ষাটের দশকেও ঢাকায় ছিল আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স

নিউজ ডেস্ক:কখনো মুমূর্ষ রোগী আবার কখনো মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে ছুটে  চলে অ্যাম্বুলেন্স। সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস পাওয়া এখন শুধু কয়েক মিনিটের বিষয়।

ঢাকাসহ দেশের অলিতে গলিতে এখন ছুটে চলে অত্যাআধুনিক সব অ্যাম্বুলেন্স। মুমূর্ষ রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দিতে অ্যাম্বুলেন্সের বিকল্প নেই বললেই চলে। তবে জানেন কি? ৬০ বছর আগেও কিন্তু ঢাকার রাস্তায় চলত আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স। সেই অ্যাম্বুলেন্স সম্পর্কে জানাতেই আজকের আয়োজন-

 

স্বাধীনতা যুদ্ধেরও ১০ বছরে আগ মুহূর্ত। তখন কলেরাকে সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ ভেবে কতজনই না কত কিছু করেছেন। কেউবা পাপ প্রায়শ্চিত্তের কথা ভেবে আত্মহত্যাও করেছেন।

আদতে কলেরা তো কোনো অভিশাপ না, একটি রোগ। পানিবাহিত এই রোগ তখন ছড়িয়ে পড়ে দেশে। যদিও ১৮১৭ সালে এদেশে প্রথম যশোর থেকে কলেরার তাণ্ডব শুরু হয়।

 

এরপর থেকে কলেরা ভারতবর্ষেও ছড়িয়ে পড়ে। কলেরায় ঢাকায় প্রতিদিন ১৫০-২০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করত। তখন ঢাকায় উল্লেখ করার মতো কোনো হাসপাতালও ছিল না। মিটফোর্ড হাসপাতালে এই রোগের চিকিৎসা সবে তখন শুরু হয়েছে।

এভাবেই কেটে যায় কয়েক দশক। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে একসময় কলেরা রোগের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছিল। মূলত এই প্রাণ সংহারক রোগকে মূলোৎপাটিত করার প্রত্যয়েই প্রথম এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপিত হয়।

সোভিয়েত জোটের ক্ষমতা হ্রাস কল্পে আমেরিকা গঠন করে সাউথইস্ট এশিয়া ট্রিটি অর্গানাইজেশন, সিয়াটো। এদিকে মার্কিন সেনা সদস্যরা যুদ্ধবাজি করতে তখন ভিয়েতনামে।

 

এমতাবস্থায়  মার্কিন সৈন্যদের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে, কলেরা গবেষণার জন্য একটি কাঠামো স্থাপনের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই কারণে পাকিস্তান সরকার এবং সিয়াটোর যৌথ প্রকল্পের অধীনে ১৯৬০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গঠিত হয় ‘পাকিস্তান কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’।

সেই সময়কালেই ঢাকার রাস্তায় রোগী বহনের কাজে নামে আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স। ছবিতে যে অ্যাম্বুলেন্সটি দেখতে পাচ্ছেন, সেটিই ছিল তখনকার সবচেয়ে অত্যাধুনিক অ্যাম্বুলেন্স।

 

সাদার রঙের এই অ্যাম্বুলেন্সের সামনের নম্বরপ্লেটটিতে ঢাকাকে ডাক্কা লেখা দেখা যায়। সে সময় ঢাকা ‘ডাক্কা’ নামেই পরিচিত ছিল। এমনকি ইংরেজিতে লেখা হতো ‘Dacca’। অ্যাম্বুল্সেটি দেখতে অনেকটা গোলাকার ধরনের ছিল।

গাড়ির সামনের লোগো দেখে বোঝা যায়, অ্যাম্বুলেন্সটি ছিল ভক্সওয়াগন ব্র্রান্ডের। এই গাড়ির ব্র্র্যান্ড সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা রয়েছে, বেশি দামী হয়ে থাকে। ঢাকার রাস্তায় তখন রোগীর সেবায় নিয়েজিত ছিল ভক্সওয়াগনের এই অ্যাম্বুলেন্সটি।

তখনকার ঢাকার শত শত কলেরা রোগীকে বহন করেছে এই অ্যাম্বুলেন্সটি। মরণাপন্ন কলেরা রোগীদেরকে কলেরা ইনস্টিটিউটে আনার কাজটি দ্রুততার সঙ্গে পালন করত ঐতিহাসিক এই অ্যাম্বুলেন্সটি।

 

যেহেতু একদা, ভারতীয় উপমহাদেশে ‘কলেরা রোগের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছিল, তাই সংস্থাটি কলেরা’কে নির্বংশ করার প্রত্যয়ে ব্যাপক গবেষণা কার্যক্রমে নিয়োজিত হয়। ১৯৬৩ সালে চাঁদপুরের মতলবে প্রতিষ্ঠিত হয় রিসার্চ সেন্টার।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, যুক্তি সংগত কারণেই স্থবির হয়ে যায় সংস্থার কার্যক্রম। ১৯৭৮ সালে, দেশ বিদেশের কয়েকজন উদ্যোগী বিজ্ঞানী ‘কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরিকে’ একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্তরের জন্য আবেদন করে।

এরপর জাতীয় সংসদে একটি অধ্যাদেশ দ্বারা সংস্থাটির নতুন নাম হয়  ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডাইরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ’ আইসিডিডিআর, বি।

 

১৮১৭ সালে শুরু হওয়া কলেরা মহামারী ১৮২৪ পর্যন্ত কম-বেশি এর দাপট নিয়ে অব্যাহত থাকে। এরপর একই সময়ে না হলেও বিভিন্ন পর্যায়ে কলেরা বৈশ্বিক মহামারীতে পরিণত হয়। সারা পৃথিবীজুড়ে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে।

১৮৯৯ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত সময়কালে রাশিয়ার অবস্থা ছিল সবচেয়ে করুণ। এ সময়ে রাশিয়ায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ কলেরায় মারা যায়। ১৮১৭ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে ভারতে কলেরা গ্রাস করে দেড় লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ। ১৮৭৯-এর আগে কলেরার কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here