বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিলে নাভিশ্বাস, দায় নেবে কে?

নিজস্ব প্রতিনিধি:করোনা ভাইরাসের এই মহামারির সময়ে বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল সাধারণ মানুষের মাথায় যেন বোঝার ওপর শাকের আঁটি। সেই ভার বইতে না পেরে সারা দেশে জনমনে বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিল নিয়ে তোলপাড় চলছে। একদিকে করোনার প্রাদুর্ভাবে মানুষ উপার্জন হারিয়েছে। অনেকে পথে বসেছে। অনেকের হাতের সঞ্চিত অর্থও শেষ দিকে। অসংখ্য মানুষ চাকুরি হারিয়ে মাথায় হাত দিয়ে দুশ্চিন্তায় ডুবে আছে। এমনই দুঃসময়ে বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিলকে জনস্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে সাধারণ মানুষ। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল নিয়ে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিডেট (ডিপিডিসি) এর কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়া কর্মকর্তারা জবাবে জানিয়েছেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেই ডিপিডিসির গ্রাহকদের অতিরিক্ত বিল ধার্য করা হচ্ছে। ডিপিডিসির আইসিটি দফতর থেকেই বিল বাড়ানোর জন্য বিভাগীয় প্রকৌশলীদের নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। এই নির্দেশনার পরই ডিপিডিসির ৩৬টি ডিভিশন অতিরিক্ত বিল করে।

এ ধরনের ভুতুড়ে বিলের জন্য বিভাগীয় কর্মকর্তা কিংবা নিম্নসারির কর্মকর্তা-কর্মচারিরা দায়ি নয় বলে কারণ দশায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

একইসঙ্গে তারা বলেন, গেল মার্চ মাস থেকে গ্রীষ্মকাল শুরু হওয়ায় বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশ অ্যানার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) জারিকৃত নতুন টারিফ হার কার্যকর হওয়া এবং করোনার সময় গ্রাহকরা বাসায় অবস্থান ও বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে বিলও বেশি হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বিকাশ দেওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছাড়া কোনও ডিভিশনার কর্মকর্তার পক্ষে এভাবে অতিরিক্ত মনগড়া বিল করা সম্ভব নয়। এখন গা বাঁচাতেই ঊর্ধ্বতনরা নিচের লেবেলের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনাকালে বিদ্যুতের বিল নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। লাখ লাখ অভিযোগে রপর ভুতুড়ে বিলের কারণ অনুসন্ধানে মন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করে। কমিটি বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কারণ জানতে চায়।

এসময় বিতরণ কোম্পানিগুলো তদন্ত কমিটি গঠনের পর তদন্ত শুরু করে। ৭ দিনের মধ্যে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল করার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ বিভাগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেয়। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে প্রতিবেদন টাস্কফোর্সের কাছে জমা দেয়।

তদন্তের পর ডিপিডিসি তাদের বেশ কয়েকজন মিটার রিডারসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করে। একইসঙ্গে ৩৬টি জোনের বিভাগীয় প্রকৌশলীকে শোকজ করা হয়। সবশেষ দু’দিন আগেও প্রকৌশলীরা তাদের শোকজের জবাবে ভুতুড়ে বিলের নেপথ্যে ডিপিডিসির আইসিটি দফতরের নির্দেশনার কথা জানায়।

ওই শোকজের জবাবে বিভাগীয় কর্মকর্তারা বলেন, করোনার ভয়াবহতায় সরকার গত ২৬ মার্চ থেকে ৩ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। এ সময়ে মিটার রিডাররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিটার দেখে বিল করতে পারেনি। এই অবস্থায় মার্চ ও এপ্রিল মাসের গড় বিল করার সিদ্ধান্ত হয়।

এই প্রেক্ষিতে ডিপিডিসির আইসিটি দপ্তর থেকে মার্চ মাসে ইম্পোর্ট ও করোনা ফ্যাক্টর বিবেচনা করে ফেব্রুয়ারি মাসের বিল একটি নির্দিষ্ট হারে বৃদ্ধি করে মার্চ মাসের বিল প্রস্তুত করার দিকনির্দেশনা দেয়া হয়। এই নির্দেশনা অনুযায়ী আইসিটি দপ্তর থেকে গড় রিডিং বিল ডাটাবেজে অটো ইনসার্ট করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাসের সঙ্গে তুলনা করে আবাসিক গ্রাহকদের কনজাম্পশন একই হারে বাড়িয়ে মার্চ মাসের গড় বিল প্রকৃত ব্যবহারের চেয়ে বেশি হয়।

অন্যদিকে যেসব গ্রাহক এসি ব্যবহার করেন তাদের প্রকৃত ব্যবহার করা বিল কম হয়। এছাড়া বন্ধ দোকান, অফিস ও খালি ফ্ল্যাটের বিল অতিরিক্ত হয়ে যায়। এ কারণে মার্চ ও এপ্রিল মার্সে বিল বেশি হয়েছে বলে আপত্তি তুলে গ্রাহকরা।

সবশেষ জুন মাসেও অধিকাংশ গ্রাহকদের বিল অস্বাভাবিক হারে বাড়তে দেখা গেছে। এই ত্রাহি দশা থেকে গ্রাহকরা দ্রুত মুক্তি পেতে চায়। এ বিষয়ে জরুরিভিত্তিতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নজরদারির দাবি তাদের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here