত বেগম জিয়াকে সামনে রেখেই সরকার পতনের আন্দোলনের সব চেষ্টা চালাচ্ছে দলটি।

করোনাকালে সাংগঠনিক কার্যক্রম ও ত্রাণ কর্মসূচি
সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পরের মাসেই দেশে প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। রাষ্ট্রীয় বিধি-নিষেধের কারণে বিএনপিকেও ভার্চুয়াল কর্মসূচি চর্চায় চলে যেতে হয়। এ কারণে প্রায় সাত মাস (২২ মার্চ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম ও কমিটি গঠন এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ থাকে। যদিও এর মধ্যেই ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুল আলীম নকিকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

সভা-সমাবেশ ভার্চুয়ালি করলেও করোনায় স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জামসহ ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচিতে বেশ তৎপর দেখা যায় বিএনপিকে। এজন্য দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে প্রধান করে করোনা ও বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কেন্দ্রীয় সেল গঠন করা হয় এবং সারাদেশে দলীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়েও এ সেল সক্রিয় করা হয়।

২০২০ সালে যাদেরকে হারিয়েছে বিএনপি
করোনা ভাইরাস বছরজুড়ে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ। এছাড়াও বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল আউয়াল খান, ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ হাসানসহ করোনায় প্রাণ হারান বিএনপির প্রায় শ’খানেক নেতাকর্মী। চলতি বছরের ১৪ জুলাই মহান স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠকারী, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য এবং সাবেক বন ও পরিবেশমন্ত্রী বিএনপি নেতা শাহজাহান সিরাজ রাজধানীর অ্যাপোলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ২৮ জুলাই বিএনপি হারায় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবুকে। তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

উপনির্বাচনে মনোনয়ন উত্তেজনা
৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফল বর্জন করেও পরে সেই নির্বাচনে জয়ীদের সংসদে যোগদান নিয়ে আগে থেকেই বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা চলছিল। এই সংসদের কয়েকটি আসনে উপনির্বাচনে প্রার্থী দেয়া নিয়ে সেই অস্থিরতা আরও তুঙ্গে ওঠে। ঢাকা-৫ আসনের উপনির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে বেশ জোরেশোরে। মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির নেতা নবী উল্লাহ নবী তার অনুসারীদের নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে গুটিয়ে রাখায় ধানের শীষের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদ বিজয়ী হতে পারেননি বলেও আলাচনা ওঠে। ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে উত্তেজনার জেরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উত্তরায় বাসার সামনে বিক্ষোভ এবং তার বাসায় ইটপাটকেল ও ডিমও ছোড়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দলের অন্তত ডজনখানেক নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া ঢাকা-১৮ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার চলাকালে গুলশান কার্যালয়ের বাইরে এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন ও কফিল উদ্দিনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। এতে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন। একজন কর্মীর মাথা ফেটে যায়।

অসুস্থ রিজভী
গত ১৩ অক্টোবর দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের এক অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলে তাৎক্ষণিক তাকে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। বুকে ব্যথা অনুভব হলে পরক্ষণেই নিকটস্থ কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। রিজভী অসুস্থ থাকাকালীন অবস্থায় চিঠি ইস্যু করে বিএনপির দফতরের চলতি দায়িত্ব দেয়া হয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (ময়মনসিংহ বিভাগ) এমরান সালেহ প্রিন্সকে। পরে অবশ্য সুস্থ হয়ে স্বপদে ফিরেন নানা কঠিন সময়ে জাতীয়তাবাদী দলের পরীক্ষিত নেতা রিজভী।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন কমিটি
মহামারির কারণে কর্মসূচি সীমিত করলেও বিএনপি গত ২৬ নভেম্বর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনে স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করে। এতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে প্রধান করা হয়। এই কমিটি আগামী ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপনকেন্দ্রিক বিএনপির কর্মসূচিগুলো পালনের অগ্রভাগে থাকবে।

২০ দলের সাথে দূরত্ব বেড়েছে
দীর্ঘদিনের জোট ২০ দলের সঙ্গে আগে থেকেই দলটির দূরত্ব প্রকাশ পাচ্ছিল। তাদের সঙ্গে থেকেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে আরেকটি জোট গঠন করে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। কিন্তু ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব, বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী, মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো নেতাদের নিয়ে গড়া এই জোটও ভোটের মাঠে অকার্যকর প্রমাণ হওয়ায় এখন ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গেও অনেক বিষয়ে বিএনপির বনিবনা হচ্ছে না বলে দলীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়। আবার তারা ২০ দলকে একপাশে রেখে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করায় ওই পুরোনো জোটের কিছু দল মিলে গড়ে তোলে ‘জাতীয় মুক্তিমঞ্চ’ নামে নতুন প্লাটফর্ম। এমন নানা জটিলতায় পড়ে বিএনপি এখন যেন ‘একলা চলো নীতি’ নিয়েছে। বিভিন্ন সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে অংশ নেয়াসহ অনেক সিদ্ধান্তই তারা নিচ্ছে জোট শরিকদের সঙ্গে কোনও আলোচনা ছাড়াই, অনেকটা একক ও একতরফাভাবে। বিএনপির এমন ‘একলা চলো নীতি’র পক্ষে সাফাই গেয়ে আবার দলটির নেতারাও বলছেন, জোট হয়েছে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য, নির্বাচনের জন্য নয়। আবার ৪ দলীয় জোট সরকারের অন্যতম শরিক জামায়াতের সঙ্গেও বিএনপির রাজনৈতিক পলিসিগত টানাপোড়েন চলছে। নানা ইস্যুতে ধর্মভিত্তিক এই দলটির সঙ্গে ক্রমশ দূরত্বও বাড়ছে।

সর্বশেষ গত ১৪ ডিসেম্বর রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের বিরুদ্ধে অবস্থান ছিল বিএনপির হাইকমান্ডের। ওইদিন জাতীয় প্রেসক্লাবে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের আলোচনা সভায় অংশ নেন দলটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদ। তবে সেই অনুষ্ঠানে দলের আরেক ভাইস-চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমের থাকার কথা থাকলে তিনি ছিলেন না। ওই অনুষ্ঠান শেষে কিছু নেতাকর্মী মুক্তাঙ্গন ঘেঁষে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। পরে লাঠিপেটা করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ।

দলের সিদ্ধান্ত ছাড়া হঠাৎ বিক্ষোভ সংগঠিত করার পেছনে মেজর হাফিজ উদ্দিন ও শওকত মাহমুদের হাত রয়েছে বলে মনে করেন দলের অনেক সিনিয়র নেতা। ওইদিনই সন্ধ্যায় শওকত মাহমুদ ও হাফিজ উদ্দিন আহমদকে শোকজ করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর শোকজের জবাব দেন শওকত মাহমুদ। তবে এতে তিনি কী লিখেন, তা জানা যায়নি। ১৯ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে হাফিজ উদ্দিন বলেন, দলে মুক্তিযোদ্ধাদের কোণঠাসা করতে একটি মহল সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এছাড়াও প্রায় তিন দশক ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এই সিনিয়র নেতা সংবাদ সম্মেলনে অতীতের বিতর্কিত নানা দিক তুলে ধরে আপেক্ষ প্রকাশ করার পাশাপাশি দলের প্রতি আকণ্ঠ আনুগত্যও প্রকাশ করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here