রিফাত হত্যার মূল কুশীলব মিন্নি

নিজস্ব প্রতিনিধিঃবরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার রায়ে আদালত বলেছেন, রিফাত শরীফ হত্যার মাস্টারমাইন্ড তার স্ত্রী মিন্নি। মিন্নির ইন্ধনেই আসামি নয়ন বন্ড সাড়া দিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করে।

 

নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজীসহ অন্য আসামিরা রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা করে মর্মে বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামানের রায়ে উঠে এসেছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেছেন, আয়শার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে তাকে অনুসরণ করে তার বয়সী মেয়েদের বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই এ মামলায় তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়।

গতকাল শনিবার রিফাত হত্যার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পায়। রায়ে প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির মধ্যে আয়শা সিদ্দিকাসহ ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বাকি চার আসামি খালাস পান।

রায়ের বিচারক বলেছেন, নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজী যখন রামদা দিয়ে ভিকটিম রিফাত শরীফকে কোপাচ্ছিল তখন নয়নকে ঠেকাতে মিন্নির চেষ্টা ছিল অভিনয় মাত্র। এই অভিনয়ের আড়ালে সুকৌশলে আসামি রিফাত ফরাজী যাতে ভিকটিম রিফাত শরীফকে আঘাত করতে পারে সেই সহায়তা করে মিন্নি। এর ফলে মিন্নির কারণেই রিফাত নির্মমভাবে খুন হয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের দুটি ভিডিও ফুটেজ এই মামলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জীবন্ত সাক্ষ্য। দৃশ্যটি একটু মনোযোগ সহকারে দেখলে স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন সামনে আসে যে, ঘাতকরা যখন তার স্বামীকে কোপাচ্ছিল তখন সে তাকে রক্ষার জন্য তার সামনে ঢাল হয়ে না দাঁড়িয়ে নির্ভীকভাবে ঘাতকদের একজন নয়ন বন্ডকে বারবার জড়িয়ে ধরে ও তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে তাকে ফেরানোর চেষ্টা করছিল কেন? ঐ সময় উক্ত ঘাতকরা তাকে কোনোরূপ আঘাত বা একটি ধাক্কাও মারল না কেন? উল্লিখিত অবস্থা উক্ত ঘাতকদের সঙ্গে তার বিশেষ সম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করে।

শুরুতে আয়শা এই মামলার প্রধান সাক্ষী ছিলেন। পরে তাকেও আসামি করে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দেয়।

মৃত্যুদণ্ডের ঐ রায়ে বলা হয়েছে, আসামি রিফাত ফরাজী ও মিন্নি তাদের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ঘটনার পরিকল্পনা হিসাবে যেটুকু স্বীকার করেছে সেই অনুযায়ী তাদের পরিকল্পনা ছিল ভিকটিম রিফাতকে মার দিয়া বা ঠ্যাং ভেঙে শিক্ষা দেয়া সংক্রান্ত, হত্যার জন্য নয়। কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঘটনার পূর্বে ঘটনাস্থলের পার্শ্বে দুটি রামদাও এনে রাখা হয়। যা দ্বারা ঘটনার সময় ভিকটিমকে কোপানো হয়। সাধারণ মার দেয়া বা ঠ্যাং ভাঙার পরিকল্পনার সঙ্গে উক্ত রামদা রাখা আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ নহে। যা ভিকটিম রিফাত শরীফকে হত্যার পূর্ব পরিকল্পনাকেই নির্দেশ করে।

রায়ে আরো বলা হয়েছে, প্রসিকিউশন কেস অনুযায়ী ঘটনার পরিকল্পনার সূত্রপাত ঘটে গত বছরের ২৫ জুন সকালে আসামি নয়ন বন্ডের বাসায়। ঐদিন নয়ন বন্ড ও মিন্নির আলোচনা এবং পরবর্তীতে ঐদিন বিকাল সাড়ে ৫টায় বরগুনা সরকারি কলেজের শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে আসামি নয়ন, রিফাত ফরাজী গংদের বৈঠতে তা চূড়ান্ত হয়। উক্ত শহিদ মিনার কলেজের মধ্যে এবং কলেজের গেটে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। তবে শহিদ মিনারে উক্ত পরিকল্পনা বৈঠক সংশ্লিষ্ট সময়ের কোনো ভিডিও ফুটেজ বা উক্ত পরিকল্পনা সম্পর্কিত অন্য কোনো অডিও/ভিডিও রেকর্ড জব্দ কিংবা কোর্টের সামনে উপস্থাপিত হয়নি। এছাড়া এই পরিকল্পনা বৈঠকের কোনো চাক্ষুস সাক্ষীও এই মামলায় সাক্ষ্য দেয়নি। অবশ্য কোনো অপরাধ সংঘটনের পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র সাধারণত গোপনে হয়ে থাকে এবং তা ঘটনার পরে প্রকাশিত হয়। এই পরিকল্পনার প্রেক্ষাপট হিসেবে নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির প্রেম ও বিয়ে এবং ঐ বিয়ে বলবত থাকা সত্ত্বেও রিফাত শরীফকে বিয়ে করা, নয়নের জন্মদিনে মিন্নির উপস্থিতি ও নয়নের বন্ধু হেলাল কর্তৃক মোবাইল ফোনে উক্ত ভিডিও ধারণ ও তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করা, পরে ভিকটিম কর্তৃক ঐ ফোন নিয়ে আসা এবং তা নিয়ে মিন্নির সঙ্গে রিফাত শরীফের মনোমালিন্য ও আসামিদের গালমন্দ ও মারধর ইত্যাদি ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে।

এদিকে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি পান আয়শার বাবা মোজাম্মেল হোসেন। এরপরই তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। তিনি বলেন, রায়ের বিরুদ্ধে সাত কার্যদিবসের মধ্যে আপিলের আদেশ দেয়া হয়েছে।

আয়শার বাবার দাবি, তার মেয়ে নির্দোষ। রিফাত হত্যার পেছনে নয়ন বন্ড তৈরির কারিগর যারা, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রক সেই প্রভাবশালীদের রক্ষায় জন্য পুলিশি তদন্তে আয়শাকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, উচ্চ আদালতে আয়শা ন্যায়বিচার পাবে।

এছাড়া আয়শার আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, এই মামলায় পুলিশের তদন্তে গাফিলতি ছিল। হত্যাকাণ্ডের সময় মাদকের বিষয়টি আলোচনায় এলেও তদন্তে সেটা আমলে নেয়া হয়নি। এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজ এলাকায় দিনে-দুপুরে রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা করে নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীসহ এক দল তরুণ। এই নয়ন ছিল ‘০০৭’ নামে একটি কিশোর গ্যাংয়ের প্রধান। এরপর রিফাতকে হাসপাতালে নিয়ে যান তার স্ত্রী মিন্নি। হাসপাতালে নেয়ার পর রিফাত মারা যান। রিফাতকে যখন কোপানো হচ্ছিলো, তখন তার স্ত্রী আয়শা চেষ্টা করছিলেন স্বামীকে বাঁচাতে। এমন এক ভিডিও চিত্র তখন অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে দেশের মানুষকে নাড়া দিয়েছিল। ঘটনার ১৫ মাস পর আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, স্ত্রী আয়শাই ছিলেন রিফাত হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী।

ঘটনার এক সপ্তাহ পর পুলিশের সঙ্গে এক ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন নয়ন বন্ড। অভিযুক্ত বাকি আসামিদের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ কিশোরের বিচার চলছে শিশু আদালতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here