দান করুন হাত খুলে

নিউজ  ডেস্কঃধর্ম মানেই মানবিকতা। মানুষের জন্য কল্যাণকর কাজ করা। নবীজীর জীবনের দিকে তাকালে দেখি, তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধা সহজ সরল মানুষ। মানুষের জন্য অন্তর থেকে অশ্রু বর্ষণকারী একজন মানুষ। সবার দুঃখ কষ্ট দেখে নিশ্চুপ বসে থাকার মানুষ তিনি ছিলেন না। তাঁর ঘনিষ্ঠ অনুসারীদেরও ছিল দয়া মায়ায় ভরা মন। তাঁরা নিজের ধন সম্পদকে কখনো নিজের মনে করতেন না। মনে করতেন আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া আমানত যার ওপর অধিকার আছে বঞ্চিতের।

মনে রাখতে হবে- সম্পদ মহান আল্লাহর দান। যার পূর্ণ ও প্রকৃত মালিকানা তাঁরই। আমাদের কেবলমাত্র নির্দিষ্ট মেয়াদে ভোগ করার অধিকার দিয়েছেন। মৃত্যুর পর এই সম্পদই অন্যের হয়ে যাবে। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো সময় থাকতেই পরকালের জন্য এ সম্পদ থেকে প্রেরণ করে সেই জীবনের রাস্তা সুগম করা এবং দান-সদকার মাধ্যমে গরিব-দুখি-অনাথদের পাশে দাঁড়ানো।

গোটা বিশ্বের ন্যায় আমরাও করোনা মহামারীতে আক্রান্ত। এসময়ে আমরা যদি একটু সহমর্মিতা নিয়ে আমাদের চারপাশের অসহায় মানুষের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই তাহলে লাভ করতে পারব স্রষ্টার সন্তুষ্টি।

মহাপবিত্র আল-কোরআনে এই দান নিয়ে অসংখ্য আয়াত নাজিল হয়েছে। যেগুলো নিচে দেয়ো হলো-

আল্লাহ-সচেতনরা গায়েবে (মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞানে বোধগম্য না হওয়া সত্ত্বেও অদৃশ্য বাস্তবতায়) বিশ্বাস করে, নামাজ কায়েম করে, প্রাপ্ত রিজিক থেকে অন্যের জন্যে ব্যয় করে (অর্থাৎ নিয়মিত দান করে)। – (সূরা বাকারা, আয়াত-৩)

নিশ্চয়ই যারা (এক) সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় দান করে, (দুই) রাগ নিয়ন্ত্রণ করে, (তিন) মানুষকে ক্ষমা করে, আল্লাহ তাদের ভালবাসেন।– (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১৩৪)

হে নবী! বলো, আসলে তোমরা ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা (লোক-দেখানোর জন্যে) অনিচ্ছাকৃতভাবে, যে-ভাবেই দান করো না কেন, আল্লাহ তা গ্রহণ করবেন না। কারণ তোমরা ফাসেক—সত্যত্যাগী। ৫৪. ওরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলকে অমান্য করে, দায়সারাভাবে নামাজে হাজির হয় আর বিরক্তিসহকারে অর্থ সাহায্য করে বলেই ওদের দান গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।– (সূরা তওবা, আয়াত-৫৩)

আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্যে কোরবানিকে ইবাদতের অংশ করেছি। যাতে জীবনোপকরণ হিসেবে যে গবাদি পশু তাদেরকে দেয়া হয়েছে, তা জবাই করার সময় তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে আর (সবসময় যেন মনে রাখে) একমাত্র আল্লাহই তাদের উপাস্য। অতএব তাঁর কাছেই পুরোপুরি সমর্পিত হও। আর সুসংবাদ দাও সমর্পিত বিনয়াবনতদের, আল্লাহর নাম নেয়া হলেই যাদের অন্তর কেঁপে ওঠে, যারা বিপদে ধৈর্যধারণ করে, নামাজ কায়েম করে আর আমার প্রদত্ত জীবনোপকরণ থেকে দান করে।– (সূরা হজ, আয়াত-৩৪-৩৫)

আসলে যারা তাদের প্রতিপালকের (বিরাগভাজন হওয়াকে) ভয় করে, যারা তাঁর বাণীকে বিশ্বাস করে, যারা তাঁর সাথে কাউকে শরিক করে না, যারা তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে—এই বিশ্বাস নিয়ে কম্পিত হৃদয়ে অন্তর থেকে দান করে, তারাই সৎকর্মে (নিজের সাথে) আসল প্রতিযোগী, তারাই সৎকর্মে অগ্রগামী।– (সূরা মুমিনুন, আয়াত-৫৭-৬১)

এদের দুবার পুরস্কৃত করা হবে। প্রথমত, প্রতিকূলতার মুখে ধৈর্যধারণ করার জন্যে। দ্বিতীয়ত, ভালো কাজ দ্বারা মন্দ কাজের মোকাবেলা করা এবং আমি যে জীবনোপকরণ দিয়েছি, তা থেকে দান করার জন্যে।– (সূরা কাসাস, আয়াত-৫৪)

যারা আল্লাহর কিতাব অনুসরণ করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি তাদের যে জীবনোপকরণ দিয়েছি, তা থেকে প্রকাশ্যে ও গোপনে দান করে, তারাই সফল বিনিয়োগকারী। কারণ তিনি তাদের পূর্ণ কর্মফল প্রদানের সাথে সাথে নিজের অনুগ্রহভাণ্ডার থেকেও বহুগুণ পুরস্কার দেবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, মহাগুণগ্রাহী।– (সূরা ফাতির, আয়াত-২৯-৩০)

দানশীল পুরুষ ও নারী, যারা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করে (শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে অন্যের জন্যে ব্যয় করে), তাদেরকে প্রতিদান দেয়া হবে বহুগুণ এবং তাদের জন্যে রয়েছে মহাপুরস্কার।- (সূরা হাদিদ, আয়াত-১৮)

আর যারা আল্লাহ-সচেতন এবং কারো কাছ থেকে প্রতিদানের প্রত্যাশা ছাড়াই শুধু মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টি ও আত্মশুদ্ধির জন্যে নিজ সম্পত্তি থেকে দান করে, তারা লাভ করবে অফুরন্ত তৃপ্তি ও সন্তোষ।– (সূরা লাইল, আয়াত-১৭-২১)

যারা নিজেদের ধনসম্পত্তি আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তাদের এই সৎদান এমন একটি শস্যবীজ, যাতে উৎপন্ন হয় সাতটি শিষ আর প্রতিটি শিষে থাকে শত শস্যদানা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহুগুণ প্রবৃদ্ধি দান করেন। আল্লাহ অনন্ত প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।– (সূরা বাকারা, আয়াত-২৬১)

সুদী অর্থ আল্লাহর রহমত থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত থাকে আর সৎদান তাঁর অনুগ্রহসিক্ত হয়ে বহুগুণে সমৃদ্ধ হয়। যারা অকৃতজ্ঞ এবং ক্রমাগত পাপে লিপ্ত, আল্লাহ তাদের অপছন্দ করেন।– (সূরা বাকারা, আয়াত-২৭৬)

অপরদিকে যারা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে আন্তরিকতার সাথে দান করে, তাদের উপমা হচ্ছে : উঁচু জায়গায় এমন একটি বাগান, যেখানে মুষলধারে বৃষ্টি হলে দ্বিগুণ ফল উৎপন্ন হয় আর হালকা ঝিরঝিরে বৃষ্টিও বাগানটিকে ফুলে-ফলে সুশোভিত রাখার জন্যে যথেষ্ট। তোমরা যা করো, আল্লাহ তার সম্যক-দ্রষ্টা।– (সূরা বাকারা, আয়াত-২৬৫)

(হে নবী!) মানুষকে সত্যপথ গ্রহণ করানোর দায়িত্ব তোমাকে দেয়া হয় নি। যে ইচ্ছা করে, আল্লাহ তাকে সৎপথে পরিচালিত করেন। (হে মানুষ!) যে অর্থবিত্ত তোমরা দান করো, সে দান তো তোমাদের নিজেদের কল্যাণের জন্যেই। তোমরা তো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে ব্যয় করো। অতএব দানের পুরোপুরি প্রতিদান তোমাদেরকে অবশ্যই দেয়া হবে। তোমাদের হক কখনো নষ্ট করা হবে না।– (সূরা বাকারা, আয়াত-২৭২)

নিশ্চয়ই যারা তাদের উপার্জন থেকে রাতে বা দিনে, প্রকাশ্যে বা গোপনে, সচ্ছল বা অসচ্ছল অবস্থায় দান করে, তাদের জন্যে তাদের প্রতিপালকের কাছে পুরস্কার রয়েছে। তাদের কোনো ভয় বা পেরেশানি থাকবে না।– (সূরা বাকারা, আয়াত-২৭৪)

তোমরা প্রকাশ্যে দান করলে তা-ও ভালো। আর যদি গোপনে অভাবীকে দাও, তা আরো ভালো। দানের কারণে তোমাদের অনেক পাপমোচন হবে। তোমরা যা করো আল্লাহ তা জানেন।– (সূরা বাকারা, আয়াত-২৭১)

হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা যা উপার্জন করো আর জমিন থেকে যা উৎপাদিত হয়, তা থেকে ভালো অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করো। বেছে বেছে খারাপ জিনিসগুলো দান করতে যেও না। কারণ যে-জিনিস তোমরা গ্রহণ করতে চাইবে না, তা কখনো দান করতে চাওয়া উচিত নয়। তোমাদের জানা থাকা উচিত, নিশ্চয়ই আল্লাহ অভাবমুক্ত, সর্বোত্তম প্রশংসায় প্রশংসিত।– (সূরা বাকারা, আয়াত-২৬৭)

(হে বিশ্বাসীগণ!) তোমার প্রিয় ও পছন্দের জিনিস থেকে দান করতে না পারলে তুমি কখনো সত্যিকারের ধার্মিক হতে পারবে না। অন্যের জন্যে তুমি যা-কিছু ব্যয় বা দান করো আল্লাহ তা ভালোভাবেই জানেন।– (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-৯২)

দানের কথা প্রচার না করে যারা আল্লাহর পথে ধনসম্পত্তি ব্যয় করে এবং গ্রহীতাকে কোনো কষ্ট দেয় না, তাদের পুরস্কার প্রতিপালকের কাছে জমা থাকবে। তাদের কোনো ভয় থাকবে না। তারা দুঃখিতও হবে না। ২৬৩. দান করে খোঁটা দিয়ে কষ্ট দেয়ার চেয়ে শুধু মিষ্টি কথা বলা বা সমবেদনা প্রকাশ করা অনেক ভালো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অভাবমুক্ত, পরমসহনশীল। ২৬৪. হে বিশ্বাসীগণ! দানের কথা প্রচার করে ও গ্রহীতাকে কষ্ট দিয়ে বা খোঁটা দিয়ে তোমাদের দানকে সেই ব্যক্তির ন্যায় নিষ্ফল কোরো না, যে আত্মপ্রচারের জন্যে দান করে এবং আল্লাহ ও আখেরাতে অবিশ্বাসী। এ দানের উপমা হচ্ছে : মাটির আস্তর জমা একটি মসৃণ পাথরের চাতাল। প্রবল বৃষ্টি হলো। চাতালের ওপর থেকে সব মাটি ধুয়ে চলে গেল। তাদের উপার্জন তাদের কোনো উপকারে এলো না। সত্য অস্বীকারকারীদের আল্লাহ সৎপথ দেখান না।– (সূরা বাকারা, আয়াত-২৬২)

আবার এ বেদুইনদের মধ্যেই অনেকে আল্লাহ ও আখেরাতে পুরোপুরি বিশ্বাস করে। দান করাকে তারা আল্লাহর সান্নিধ্য ও রসুলের দোয়ালাভের মাধ্যম মনে করে। (হে বিশ্বাসীরা!) নিশ্চয়ই দান তাদের জন্যে আল্লাহর নৈকট্যলাভের উপায়। আল্লাহ তাঁর রহমতের ছায়ায় তাদের আশ্রয় দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরমদয়ালু।– (সূরা তওবা, আয়াত-৯৯)

বেদুইনদের অনেকেই আল্লাহর পথে ব্যয় বা দান করাকে বাধ্যতামূলক জরিমানা মনে করে। ওরা প্রতীক্ষা করছে তোমাদের ভাগ্যবিপর্যয়ের। (কিন্তু ওরা জানে না যে) দুর্ভাগ্য বা ভাগ্যবিপর্যয় ওদের জন্যেই অপেক্ষা করছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব শোনেন, সব জানেন।– (সূরা তওবা, আয়াত-৯৮)

অতএব কেউ যদি দান করে, আল্লাহ-সচেতন হয় এবং ভালো ও কল্যাণকর বিষয়গুলোকে জীবনের সত্য হিসেবে গ্রহণ করে, তবে আমি সাফল্যের সরলপথে চলাকে তার জন্যে সহজ করে দেবো।– (সূরা লাইল, আয়াত-৫-৭)

সত্যিকার বিশ্বাসী তো তারাই, আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর কেঁপে ওঠে, যখন তাঁর বাণী পাঠ করে শোনানো হয়, তখন বিশ্বাস গভীর হয় এবং তারা শুধু তাদের প্রতিপালকের ওপরই ভরসা করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি যা দিয়েছি, তা থেকে অন্যের জন্যে ব্যয় (দান) করে। এরাই প্রকৃত বিশ্বাসী। প্রতিপালকের কাছ থেকে এরা পাবে মর্যাদা, ক্ষমা ও উত্তম জীবনোপকরণ।– (সূরা আনফাল, আয়াত-২-৪)

আমি তোমাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি, সময় থাকতেই তা থেকে অন্যের জন্যে ব্যয় করো, যাতে মৃত্যুর মুহূর্তে একথা বলতে না হয়, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আরেকটু সময় দাও, আমি দান করে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হই।’– (সূরা মুনাফিকুন, আয়াত-১০)

আর যারা নিজেরা কৃপণ এবং অন্যকে কৃপণতা করতে উৎসাহিত করে (বা দানে নিরুৎসাহিত করে) এবং আল্লাহর অনুগ্রহ-সম্পদ গোপন করে, আল্লাহ তাদেরও অপছন্দ করেন। এ ধরনের অকৃতজ্ঞদের জন্যে আমি অপমানজনক শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছি।– (সূরা নিসা, আয়াত-৩৭)

তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ ও ওমরাহ পূর্ণ করো। কিন্তু যদি তোমরা বাধা পাও তবে সহজলভ্য কোরবানি করো। আর কোরবানি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মস্তক মুণ্ডন কোরো না। কিন্তু অসুস্থতা বা মাথায় কোনো রোগের কারণে আগেই মস্তক মুণ্ডন করে ফেললে ‘ফিদিয়া’ বা প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে রোজা রাখবে, কোরবানি বা সদকা দেবে। নিরাপদ পরিস্থিতিতে কেউ হজের আগে ওমরাহ করে উপকৃত হতে চাইলে সে সহজলভ্য কোরবানি করবে। কিন্তু যদি কেউ কোরবানির কোনো পশু না পায়, তবে সে হজের সময় তিন দিন ও ঘরে ফিরে সাত দিন, এভাবে মোট ১০ দিন রোজা রাখবে। মসজিদুল হারামের কাছে পরিবার-পরিজনসহ বাস করে না এমন লোকদের জন্যে এ-নিয়ম প্রযোজ্য। অতএব হে মানুষ! আল্লাহ-সচেতন হও। (আল্লাহর ধর্মবিধান লঙ্ঘন হতে দূরে থাকো।) জেনে রাখো, আল্লাহ মন্দ কাজের শাস্তিদানে কঠোর।– (সূরা বাকারা, আয়াত-১৯৬)

ওদের মধ্যে এমন মানুষ রয়েছে, যারা সদকা হিসেবে পাওয়া দান বিতরণের ব্যাপারে (হে নবী!) তোমার ভুল খোঁজার চেষ্টা করে। প্রাপ্ত দান থেকে ওদেরকে কিছু দেয়া হলে খুব খুশি হয়। কিন্তু কিছু না পেলে ক্ষোভ তাদের সবকিছুকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। – (সূরা তওবা, আয়াত-৫৮)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here