করোনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ‘বাড়ছে মাস্কের দাম’

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়:

বেড়েছে করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রকোপ। করোনার সঙ্গে সঙ্গে অনেকটা তাল মিলিয়ে বেড়েছে মাস্কের দাম। সরকারের অব্যাহত অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের কারণে রাজধানীতে গণপরিবহনের যাত্রী থেকে শুরু করে পথচারী ও ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণির মানুষের মাঝে মাস্কের ব্যবহার বেড়েছে। যারা নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করতেন না কিংবা অনীহাবোধ করতেন তারাও বাধ্য হয়ে মাস্ক ব্যবহার করছেন। আবার শীতের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে করোনার বিস্তারের বিষয়ে দুশ্চিন্তায়ও আছেন অনেকে। মাস্কের বাধ্যতামূলক ব্যবহারের সঙ্গে চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে বলেও ক্রেতা-বিক্রেতারা অভিযোগ করছেন।

জানা যায়, তিন ধরনের কাপড়ের মাস্ক তৈরি হচ্ছে। নন ওভেন ফেব্রিকসের তৈরি মাস্ক, ওভেন কাপড় (শার্টের কাপড় বলে পরিচিত) ও নিট কাপড়ের মাস্ক (গেঞ্জির কাপড় বলে পরিচিত)। রাজধানী ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন দামের এবং মানের অন্তত ১০ ধরনের মাস্ক পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে দুই ধরনের মাস্ক আমদানি করা। বাকিগুলো দেশেই তৈরি হয়। সেখানকার বিক্রেতারা নন ওভেন ফেব্রিকসের পাতলা সার্জিক্যাল মাস্ক (টিস্যু কাপড় বলে পরিচিত), মেল্টব্লোন কাপড়ের মাস্ক, কেএন-৯৫ মাস্ক, এন-৯৫ মাস্ক, এন-৯৫থ্রি এম মাস্ক, নিঞ্জা মাস্ক, পিপি ওভেন ফেব্রিকসের মাস্ক, ওভেন কাপড়ের মাস্ক, নিট কাপড়ের মাস্ক এবং সোয়েটারের কাপড়ের মাস্কও বিক্রি করছেন। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন পোশাকের ব্র্যান্ডের দোকানেও এখন মাস্ক বিক্রি হচ্ছে। ব্র্যান্ডের দোকানের মাস্কের দামও বেশ চড়া। সেখানে ১৫০ থেকে শুরু করে হাজার টাকা দামেরও মাস্ক বিক্রি হচ্ছে।

বিক্রেতারা জানান, সার্জিক্যাল মাস্ক ও এন-৯৫ মাস্কের সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে। ৫০টি মাস্কের এক বক্স সার্জিক্যাল মাস্ক ৭০-৮০ টাকা এবং ১০টির এন-৯৫ মাস্কের প্যাকেট ২০০-২২৫ টাকা পাইকারি দামে বিক্রি করেছি। কিন্তু এখন নরলাম সার্জিক্যাল মাস্ক ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, উন্নতমানের সার্জিক্যাল মাস্ক ১৮০ থেকে ২৫০ টাকা এবং এন-৯৫ মাস্ক ২৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।

রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায় মাস্ক কিনতে এসেছেন মুরাদ রহমান নামের এক ব্যবসায়ী। তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে খুচরা মাস্ক বিক্রি করেন। তিনি ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘এক মাস আগেও যে মাস্ক ৭০ টাকা বক্স কিনেছিলাম সেই একই মাস্কের বক্স এখন কিনতে হচ্ছে ১২০ টাকা বক্স। ১২০ টাকা বক্স করে কিনে ১৫০ টাকা দামে বিক্রি করতে হবে। কিন্তু সমস্যাটা হল ক্রেতারা বাড়তি দামে মাস্ক কিনতে চাইবেন না। তাদেরকে বোঝানো যাবে না দাম কেন বাড়লো।’

মিটফোর্ড এলাকার পাইকারি মাস্ক বিক্রেতা কল্লোল বিশ্বাস বলেন, ‘করোনা বেড়ে যাওয়ার জন্য হঠাৎ করেই মাস্কের দাম বেড়েছে। তবে আমাদের থেকে দাম বাড়ানো হয়নি। ফ্যাক্টরি থেকেই বেশি দামে আমাদেরকে কিনে আনতে হচ্ছে। বেশি দামে কিনে আনার কারণে বাধ্যহয়েই আমাদেরকেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তবে আগের মতো লাভও বেশি হচ্ছে না।’

বাজারে মাস্কের সংকট আছে অথবা সংকট হতে পারে কি-না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘না। এখন পর্যন্ত বাজারে কোনো ধরনের সংকট নেই। দেশে করোনার প্রথমে যেমন মাস্কের দাম হু হু করে বেড়েছিল। এখন আর তেমনটি হবে না। তবে কয়েকদিন আগের দামের চেয়ে কিছুটা দাম দিয়ে কিনতে হবে বলেও জানান এই পাইকারি ব্যবসায়ী।’

এই পাইকারি ব্যবসায়ী আরও বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগেও দিনে দেড়শ থেকে ১৮০ বক্স মাস্ক বিক্রি হতো। গত কয়েকদিনে দিগুণ হারে বিক্রি করছি।’

কথা হয় মাস্ক কিনতে আসা জসিম বিশ্বাস নামের এক ক্রেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দাম বাড়লে আমাদের কী করার আছে? আমাদের তো মাস্ক পরেই বাইরে বের হতে হয়। এক সপ্তাহ আগেও এক বক্স মাস্ক ১০০ টাকা দিয়ে কিনেছি কিন্তু এখন ১৩০-১৫০ টাকার নিচে তো কিনতে পারছি না। সার্জিক্যাল, এন-৯৫ ও কাপড়ের তৈরিসহ সব ধরনের মাস্কের দাম বেড়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, এভাবে সাধারণ মানুষকে জিম্মি না করে সরকারি নিয়ন্ত্রণে মাস্কের সরবরাহ নিশ্চিত করা উচিত। করোনার মাঝে মানুষের আয় নেই, আবার মাস্কও পরতে হচ্ছে। এই মানুষগুলো কিভাবে বেশি দাম দিয়ে মাস্ক কিনবে?’

বাজারে মাস্কের সংকট নেই জানিয়ে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকায় পাইকারি মাস্ক ব্যবসায়ী মাহমুদ হোসেন  বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ী, দাম বাড়লে আমরা কী করবো? বাজারে তো মাস্কের সংকট নেই কিন্তু তারপরও দাম বাড়ছে। এক সপ্তাহ আগেও মানুষ কম দামে মাস্ক কিনেছে, আমরাও বিক্রি করেছি। কিন্তু এখন এক বক্স মাস্কের দাম ৩০ থেকে ৫০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। তাহলে আমরা তো বেশি দামেই বিক্রি করব। যারা তৈরি করে কিংবা আমদানি করে তারাই মাস্কের দাম বাড়ার বিষয়ে ভালো জানে। তবে দাম বাড়লেও শীতের কারণে করোনা বাড়ছে এ আতঙ্কে মানুষ মাস্ক কিনছে।’

বাসের মধ্যে হকারের কাছ থেকে মাস্ক কিনছিলেন রিয়াজুল বাসার। জানতে চাইলে দামের বিষয়ে তিনি ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘প্রতিদিনই বাইরে বের হতে হয়। শুনেছি মাস্ক না পরে বের হলে জরিমান দেয়া লাগবে। তাই দাম বাড়লেও কিনতে হবে, আবার কমলেও কিনতে হবে। আমাদের তো আর কোনও সুযোগ নেই।’

মাস্ক ব্যবহার সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রাব্বানীবলেন, ‘গত দুই সপ্তাহ হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় করোনা আক্রান্তের হার বেড়েছে। এর জন্য আমরা সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মাস্ক ছাড়া প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষেধ এবং প্রশাসন ‘নো মাস্ক-নো সার্ভিস’ রুলস কঠোরভাবে ফলো করছে। এর বাইরে অপ্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থানকে নিরুৎসাহিত করছে।’

মাস্ক ব্যবহারে কড়াকড়ি:
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে রাজধানীর জনবহুল চারটি স্পট শাহবাগ, ফার্মগেট, সিটি কলেজ জিগাতলা এবং মিরপুর ও এর আশপাশের এলাকায় একযোগে অভিযান শুরু করে র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় মাস্ক ব্যবহার না করায় এক চালককে ৩০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। শাহবাগ মোড়ে আদালত পরিচালনা করেন র‍্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু।

পলাশ কুমার বসু  বলেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় সরকার সবার মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক করেছে। প্রত্যেকের মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে সচেতনতামূলক এই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। শাহবাগের মতো জনবহুল একটা এলাকায় বেশির ভাগ মানুষকে মাস্ক পরিধান করতে দেখা গেছে। তবে অনেকেই এখনো এ ব্যাপারে উদাসীন। কারো কারো সাথে মাস্ক আছে কিন্তু তারা মাস্ক পরছেন না। এ অবস্থায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মুখোমুখি হলে অনেকেই বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে বাঁচতে চাইছেন।’

তিনি বলেন, ‘সবাইকে সচেতন করার জন্য এবং যারা মাস্ক পরছেন না তাদেরকে সংশোধনের জন্য বিভিন্ন পরিমাণ অর্থদণ্ড দেয়া হচ্ছে। অভিযানকালে প্রায় এক হাজার মানুষকে বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণ করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের উদ্দেশ্য শুধু জরিমানা নয়, সচেতনতা সৃষ্টি করা। আমরা সবার মাঝে বেশি পরিমাণে সচেতনতা সৃষ্টি করতে চায়।’

হঠাৎ করে বাজারে মাস্কের মূল্য বৃদ্ধিতে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে র‍্যাবের কোনও তৎপরতা রয়েছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘করোনার শুরু থেকেই করোনাকালীন বিভিন্ন অনিয়মের কারণে র‍্যাবের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী ও নকল মাস্ক তৈরিকারীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। বর্তমানেও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তৎপর রয়েছে র‍্যাব।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here