টয়লেট পেপার আবিষ্কারের আগে ব্যবহার হত কাঠি

নিউজ ডেস্কঃটয়লেট পেপার বা টয়লেট টিস্যু যে নামেই বলেন না কেন, এই পেপারের কাজ কিন্তু সবারই জানা। রেস্টুরেন্ট কিংবা চলতি পথে, নানা কাজে টিস্যু পেপার এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, টিস্যু পেপার ছাড়া এখন কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান চলেই না।

খাবারের শেষে, কপালের ঘাম মুছতে, হাতমুখ ধোয়া শেষে টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ না মুছলে যেন চলেই না। ব্যক্তিগত, পারিবারিক জায়গা থেকে সামাজিক অনুষ্ঠান পর্যন্ত টিস্যু পেপার এনেছে বড় পরিবর্তন। পরিচ্ছনতার ধারণা বদলে দিয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এনেছে নতুন মাত্রা।তবে মলমূত্র ত্যাগের পর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য টয়লেট টিস্যুর বিকল্প আর কিছুই নেই।

জাপানিরা এমন কাঠি ব্যবহার করত

জাপানিরা এমন কাঠি ব্যবহার করত

ঠিক কবে থেকে টিস্যু পেপার ব্যবহার শুরু হয়েছে তার সঠিক ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ শতকের দিকে সর্বপ্রথম শৌচকাজে এক ধরনের নরম কাগজ ব্যবহার করত। আর ৮৫১ সালের দিকে চীনে প্রথম টয়লেট টিস্যুর ব্যবহার শুরু হয়েছে বলেও শোনা যায়। যদিও এই দুটি ইতিহাসের কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই।

 

যেহেতু বিশ্বে প্রথম কাগজ তৈরি হয় চীনে। স্বাভাবিক কারণে শৌচকর্মে ব্যবহার করার জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় কাগজও সে দেশেই সৃষ্টি হয়। ইতিহাস বলছে, ষষ্ঠ খ্রিস্টাব্দে চীনে টয়লেট পেপার ব্যবহার করার রীতি চালু ছিল। এরপর চতুর্দশ শতকে মিং বংশের শাসনকালে চীনের রাজ প্রাসাদে এই কাগজের ব্যবহার জনপ্রিয় হয়। ১৩৯৩ সালে শুধুমাত্র রাজ পরিবারের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য বছরে ৭,২০,০০০ টুকরো টয়লেট পেপার দরকার হত। প্রতিটি টুকরোর মাপ ছিল ৬০ সেমি X ৯০ সেমি।

গ্রীক এবং রোমানরা ওভাল বা বৃত্তের আকারে গোলাকার শত্রুর নাম লেখা সিরামিক টুকরা ব্যবহার করত

গ্রীক এবং রোমানরা ওভাল বা বৃত্তের আকারে গোলাকার শত্রুর নাম লেখা সিরামিক টুকরা ব্যবহার করত

ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪০০ সালের দিকে চীনের মিং সাম্রাজ্যের রাজত্বকালে সর্বপ্রথম টিস্যু পেপারের বহুরূপী ব্যবহার শুরু হয়। রাজকীয় পণ্যসামগ্রীর তালিকায় তখনকার ব্যবহৃত টিস্যু পেপারের আকৃতি ছিল প্রস্থে দুই ফুট ও দৈর্ঘ্যে তিন ফুট। ক্রমেই এই টিস্যু পেপারের আধুনিকায়ন হতে থাকে।

 

এরপর টিস্যু পেপারের বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয় ১৮৫৭ সালে। মার্কিন যুক্তরাষ্টের জোশেফ গোয়েত্তি সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক টয়লেট টিস্যু উদ্বোধন করেন। কিন্তু এটি দামে অনেক বেশি হওয়ায় তার প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। তবে ১৮৯০ সালে স্কট পেপার কোম্পানি টিস্যুকে রোল করে আকর্ষণীয় মোড়কে বাজারজাত শুরু করলে এটি দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

দাম বেশি থাকায় প্রথম দিকে এটিকে বিলাসী পণ্য হিসেবেই ব্যবহার করা হতো। ১৯২০ সালে বিশ্বব্যাপী এর বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়। আমরা বর্তমানে যে নরম টিস্যু পেপার ব্যবহার করি সেটির প্রচলন শুরু হয় ১৯৯০ সালে লন্ডনে। বর্তমানে এটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, কেবলমাত্র আমেরিকানরাই জনপ্রতি বছরে প্রায় ২৪ রোল টিস্যু পেপার ব্যবহার করে থাকে।

গাছের ছাল, পাতা, পশুর চামড়াও ব্যবহার হত পরবর্তী সময়ে

গাছের ছাল, পাতা, পশুর চামড়াও ব্যবহার হত পরবর্তী সময়ে

আচ্ছা টয়লেট পেপার ব্যবহারের ইতিহাস তো জানা গেল। তবে টয়লেট পেপার আবিষ্কারের আগে মানুষ কি ব্যবহার করতেন। কীভাবেই বা নিজেদের পরিষ্কারের কাজটি করতেন। জানেন কি সেসব? চলুন জেনে নেয়া যাক সেই ইতিহাস-

গ্রীক এবং রোমানরা ওভাল বা বৃত্তের আকারে গোলাকার সিরামিক টুকরা ব্যবহার করত। যেগুলোতে লেখা থাকত তাদের শত্রুদের নাম। এই সিরামিকের টুকরোকে বলা হত পেসসোই। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা গ্রীক এবং রোমান সাম্রাজ্যের পাওয়া বিভিন্ন নথি থেকে এটি আবিষ্কার করেছিলেন। এমনকি একবার একটি গুহায় পাওয়া যায় সেই সময়কার মানুষের মল। যা পরীক্ষার পর পেসোইয়ের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেয়েছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।

আগেকার সময়ে এমন ধরনের টয়লেট ব্যবহার হত

আগেকার সময়ে এমন ধরনের টয়লেট ব্যবহার হত

সেই সময়কার মানুষেরা সিরামিকের টুকরোর উপরে তাদের শত্রুদের নাম খোদাই করে লিখত। এরপর তা ব্যবহার করত টয়লেট পেপার হিসেবে। এমনকি পাবলিক টয়লেটগুলোতে তারা পেসসোই রেখে দিত। যেই এই টয়লেট ব্যবহার করবে সেই তার শত্রুর বিরুদ্ধে কিছু করতে পারল বলে ভেবে নিতে পারবে। অর্থাৎ এটিও তাদের এক ধরনের যুদ্ধ বলা যায়। শত্রুর বিরুদ্ধে কিছু করা।

অষ্টম শতাব্দীর দিকে জাপানীরা তাদের মলদ্বারের বাইরের এবং অভ্যন্তর পরিষ্কার করার জন্য এক ধরণের কাঠের কাঠি ব্যবহার করত। যেটার নাম ছিল চুগি। এছাড়াও পানি, পাতা, ঘাস, পাথর, পশুর চামড়া এবং ঝিনুক ব্যবহার করত। এটি ছিল প্রাচীনকালের মানুষের কথা। আর মধ্যযুগে মরিসন জাতিরা ব্যবহার করত শ্যাওলা, গাছের ছাল, খড়, এবং কাপড়ের টুকরো।

ধীরে ধীরে শুরু হয় কাগজের তৈরি টয়লেট টিস্যু

ধীরে ধীরে শুরু হয় কাগজের তৈরি টয়লেট টিস্যু

লোকেরা এতসব জিনিস ব্যবহার করেছিল যে একজন ফরাসী ঔপন্যাসিক ফ্রান্সোইস রাবেলাইস ষোড়শ শতাব্দীতে এই বিষয়টি নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লিখেছিলেন। তার কবিতা পশ্চিমা বিশ্বে টয়লেট পেপারের প্রথম উল্লেখ করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন এদের শুধু হাঁসের মাথা ব্যবহার করাই বাদ আছে।

 

তবে যে যাই বলুক না কেন, ধীরে ধীরে আধুনিক এবং সভ্যতার মধ্যে এই ব্যাপারগুলো আপনাআপনি ঢুকে গেছে। তারপরও বিশ্বের অনেক দেশে এখনো সঠিক স্যানিটাইজেশন ব্যবস্থা নেই। যে কারণে অনেক মানুষ বিশেষ করে শিশুরা কলেরা, ডায়রিয়া সহ নানা অসুখে ভুগে মারা যায়।

সাদা ছাড়াও গোলাপি রঙের টয়লেট পেপার ব্যবহার করা হয়

সাদা ছাড়াও গোলাপি রঙের টয়লেট পেপার ব্যবহার করা হয়

শুধু মর্ত্যবাসীরাই নন, টয়লেট পেপার ছাড়া অচল মহাকাশচারীদের জীবনযাপনও। মহাকাশযান বা আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনের ভেতরে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি মাধ্যাকর্ষণের তীব্রতা খুবই কম। এই কারণে শৌচাগারের বর্জ্য পরিষ্কার করতে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। তবে সেখানেও টয়লেট পেপার ব্যবহার না করে থাকতে পারেন না বিজ্ঞানীরা। ব্যবহৃত সেই সমস্ত টয়লেট পেপার মুখবন্ধ পাত্রে সংরক্ষিত থাকে। পৃথিবীতে ফিরে আসার পরে তা বিনষ্ট করা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here