সাতলা বিলের শাপলা বেচেই চলে তাদের সংসার

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি:সাত বছরের শিশু তাসলিমা। সকাল হতেই ডিঙি নৌকায় বিলে ভাসে সে। উদ্দেশ্য শাপলা ফুল তুলবে। এই শাপলা ফুল বেচেই তো ঘেরের জন্য চাল, ডাল ও তেল কিনতে হবে। শিুধু সে নয়, তার মতো অনেক শিশুরাই বিল থেকে শাপলা তোলার কাছে দক্ষ। অন্যান্য সময়ের তুলনায় বর্ষা এলেই যেন বরিশাল জেলার বিভিন্ন এলাকাবাসীর ব্যস্ততা বেড়ে যায় শাপলা তোলার জন্য।

 

চারপাশে যেন গোলাপি চাদর বিছিয়ে রাখা হয়েছে। উপর থেকে দেখলে শাপলা ফুলকে যেন বাগিচার মতো মনে হয়। প্রকৃতির অপরূপ এই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় পুরো দেশবাসী। তাইতো দূরদুরান্ত থেকে সবাই ছুটেন বরিশালে এই নৈস্বর্গীক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য। সাতলা বিলের শাপলার অপরূপ দৃশ্য সম্পর্কে সবারই কমবেশি জানা আছে।

শাপলা তুলছে শিশুরা

শাপলা তুলছে শিশুরা

বরিশালের আগৈলঝাড়া, উজিরপুর ও গৌরনদী উপজেলার শতাধিক বিলে বর্ষায় ফুটে উঠে জাতীয় ফুল শাপলা। আর এ শাপলা তুলে বিক্রি করেন কৃষকরা। প্রতিদিনই ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বিলের মাঝে শাপলা তুলতে যান তারা।

গ্রামবাসীদের মধ্যে চলে শাপলা তোলার প্রতিযোগিতা! উজিরপুর উপজেলাবাসীরা এই শাপলার উপর নির্ভর করেই তাদের জীবন চালায়। সেখানকার শিশু, কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সীরাই বিলের মধ্যে নৌকায় ভেসে ভেসে শাপলা তুলতে পারদর্শী।

ফুল তুলছে এক শিশু

ফুল তুলছে এক শিশু

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা বিল এলাকা এখন লাল আর সাদা শাপলার অপরূপ সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি। সূর্যের আভাকেও যেন হার মানিয়েছে এ  বিলের পানিতে লতাপাতা গুল্মে ভরা শত সহস্র লাল ও সাদা শাপলা। এ যেন প্রকৃতির বুকে আঁকা এক নকশি কাঁথা। এ বিলে বর্ষার শুরুতেই ফুটতে শুরু করে শাপলা ফুল।

প্রতিবছর মার্চ থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত এখানে শাপলার মৌসুম। প্রায় ১০ হাজার একর জলাভূমির মধ্যে জন্ম নেয়া লাল, নীল ও সাদা রঙের কোটি কোটি শাপলাগুলো। একনজর দেখার জন্য  সূর্যোদয় থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নানা বয়সের হাজারো মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। পর্যটকদের আনাগোনায় দিনকে দিন মুখরিত হচ্ছে শাপলার রাজ্যখ্যাত সাতলা এলাকা।

চারদিকে গোলাপি চাদর বিছিয়ে রেখেছে শাপলা

চারদিকে গোলাপি চাদর বিছিয়ে রেখেছে শাপলা

শাপলার মাঝে বাংলার চিরন্তন রূপ খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা শুধু সৌন্দর্যই বিলায় না, সুস্বাদু খাবার হিসেবেও শাপলার বেশ কদর রয়েছে। শাপলা ফুলের অপরূপ শোভা সৌন্দর্যপিপাসু মানুষকে বিমোহিত করে। হাজারো ফুলের ভিড়েও শাপলা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। শাপলার মতো সরল অথচ নয়নাভিরাম সৌন্দর্যমন্ডিত বৈশিষ্ট্য অন্য কোনো ফুলে নেই।

বাংলাদেশের সব জায়গায় শাপলা পাওয়া যায়। তাই শাপলাকে জাতীয় ফুলের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের মুদ্রায়ও শাপলার প্রতিচ্ছবি রয়েছে। দীঘি-নালা-খাল-বিলে পরিপূর্ণ বাংলাদেশর শাপলা ফুলের সৌন্দর্যে মুখরিত করেছে বলে শাপলাকে জাতীয় ফুল হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে।

শাতলা বিলে ডিঙ্গি নৌকা

শাতলা বিলে ডিঙ্গি নৌকা

উজিরপুর উপজেলার সাতলা বিলের লাল শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটক আসে বহু দূর দূরান্ত থেকে । এ বিলে ভ্রমনের জন্য রয়েছে টাকার বিনিময়ে ছোট আকারের নৌকা। সূর্য উদয় ক্ষণে সূর্য রশ্মি পড়া মাত্রই যেন মন পাগল করা এক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে পরিণত হয় সাতলা বিল।

আমাদের কাছে সাতলা বিলের শাপলা উপভোগ্য হলেও ওই এলাকার মানুষের আয়ের পথ শাপলা। তারা সকাল হতেই ছোট নৌকা নিয়ে নেমে পড়ে শাপলা তোলার জন্য। পানির মধ্য থেকে শাপলাগুলো তুলে এনে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে শত শত পরিবার। প্রায়  ২০০ বছর ধরে সাতলার বিলগুলোতে শাপলা জন্ম হচ্ছে। ওই এলাকার প্রায় ৫০ ভাগ অদিবাসী শাপলার চাষ ও বিপণন কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছে।

ফুল তুলছেন এক নারী

ফুল তুলছেন এক নারী

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, একসময় শাপলার তেমন কোনো চাহিদা না থাকায় পানিতে জন্মে পানিতেই মরে পচে যেতো। দিনে দিনে শাপলার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তা বাজারে বিক্রি করতে শুরু করে দিনমজুররা। এখন প্রায় সারা বছর ধরেই শাপলা পাওয়া যায়। বিশেষ করে এ অঞ্চলের মানুষ খাদ্যের তালিকায় শাপলাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। স্থানীয়রা প্রতিদিন তিন থেকে চার শত টাকা আয় করে শাপলা বিক্রির মাধ্যমে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বিনোদন ও প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের কাছে নানা সামগ্রী বিক্রি করে সে আর্থিক লাভবান হচ্ছেন।

 

আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউপির একাধিক শাপলা বিক্রেতা জানান, বর্ষা মৌসুমে প্রায় চার-পাঁচ মাস বিলে পানি থাকে। ফলে কৃষি কাজ কমে গেলে শাপলা কিংবা বিলের মাছ বিক্রি করে চলতে হয়। একই উপজেলার রাজিহার ইউপির লখারমাটিয়া গ্রামের বাসিন্দা শাপলা বিক্রতা হৃদয় রায় জানান, প্রভাবশালীরা বিলে মাছ চাষ করায় আগের মতো শাপলা ফোটে না। এমনকি প্রাকৃতিক মাছও বিলে ঢুকতে পারছে না। এতে আয় অনেকটাই কমে গেছে।

পড়ন্ত বিকেলে সাতলা বিলের সৌন্দর্য

পড়ন্ত বিকেলে সাতলা বিলের সৌন্দর্য

চিত্ত রঞ্জন বৈদ্য বলেন, বর্ষায় কাজ নেই। তাই দুই মাস ধরে শাপলা বিক্রি করছি। প্রতিদিন পরিবারের সদস্যরা ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বিল থেকে শাপলা তোলেন। এরপর ভ্যানে সাজিয়ে বাজারে নেয়া হয়। তিন মুঠো শাপলা ১০ টাকায় বিক্রি করা হয়। গৌরনদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান বলেন, শাপলা জাতীয় ফুল হলেও সবজি হিসেবে কদর রয়েছে অনেক বেশি। এছাড়া শাপলায় প্রচুর পরিমাণে আয়রনসহ নানাবিদ পুষ্টিগুণ রয়েছে।

 

বর্তমানে সাতলার বিল এক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয়রা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পর্যটকদের সুবিধার্থে সাতলা এলাকায় আবাসন ব্যবস্থা ও পর্যটন কেন্দ্র করার দাবি জানিয়েছেন। সরকার এ শাপলা বিলকে পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করতে এরই মধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে। সাতলার শাপলা বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা পর্যটকদের জন্য কালবিলা এলাকায় একটি ছোট্ট পরিসরে আবাসন নির্মাণের স্থান নির্ধারনসহ প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সাতলা বিল দিনে দিনে পর্যটন এলাকায় পরিণত হওয়ায় সাতলার এ শাপলা বিলকে পরিপূর্ণতায় রূপ দিতে নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

পর্যটকরা এভাবেই ভেসে বেড়াতে যান সাতলা বিলে

পর্যটকরা এভাবেই ভেসে বেড়াতে যান সাতলা বিলে

সাতলা বিলে যেভাবে যাবেন-

> প্রথম রুট- ঢাকা থেকে প্রথমেই লঞ্চে বরিশাল। বরিশাল লঞ্চ ঘাট পৌঁছে এবার যেতে পারেন দুই ভাবে। বাসে অথবা মাহিন্দ্রায়। বাসে গেলে অটোতে চলে যান নথুল্লাহবাদ বাস স্ট্যান্ড। সময় লাগবে দুই ঘণ্টা। ভাড়া জনপ্রতি ৯০ টাকা। আর মাহিন্দ্রায় গেলে আপনার রুট দুইটি-

* শানুহার-ঈদগাহ-ধামুড়া-কারফা বাজার-সৌদি মার্কেট হয়ে সাতলা। এই রাস্তা খুবই খারাপ, সময় এবং শ্রম দুই-ই বেশি যাবে। অন্তত তিন ঘণ্টা লাগবে সাতলা পৌঁছতে।

* ইচলাদি-উজিরপুর-ডাবেরকুল-ওটরা-সাতছতে।এই রাস্তাটি নতুন এবং সুন্দর। এই পথে খুব দ্রুতই চলে যেতে পারবেন আপনি। ৫০ মিনিটের মতো সময় লাগবে।

সাতলা বিলের শাপলা

সাতলা বিলের শাপলা

ভোরে বরিশাল পৌঁছে বাস পাওয়া দুষ্কর। আবার দ্রুত সাতলায় যেতে না পারলে ফুটন্ত শাপলার হাসিমুখগুলো মিস হয়ে যাবে। তাই সবচেয়ে ভালো হয় মাহিন্দ্রায় গেলে। আর এজন্য দলটি বড় হওয়া প্রয়োজন। একটি মাহিন্দ্রার ৬-৮ জন ওঠা যায়। ভাড়া নেবে ১২০০ থেকে ২৫০০ টাকা (যাওয়া এবং আসা)। কোন রুট ব্যবহার করছেন তার উপর নির্ভর করবে। সাতলা বাজারে পৌঁছে আপনাকে ছোট একটি জলপথ পার হতে হবে নৌকায়। এরপর ভ্যানে করে চলে যাবেন বিলে।

> ২য় রুট- ঢাকা থেকে বরিশালের লঞ্চে না উঠে আপনি উঠুন পয়সারহাট বা আগৈলঝরার লঞ্চে। বরিশালের ১০ উপজেলার একটি আগৈলঝরা। এখান থেকে ভ্যানে চলে আসুন সাতলা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here