‘দুই বছরের চুক্তিতে এসেছি, এর আগে বদলি হবে না’

বরিশাল প্রতিনিধি:বরিশালের বাকেরগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালাম মাসিক আয় কয়েক লাখ টাকা।  আসামি ধরা-ছাড়া নিয়ে মাসে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন ওসি এমন গুঞ্জন এলাকার বাসিন্দাদের।  তার কাছে জিম্মি হয়ে নিরীহ মানুষকেও বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে ছাড়া পেতে হচ্ছে।  এছাড়া দাবিপূরণ না হলেই নিরীহ মানুষকে মামলা দিয়ে হয়রানি করারও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়রা দাবি করেন, ওসি আবুল কালাম বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করায় উপজেলায় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, ধর্ষণ, হত্যাসহ অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে।  ওসির এমন অবৈধ কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।

ওসি আবুল কালাম বাকেরগঞ্জ থানায় যোগদানের পর এ থানায় ১৬ মাসে ৯ জন খুন হয়েছে বলে তথ্য রয়েছে।  খুনিরা যেন নির্ভয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর স্থান হিসেবে বাকেরগঞ্জকে বেছে নিয়েছেন।  ১৬ মাসে খুন হয়েছেন উপজেলার নিয়ামতি ইউনিয়নের কলেজ ছাত্র সজীব (২৪), ভরপাশা ইউনিয়নের ইমরান(২৫), বাকেরগঞ্জ পৌরসভা ২নং ওয়ার্ডের সুমাইয়া বেগম (২৮), কবাই ইউনিয়নে আপাং তালুকদার (৩০), গারুরিয়া ইউনিয়নে ফয়সাল রহমান প্রিন্স (২৫), দুধল ইউনিয়নে রুমান (২২), কবাই ইউনিয়নে পিতা পুত্র, রঙ্গশ্রী ইউনিয়নে কালাম মৃধা (৪০)।

সূত্র জানায়, ওসির সেল্টারে দখল বাণিজ্য থেকে শুরু করে জুয়া ও মাদক বেচা-বিক্রি রমরমা বাকেরগঞ্জে।  তার দম্ভোক্তি দুই বছরের চুক্তিতে এসেছি ‘আমি যখন যেখানে যেতে চাই সেখানেই বদলি হই, না চাইলে কেউ বদলি করতে পারবে না’।  তাই তিনি দাপট দেখিয়ে মাসোহারা ও ধরা-ছাড়ার বাণিজ্য শুরু করেন।  অপরাধীদের সঙ্গে ওসির সখ্যতা থাকায় অপরাধ প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ সদস্য জানায়, ওসি নিজে তদারকি করে রাতের ডিউটি বন্টন করে দেন।  বন্টনের পূর্বেই অফিসারদের বলে দেয়া হয় যে কোন মূল্যে লোকজন ধরতে হবে এবং ধরার পর উৎকোচ নিয়ে ছেড়ে দিতে হবে। রাতের টার্গেট দিয়ে দেয়া হয় অফিসারদের।  যার ফলে দায়িত্বে থাকা অফিসাররা টার্গেট পূরণ করতে বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটান।  এ কারণে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাকেরগঞ্জের বেশ কয়েক স্থানে চেক পোস্ট বসিয়ে যানবাহনে তল্লাশির নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বাকেরগঞ্জ থানা পুলিশ।  সূত্র জানায়, ওসি আবুল কালাম বাড়ি জমি-জমাসহ অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন।  তিনি নামে-বেনামে এসব সম্পত্তি রেখেছেন।

বাকেরগঞ্জ থানায় মারামারি, জমি দখল এসব নিয়ে মামলা হলে একটি মামলার বিপরীতে আরেকটি মামলা নেয়া হয়, আসামি এবং বাদী পক্ষের মামলা নিয়ে হাতিয়ে নেয় হাজার হাজার টাকা।  প্রত্যেকটি মামলায় সর্বনিম্ন ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার করে নেয়া হয়।  এবং আসামি ধরার ক্ষেত্রে আবার আলাদা তদবিরে আলাদা ভাবে টাকা দিতে হয় টাকা না দিলে ধরে না আসামি।  আসামি না ধরার ফলে অনেক ক্ষেত্রে মেডিকেল সার্টিফিকেট ৩২৩ আসলে মামলাটি থানায় চুড়ান্ত রিপোর্ট দেয়।  এবং কিছু ক্ষেত্রে চার্জশিট দিলেও আসামিপক্ষের নাম বাদ দিতে নেয়া হয় টাকা।

বাকেরগঞ্জ থানায় মামলার পরিমাণ কমিয়ে যেকোনো ধরনের অভিযোগ পেলে উভয় পক্ষকে ম্যানেজ করে সালিশি করার ব্যবস্থা করেন থানার মধ্যে।  সালিশি করে দুই পক্ষের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে এক পক্ষকে জিতিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বহুসংখ্যক।  আবার অনেক ক্ষেত্রে দূরে কোথাও গিয়ে ওসি নিজেই সালিশি করেন যদি বিপুল পরিমাণ টাকা দেয়া হয়।

বাকেরগঞ্জের পাদ্রী শিবপুর ইউনিয়নের পারভিন আক্তার অভিযোগ করেন, তার বাবা কে কুপিয়ে জখম করে প্রতিবেশী। মামলা করার জন্য থানায় আসলে পুলিশ গড়িমসি করে।  তারপর ২০ হাজার টাকা দিয়ে মামলা করেন।  মামলার আসামি ধরার ক্ষেত্রে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি।  বাদীপক্ষ আসামি ধরার জন্য বললে ওসি বলেন আপনারাও তো মারামারি করেছেন।  তার জন্য আপনাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে।

ওসি আবুল কালামের বাড়ি পটুয়াখালী উপজেলার বাউফলে হওয়ার কারণে বাকেরগঞ্জে রয়েছে তার একাধিক আত্মীয়-স্বজন।  এলাকায় কোনো ঘটনা ঘটলে ওসির আত্মীয়রা দালালি করে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।  বাকেরগঞ্জে বিভিন্ন এলাকায় রিসোর্ট গড়ে তুলেছেন প্রভাবশালীরা।  মাদক ও জুয়ার আসর বসে।  এসব খাত থেকেও লাখ লাখ টাকা মাসোহারা পান ওসি।

ওসি যোগদানের পর থেকে বেড়েছে ডাকাতি।  গত বছরের সেপ্টেম্বরে ২/৩টি স্পিডবোটে একদল ডাকাত কলসকাঠী বাজারে পৌঁছে নৈশ প্রহরীদের কাছে নিজেদের গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয় দেয়।  একপর্যায়ে তারা নৈশ প্রহরীদের হাত-পা বেঁধে সেবা ফার্মেসি নামে একটি ওষুধের দোকানে আটকে রাখে।

বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, এরপর ডাকাতরা লক্ষ্মী জুয়েলার্স, কলসকাঠী অলংকার ভবন, কানাই কর্মকারের স্বর্ণের দোকান, পাল অলংকার ভবন, সোনারগহণা ভবনসহ ৬টি সোনার দোকান লুট করে।  এ সময় কমপক্ষে ৬০ ভরি স্বর্ণ, শতাধিক ভরি রূপা এবং নগদ কয়েক লাখ টাকা নিয়ে যায় দৃর্বৃত্তরা।

রহস্যজনক বিষয় হচ্ছে বাকেরগঞ্জ থানা থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে এই কলসকাঠি বাজার।  ঘটনা ঘটার সময় বাকেরগঞ্জ থানায় ফোন দিলেও পুলিশ সেখানে পৌঁছায় ৪ ঘন্টা পরে।  এ যেন আগে থেকেই ডাকাতরা পুলিশের সাথে কথা বলে রেখেছিল।  এ ধরনের অভিযোগ বা ঘটনার শেষ নেই।  আইনশৃঙ্খলা অবনতির জন্য থানা পুলিশের ওপর ক্ষুব্ধ স্থানীয় জন সাধারণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here