শেষ নবাবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার সাক্ষী এই নারী

নিউজ  ডেস্কঃবাংলার শেষ নবাব সিরাউজদ্দৌলা সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার সঙ্গে সবাই জানি। এমনকি বিশ্বাসঘাতকদের করুন পরিনতিও ইতিহাস্র লেখা আছে স্বর্নাক্ষরে। মীর জাফর আর মিরনের সেই দুঃসহ জীবনের সাক্ষী আছে ইতিহাস। নাপাক পানি খেয়েও প্রাণ রক্ষা হয়নি মীর জাফরের। আর মিরনের পরিণতি ছিল আরো খারাপ। বজ্রপাতে মারা যান তিনি

বাংলার নবাবি আমলের ইতিহাসের বেশ খানিকটা অংশ জুড়েই রয়েছে ভালোবাসা, লোভ-লালসা, বিশ্বাসঘাতকতা আর যুদ্ধের ঝনঝনানি। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে অজস্র প্রাচীন কাহিনী। সেখানে ইতিহাসকে বারবার উজ্জ্বল করেছে ভালোবাসা আর ত্যাগের মহিমা। অন্যদিকে কলঙ্কিত আর রঞ্জিত করেছে বিশ্বাসঘাতকতা। অনেক কিছুর ভিড়ে হারিয়ে গেছে কিছু চরিত্র। যারা সাক্ষী ছিলেন এই পুরো ষড়যন্ত্রের। তেমনই একজন মুন্নী বেগম। তিনি বাংলার নবাব মীর জাফরের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন।

মীর জাফর

মীর জাফর

একসময় নবাব হলেও ইতিহাস তাকে চেনে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে। মুন্নী বেগম বালুকুন্দা,সিকান্দা,উত্তর প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্ম নীচু ঘরে। তিনি ছিলেন সম্রাট আকবরের সমাধিস্থল সিকান্দ্রার নিকটবর্তী গ্রাম বালকুন্ডার এক গরিব বিধবার মেয়ে। ভরণপোষণ করার সামর্থ্য না থাকায় তার মা তাকে সাম্মেন আলি খানের ক্রীতদাসী, বিশুর কাছে বিক্রি করে দেয়। বিশু ৫ বছর দিল্লিতে ছিল। এ সময় সে নাচ শিখিয়ে মুন্নীকে নৃত্যশিল্পী হিসেবে গড়ে তলে। বিশুর নাচের দলের সদস্য হিসেবে ভারতের বিভিন্ন রাজদরবারে যেতেন মুন্নী। অপরূপ সৌন্দর্য এবং নৃত্যপ্রতিভার জন্য দূর-দূরান্তে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

নবাব শাহমাত জং (নওয়াজিশ মুহাম্মদ খান) তার পোষ্যপুত্র ইকরাম-উদ-দৌলার (সিরাজ-উদ-দৌলার ছোট ভাই) বিয়েতে, ১০,০০০ রুপি সম্মানী দিয়ে, বিশুর নাচের দলের মেয়েদের মুর্শিদাবাদে ডেকে নেন। সেখানে মুন্নী বেগম তার সৌন্দর্য, সংগীত ও নৃত্যশৈলীতে অভিজাতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বিয়ের আরো সুযোগের আশায় দলটি মুর্শিদাবাদেই থেকে যায়। মুর্শিদাবাদে নৃত্যশিল্পীদের ভালো কদর ছিল সেসময়। মুর্শিদাবাদ সে সময় লন্ডনের মতোই বড়, জনাকীর্ণ ও সমৃদ্ধ শহর ছিল।

বাইজির প্রেমে অন্ধ ছিলেন মীর জাফর

বাইজির প্রেমে অন্ধ ছিলেন মীর জাফর

মুন্নী বেগম সবচেয়ে সুন্দরী হওয়ার কারণে আলীবর্দি খানের প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের নজর কাড়ে। মীর জাফর তাকে তার হারেমে নিয়ে যায়। মীর জাফর দলটিকে মাসিক ৫০০ রুপিতে ভাড়া করেন। মুন্নী বেগমের রূপ আর নৃত্যপ্রতিভা অচিরেই মীর জাফরকে অন্ধ করেছিল। পরবর্তীতে সাম্মেন আলি খানের মেয়ে বাবুও তার জেনানা মহলে জায়গা করে নেয়। চতুর মুন্নী বেগম খুব তাড়াতাড়ি হারেমের প্রধান হয়ে ওঠে। মীর জাফরের কাছে তার প্রথম স্ত্রী শাহ খানমের থেকেও প্রিয় হয়ে ওঠে। মুন্নীর দাপটে আড়ালে চলে যান মীর জাফরের বৈধ পত্নী শাহ খানমও। এই ক্ষমতার বদৌলতে পরবর্তীতে সিরাজ-উদ-দৌলার প্রাসাদ হীরা ঝিল থেকে মীর জাফরের নিয়ে আসা সমস্ত ধন-সম্পদের অধিকারী হন মুন্নী। মীর জাফরের ঔরসে তার গর্ভে দুই ছেলে জন্মায়—নাজম-উদ-দৌলা ও সাইফ-উদ-দৌলা। পলাশীর যুদ্ধে রবার্ট ক্লাইভ সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করলে মীর বাংলার নবাব হয় এবং মুন্নী বেগম নবাব-স্ত্রী হন।

৫ ফেব্রুয়ারি ১৭৬৫ তারিখে মীর জাফর মারা গেলে তিনি বিধবা হন। মুন্নী বেগমের রবার্ট ক্লাইভের সাথে সুসম্পর্ক ছিলো। রবার্ট ক্লাইভ পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে সাহায্য করার ওয়াদা করেন। টাকা দেয়ার জন্যই মীর জাফরের একমাত্র বৈধ সন্তান মিরনের দাবি নাকচ করে দেয় তারা। এরপর মুন্নী বেগমের ১৫ বছর বয়সি পুত্র নাজম-উদ-দৌলাকে সিংহাসনে বসায় কলকাতার কাউন্সিল। তার রাজত্বকালেই মীর জাফরের রেখে যাওয়া পাঁচ লাখ রুপি রবার্ট ক্লাইভের হাতে তুলে দেন মুন্নী বেগম। তিন লাখ ৫০ হাজার রুপি দেয়া হয় নগদ টাকায়, ৫০ হাজার দেয়া হয় রুপিতে এবং বাকি এক লাখ দেয়া হয় স্বর্ণমুদ্রায়।

১৭৬৬ সালের ৮ মে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় নাজম-উদ-দৌলা। এরপর সিংহাসনে বসে তার ছোট ভাই। তারও অকালমৃত্যু হয় (১৭৭০ সালের মার্চে)। তারপর সিংহাসনে বসানো হয় বাবু বেগমের ১২ বছর বয়সি পুত্র মোবারক-উদ-দৌলাকে। দুই ছেলের শাসনকালে সত্যিকার অর্থে প্রাসাদের ওপর ছড়ি ঘোরাতেন মুন্নী বেগম। প্রাসাদের যাবতীয় ব্যয় নির্বাহের দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। কর্মচারীদের বেতন, জেনানা মহলের ভরণ-পোষণ, অতিথি আপ্যায়ন এবং ধর্মীয় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের জন্য প্রতি মাসে তার মাধ্যমে প্রায় ২৩ হাজার রুপি খরচ হতো। সে সময় বাবু বেগম ছিলেন একেবারেই অন্তরালে। কিন্তু সৎ ছেলে মোবারক-উদ-দৌলা মসনদে বসতেই মুন্নী বেগমের সমস্ত কর্তৃত্বের ইতি ঘটে।  তিনি নায়েব নাজিম ও রেজা খানকে দুর্নীতির অভিযোগে সরিয়ে দিতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সাহায্য করেন। তার মাত্রাতিরিক্ত দম্ভ ও খবরদারিতে ভীষণ অপমানিত বোধ করেছিলেন নায়েব রেজা খান। এবার তিনি মুন্নীর জায়গায় বাবু বেগমকে বসানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। দুই বেগমের মাঝে তিনি এমন দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করলেন যে তাদের মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল। নবাবির ওপর নিজের ছেলের দখল দাবি করে বাংলার তৎকালীন গভর্নর কার্টিয়ারের কাছে আবেদন করলেন বাবু।

লর্ড ক্লাইভের সঙ্গে মুন্নী বেগমের ছিল খুবই ভালো বন্ধুত্ব

লর্ড ক্লাইভের সঙ্গে মুন্নী বেগমের ছিল খুবই ভালো বন্ধুত্ব

তিনি যে শোচনীয় অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন, তা জানা ছিল না কার্টিয়ারের। তার ধারণা ছিল মুন্নী বেগমের মতোই আরাম-আয়েশ ও ঐশ্বর্যের মাঝেই দিন কাটছে বাবুরও। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই বেগমের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চেয়ে তিনি মুর্শিদাবাদে, নায়েব দিওয়ানের কাছে চিঠি লেখেন। জবাবে রেজা খান জানান নবাবির ওপর বৈধ অধিকার বাবু বেগমের। তিনি পরামর্শ দেন দুই বেগমকে সমান ক্ষমতা ও মর্যাদা দেয়াই সবচেয়ে ভালো হবে। তবে শেষ পর্যন্ত বাবু বেগমের কাছে হেরে যান তিনি। তবে বাবু বেগম বেশি দিন সেই আসনে টিকতে পারেন নি।

মুহাম্মদ রেজা খান আগে ছিলেন ঢাকার গভর্নর এবং লর্ড ক্লাইভের বন্ধু। অপ্রাপ্তবয়স্ক নবাব নাজম-উদ-দৌলার সময় তাকে বাংলার নায়েব নাজিম, অর্থাৎ সহকারী-শাসক নিয়োগ দেয়া হয়। সেসময় তৎক্ষণাৎ ভূমি রাজস্বের সমস্যা মীমাংসা করার জন্য হেস্টিংসকে সভাপতি করে একটা সার্কিট কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি যখন কাশিমবাজারে ছিল, হেস্টিংস তখন নবাবের প্রাসাদে যান। ৫০ বছর বয়সি মুন্নী বেগমকে বাৎসরিক এক লাখ ৪০ হাজার রুপি ভাতার বিনিময়ে নবাবের মহলের তত্ত্বাবধান ও তার অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। তার সহকারী করা হয় নন্দ কুমারের ছেলে রাজা গুরুদাসকে। এর আগে মুন্নী বেগম মাসিক ৬,০০০ রুপি ভাতা পেতেন। কিন্তু নবাবের নিজের মায়ের বদলে মুন্নী বেগমকে তার অভিভাবক নিয়োগ দেয়াটা ছিল অস্বাভাবিক ও ব্যতিক্রমী ঘটনা।

নিচু ঘরের মেয়ে ছিলেন তিনি

নিচু ঘরের মেয়ে ছিলেন তিনি

১৭৮৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মোবারক-উদ-দৌলা মারা যান। এরপর মসনদে বসেন তার ছেলে বাবর আলি খান ওরফে দ্বিতীয় মোবারক-উদ-দৌলা। তার সময়ে (১৮০৪) লর্ড ভ্যালেনশিয়া এসেছিলেন মুর্শিদাবাদ সফরে। নবাব ও মুন্নী বেগম উভয়ের সঙ্গেই দেখা করেন তিনি। তার বর্ণনা থেকে জানা যায়, এক একর জমির ওপর তৈরি ছোট একটা বাগানবাড়িতে থাকতেন বেগম। মীর জাফরের স্মৃতির সম্মানে টানা চল্লিশ বছর এখানে থাকেন তিনি। ভ্যালেনশিয়ার সঙ্গে কথা বলেছিলেন একটা টকটকে লাল রেশমের পর্দার আড়াল থেকে। যে কামরায় বসে কথা  বলেছেন, সেটি ছিল জাঁকজমকপূর্ণ। তার কণ্ঠস্বর ছিল চড়া ও কর্কশ—তবে মাঝে মাঝে কাঁপা গলায় কথা বলতেন। অল্পতেই প্রচণ্ড রেগে উঠলেও তিনি ছিলেন সমঝদার মানুষ। সাংঘাতিক ধনী ছিলেন তিনি, কিন্তু তার মৃত্যুর পর এ সম্পত্তির কী ব্যবস্থা হবে তা ঠিক হয়নি। কিছুতেই তাকে উইল করতে রাজি করানো যায়নি। আভাসে-ইঙ্গিতেও মৃত্যুর কথা তুললে উন্মত্তের মতো হয়ে যেতেন বেগম। ভ্যালেনশিয়ার বর্ণনানুসারে, সত্তর বছর বয়স্ক মুন্নী বেগম ছিলেন খাটো ও স্থূল। হুক্কার নেশা ছিল তার। ব্যক্তিগত কর্মচারীদেরকে কর ফাঁকি দিয়ে চোরাচালান ও মাদক ব্যবসায় উৎসাহ দিতেন তিনি।

ক্লাইভ ও হেস্টিংসের সঙ্গে দারুণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল তার। কথিত আছে, তাদেরকে দেওয়া অঢেল উপহারের বিনিময়েই তিনি ‘কোম্পানি মাতা’ উপাধি বাগিয়ে নেন। উপাধিলাভের পর রানি ভবানির কাছ থেকে একটা পাল্কি উপহার পান তিনি। সে পাল্কি টানার জন্য ৩০জন বেহারা লাগত। পাল্কির সঙ্গে বেহারাও উপহার দিয়েছিলেন নাটোরের রানি ভবানি। বেহারাদের ভরণ-পোষণের জন্য একটা জমিও উপহার দেন রানি।

মুন্নী বেগম ছিলেন উদারচিত্ত মানুষ। একবার তার এক চাকরানি প্রবল অর্থসংকটে পড়ে যায়। টাকার অভাবে মেয়ের বিয়ে দিতে পারছিল না সে। খবরটা কানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বাড়িতে ৭০ থেকে ৮০টি স্বর্ণমুদ্রা সমেত অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস পাঠিয়ে দেন বেগম। এছাড়াও এতিম মেয়ে এবং বিধবাদেরকে সাহায্য করতেন তিনি।

এক শিল্পীর আঁকা মুন্নী বেগম

এক শিল্পীর আঁকা মুন্নী বেগম

প্রবল উদ্যমী ও বুদ্ধিমতী এই নারী ছিলেন প্রচণ্ড উদ্ধত ও কর্তৃত্বপরায়ণ স্বভাবের মানুষ। তবে সেইসঙ্গে ভীষণ একনিষ্ঠ আর বিশ্বস্তও ছিলেন। কোনো বন্ধু বা তার ওপর নির্ভরশীল কারো সঙ্গে কখনো প্রতারণা করতেন না। বনেদি ঘরে জন্ম না নিলেও তিনি ছিলেন অস্বাভাবিক গুণী মানুষ। একবার কোনো কাজে হাত দিলে তাতে সফল হওয়ার কোনো না কোনো উপায় ঠিকই বের করে ফেলতেন। কিন্তু এত গুণ থাকা সত্ত্বেও শাসক হিসেবে ব্যর্থ ছিলেন তিনি।

বেগমের দীর্ঘ জীবন ছিল উত্থান-পতনে ভরপুর। স্বামীকে ব্রিটিশদের সাহায্যে মুর্শিদাবাদের মসনদে বসতে দেখেছেন তিনি, তাকে মারা যেতে দেখেছেন। ক্ষমতার কেন্দ্রে এসেছেন, সেখান থেকে আস্তাকুঁড়েও নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। নিজের ছেলেকে পেনশনভোগী হতে দেখেছেন। সাধারণ এক নর্তকী থেকে ক্ষমতার শীর্ষে উঠেছেন। কিন্তু একসময় মৃত্যুর কাছে ধরা দিতেই হয়েছে সিকান্দ্রা থেকে উঠে আসা এই নারীকে। ১৮১৩ সালের ১০ জানুয়ারি,  শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন মুন্নী বেগম। মারা যাবার সময় তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির মূল্য ছিল ১৫ লাখ রুপি। জাফরগঞ্জে, প্রাসাদ থেকে মাইল দেড়েক দূরে, মীর জাফরের পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয় তাকে। তার স্বামী মীর জাফরের পাশেই শেষ আশ্রয় পান এই নারী। মৃত্যুর সময় বেগমের বয়স হয়েছিল সাতানব্বই বছর। বেগমের স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে ১৮১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ফোর্ট উইলিয়ামে  ৯০ বার তোপধ্বনি করা হয়। অর্ধনমিত রাখা হয় ব্রিটিশ পতাকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here