আদালতে ঝুলছে হাজার হাজার মানব পাচার মামলা

নিউজ ডেস্কঃ দেশে বিচারিক আদালতগুলোতে হাজার হাজার মানব পাচার সংক্রান্ত মামলা ঝুলে রয়েছে। আদালতে সময়মতো আসামি ও সাক্ষী হাজির করতে না পারায় অনেক মামলার শুনানি করা যাচ্ছে না। মানব পাচার মামলা আইনে জামিন অযোগ্য হলেও উচ্চ আদালত থেকে অধিকাংশ আসামিই জামিন পেয়ে যাচ্ছে। ফলে পাচারের সঙ্গে জড়িতরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ সুযোগে দেশের বিভিন্ন জেলায় সক্রিয় রয়েছে বিপুলসংখ্যক মানব পাচারকারী ও দালাল। বিগত ২০১২ সালের ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে’ সংঘবদ্ধভাবে মানব পাচারের জন্য মৃত্যুদ-, যাবজ্জীবন কারাদ- ও সর্বনিম্ন ৭ বছরের কারাদ- এবং অন্যূন ৫ লাখ টাকা অর্থদ-ের বিধান আছে। মূলত বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি ও রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক, কর্মচারী ও তাদের দালালরা ওসব মানব পাচার চক্রের সদস্য। সচ্ছল জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে তারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বেকার যুবকদের টার্গেট করে। তারপর ৩-৪ লাখ টাকার বিনিময়ে ওসব যুবকদের অবৈধভাবে ইউরোপে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে দালাল চক্র লিবিয়ায় তাদের নেয়ার পর জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করে আসছে। আদালত ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, মানব পাচার ও দালাল চক্রের সদস্যদের হাতে অনেক ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। তার মধ্যে রয়েছে হত্যা, অস্ত্র, পাচার, মানিলন্ডারিং, নির্যাতনসহ অসংখ্য অপরাধ। আর এসব অপরাধের শিকার ভিকটিম অসংখ্য। বিগত ৮ বছরে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে দেশে ৬ হাজার ১৩৪টি মামলা হয়েছে। তবে তার মধ্যে মাত্র ২৩৩টি নিষ্পত্তি হয়েছে। আর বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে ৫ হাজার ৯০১টি মামলা। তার মধ্যে ৩৩টি মামলায় মাত্র ৫৪ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। আর বিচারিক আদালতে বাকি মামলার কার্যক্রম ঝুলে আছে। দেশে কক্সবাজার জেলা ঘিরেই সবচেয়ে বেশি মানব পাচার হয়েছে। সেখানে এখন পর্যন্ত ৬৪২টি মানব পাচারের মামলা হয়েছে। কিন্তু একটিরও বিচার শেষ হয়নি। তাছাড়া গত কয়েক বছরে মানব পাচার অভিযোগে দায়ের মামলায় ৮ হাজার আসামি থাকলেও দুর্বল তদন্ত ও আদালতে সাক্ষী হাজির করতে না পারায় তাদের অধিকাংশের শাস্তি হয়নি।

সূত্র জানায়, সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা রদশের ১৮ জেলাকে মানব পাচারের জোন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ওসব জেলায় সক্রিয় মানব পাচারকারী ও দালাল চক্রের ৪ শতাধিক সদস্য। মানব পাচারের গ্রুপগুলো দেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মাদারীপুর, কিশোরগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, নোয়াখালী, কুমিল্ল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল, বরগুনা ও ঢাকায় বেশি সক্রিয়। শিগগিরই ওসব জেলায় গ্রেফতার অভিযান শুরু হতে হচ্ছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হবে। সম্প্রতি লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশীকে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যাকান্ডের কোন্ জেলায় কে বা কারা মানব পাচার ও দালাল চক্রের সদস্য হিসেবে কাজ করছে ইতিমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থা তা চিহ্নিত করেছে। লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশী হত্যাকান্ডের বিষয়ে দেশের ভেতরে মানব পাচারকারী ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ, র‌্যাব, ডিবি, সিআইডি।

সূত্র আরো জানায়, বিগত ২০১৫ সালে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের হিড়িক পড়েছিল। ওই কারণে নৌকাডুবিতে বঙ্গোপসাগরে লাশ ভাসতে থাকে, থাইল্যান্ডের বনে-জঙ্গলে গণকবর ও কঙ্কাল পাওয়া যায়। বাংলাদেশ থেকে মানবপাচারের ইস্যুটি তখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। তখন দালাল চক্রের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হতে থাকে কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে। প্রশাসন যৌথ অভিযানে নেমে পাচারকারীদের গ্রেফতার করতে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে দালাল চক্রের সদস্যরা পালিয়ে দেশের বাইরে বা বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে চলে যায়। কিন্তু কয়েক মাস পরই অদৃশ্য কারণে থমকে যায় অভিযান। আটকে যায় মামলার কার্যক্রম। আর যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল তাদের বেশির ভাগই জামিনে ছাড়া পেয়ে যায়। তবে সম্প্রতি লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশী হত্যার ঘটনায় রাজধানীতে ১০৮ মানব পাচারকারী এবং ৬টি ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ, র‌্যাব, ডিবি ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তাতে লিবিয়া, দুবাইসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত মানব পাচারকারীদের আসামি করা হয়েছে। ওই ঘটনায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে এ পর্যন্ত মামলা হয়েছে ১০টি। র‌্যাব ও সিআইডি ইতিমধ্যে পৃথক অভিযানে ১৬ মানব পাচারকারীকে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে।

এদিকে মানব পাচার প্রতিরোধ দমন আইনে বিচারের জন্য বিশেষ আদালত বা ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান থাকলেও ৮ বছর পর চলতি বছরের ৯ মার্চ ৭ বিভাগে ৭টি ট্রাইব্যুনাল গঠনের আদেশ হয়েছে। একই সঙ্গে বিচারকও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবে করোনা ভাইরাসের প্রার্দুভাবের কারণে আদালত বন্ধ থাকায় নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকরা এখনো আলাদা ট্রাইব্যুনালে কাজ শুরু করতে পারেননি। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মানব পাচার গর্হিত অপরাধ। ওসব মামলা আদালতে খুব গুরুত্বসহকারে পরিচালনা করা জরুরি। সাক্ষীর কারণে ওসব মামলার বিচার ধীরগতিতে হয়। অথচ অল্পসময়ে ওসব মামলার চার্জশিট প্রদান এবং দ্রুত তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করা উচিত। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। মানব পাচার আইন অনুযায়ী ৩ মাসের মধ্যে অভিযোগ গঠন আর ৬ মাসেই বিচার কার্যক্রম শেষ করার কথা। কিন্তু মামলায় সাক্ষী নিয়মিত পাওয়া যায় না। পুলিশ সাক্ষীদের ঠিকমতো হাজির করতে পারে না। ফলে মামলার বিচার শেষ করতে দেরি হচ্ছে। অথচ বিদেশে ভাগ্য বদলাতে গিয়ে পাচারকারীদের হাতে প্রতিনিয়তই প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। পাচারকারীদের হাতে হচ্ছে নির্মম নির্যাতনের শিকার। ওসব ঘটনায় বিচার চেয়ে নিহতের পরিবার বিভিন্ন সময় মামলা করলেও সুবিচার পাচ্ছে না।

অন্যদিকে মানব পাচার প্রসঙ্গে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ জানান, মানব পাচার মামলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা মানব পাচার করছে তাদের বিচার সঠিক আইনে সম্পন্ন করতে হবে। যেন কোনো অপরাধী আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে না যায়। এ ব্যাপারে আদালত, প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থাকে সতর্ক থাকতে হবে। আর তা করা গেলে নিশ্চয়ই মানব পাচার কমে আসবে।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম জানান, মানব পাচার মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এই অপরাধের বিচার না হলে অপরাধীরা আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সম্প্রতি লিবিয়ার ঘটনার পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। অবশ্য ইতিমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মূল পাচারকারীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হলে এ ধরনের অপরাধ কমে আসবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here