করোনা মহামারি: সেলুনেও বিক্রি হচ্ছে অক্সিজেন সিলিন্ডার

নিজস্ব প্রতিনিধিঃকরোনা ভাইরাস সংক্রমণজনিত শ্বাসকষ্ট থেকে জীবন রক্ষায় বাজার থেকে সিলিন্ডার ভর্তি অক্সিজেন সংগ্রহের দিকে ঝুঁকছেন বহু মানুষ, যাতে বেসরকারি উদ্যোগে অক্সিজেনের সরবরাহ ব্যবস্থায় তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি ও অক্সিজেন সরবরাহে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সঙ্কটের কারণে ইতোমধ্যেই সিলিন্ডারভর্তি অক্সিজেনের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। তবে গত দশ-বারোদিন থেকে চড়া দামেও মিলছে না জীবন রক্ষাকারী এই অক্সিজেন।

বেশ কিছুদিন ধরে যারাই অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনছেন চড়া মূল্য গুনতে হচ্ছে তাদের। ঢাকার বিভিন্ন অক্সিজেন সিলিন্ডার বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশে করোনায় মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দাম বেড়েছে জীবন বাঁচানো এই মেডিক্যাল গ্যাস সিলিন্ডারের। করোনা সংক্রমণ শুরুর আগে এর দাম ১০-১২ হাজার টাকা এবং তারও আগে ৫-৬ হাজার টাকার মধ্যে থাকলেও সম্প্রতি তা এক লাফে বেড়ে ২০-২২ হাজার হয়ে যায়।

গত জুন মাসের ১ তারিখ থেকে বাজারে সিলিন্ডার সংকট দেখা দেওয়ায় এর দাম আরও বাড়তে বাড়তে এখন ৪৭ হাজার টাকায় এসে ঠেকেছে। এমনকি ১ হাজার ৪০০ লিটারের (১ দশমিক ৪ কিউবিক মিটার) অক্সিজেন সিলিন্ডার ৪৭ হাজার টাকা মূল্যেও পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে, প্রচুর চাহিদার কারণে হোম সার্ভিসে অক্সিজেন ডেলিভারির বেশকিছু প্রতিষ্ঠানও রাতারাতি গজিয়ে উঠেছে। আকাশছোঁয়া দামে বিক্রি হচ্ছে একেকটি সিলিন্ডার। অনেকে কিনতে না পেরে স্বজন বাঁচাতে তড়িঘড়ি ভাড়ায় নিচ্ছে অক্সিজেন সিলিন্ডার।

সিলিন্ডারের পাশাপাশি পোর্টেবল অক্সিজেন ক্যান, পোর্টেবল ভেন্টিলেটর ও দেহের অক্সিজেন লেভেল পরিমাপের জন্য পালস অক্সিমিটার নামের ছোট একটি যন্ত্র অনলাইনে বিক্রির শীর্ষে রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ ছাড়াই অক্সিজেন সিলিন্ডারের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারে প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসাসংশ্লিষ্টরা।

চিকিৎসাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলো কোথা থেকে আমদানি করা হচ্ছে বা এগুলো মেয়াদ উত্তীর্ণ কিনা তা যাচাই ছাড়াই বাজারজাত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। চাহিদার কারণে খোলাবাজারে এভাবে ঢালাও অক্সিজেন সিলিন্ডার বিক্রি করা কোনোভাবেই উচিত নয়। তাছাড়া বাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার রাখার ফলে অগ্নিকাণ্ডের বড় ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

এদিকে, গতকাল মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে রাজধানীর গুলশান ও তেজগাঁওয়ে অনুমোদন না নিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার মজুদ, বিক্রি ও ভাড়ায় চালানোর অভিযোগে অভিযান পরিচালনা করেছে র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে রাজধানীর তেজগাঁও কলোনি বাজার মার্কেটে (হকার্স মার্কেট) এক সেলুনসহ তিন প্রতিষ্ঠানকে মোট ১১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

অভিযান পরিচালনাকারী র‍্যাব-৩ এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ বসু ব্রেকিংনিউজকে জানান, মেসার্স তাহের এন্টারপ্রাইজ মূলত এলপি গ্যাসের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তারা করোনাভাইরাস পরিস্থিতির সুযোগে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের অনুমোদন না নিয়ে এলপি গ্যাসের ব্যবসার আড়ালে অক্সিজেন সিলিন্ডারও বিক্রি করে আসছিল, সঙ্গে ভাড়ায় সিলিন্ডার সরবরাহ করছিল।

তিনি বলেন, অক্সিজেন সিলিন্ডার মূলত এক ধরনের ড্রাগ, যা ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের অনুমোদন ছাড়া মজুত বা বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি অবৈধভাবেই তা করে আসছিল। এজন্য প্রতিষ্ঠানটির মালিক আবু তাহের কুরাইসিকে পাঁচ লাখ ও সহযোগী ইয়াসিনকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

তেজগাঁও কলোনি বাজারের পাশেই একটি সেলুন। কিন্তু সেই সেলুন ব্যবসার আড়ালে ভেতরে অক্সিজেন সিলিন্ডারের মজুত দেখা যায়। এসব সিলিন্ডার বিক্রির জন্য রেখেছেন বলে স্বীকার করেন সেলুনের মালিক গোকুল।

অক্সিজেন সিলিন্ডার বিক্রির জন্য প্রতিষ্ঠানটির কোনো অনুমোদন নেই। সেলুনের আড়ালে অক্সিজেন সিলিন্ডার বিক্রি এক ধরনের প্রতারণা। ফলে সেলুনের মালিক গোকুলকে ভোক্তা অধিকার আইনে দুই লাখ টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া একই মার্কেটের এসএসকে এন্টারপ্রাইজ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানকেও একই অভিযোগে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ বসু বলেন, মূলত ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবসা করে এসএসকে এন্টারপ্রাইজ। কিন্তু সেখানেও অভিযান পরিচালনা করে মেডিকেল অক্সিজেন পাওয়া যায়। এসব বিক্রির কোনো অনুমোদন নেই তাদের।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক ইমাম হোসেন শাকিল জানান, তিনি মূলত ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন সিলিন্ডারে ব্যবসা করেন, তবে সম্প্রতি তিনি মেডিকেল সিলিন্ডার বিক্রির জন্য মজুত করেছিলেন।

এসএসকে এন্টারপ্রাইজের মালিক মালিক শাকিলকে এক লাখ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

অভিযানে উপস্থিত ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের কর্মকর্তাদের বরাতে পলাশ বসু আরও বলেন, জব্দ সিলিন্ডারগুলো আসলে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন নাকি মেডিকেল অক্সিজেন সেটা আমরা কেউই জানি না। যেহেতু যথাযথ অনুমোদন নেই, সেজন্য বিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া যদি কোনোভাবে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কথা বলে ভেতরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন ঢোকানো হয়, তাহলে বাসাবাড়িতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। তিন প্রতিষ্ঠান থেকেই শতাধিক সিলিন্ডার জব্দ করা হয়েছে।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অক্সিজেন ব্যবহার করা বেশি ক্ষতিকর বলে মনে করেন হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান এবং প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী।

তিনি ব্রেকিংনিউজকে বলেন, মেডিক্যাল অক্সিজেন একটি রোগের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয় যেমনটি হলো ওষুধ। অন্যান্য ওষুধের মতো অক্সিজেন নিজে নিজে ব্যবহারের সুযোগ নেই। আমরা করোনা রোগীর ক্ষেত্রে অক্সিজেন ব্যবহার করি তিনভাবে। একটি হচ্ছে, সিলিন্ডার, হাই ফ্লো এবং আরেকটি হচ্ছে রোগীর শ্বাসতন্ত্রে কৃত্রিম যন্ত্র দিয়ে ব্যবহার করি। রোগীর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে সেই মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য করে কী পরিমাণ অক্সিজেন দিতে হবে, তার একটি চিকিৎসাবিজ্ঞানীয় হিসাব আছে। এজন্য এটি নিজে নিজে কিনে ব্যবহারের যুক্তি নেই।

তিনি আরও বলেন, অক্সিজেনের অযৌক্তিক এবং অতিরিক্ত ব্যবহারে চোখের লেন্সে ক্ষতি হয়, ফুসফুসের ক্ষতি হয়। তাই চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া কেউ যেন অক্সিজেনের সিলিন্ডার কিনে ব্যবহার না করে। তা না হলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

এদিকে, মেডিক্যালে ব্যবহৃত জিনিসপত্র মজুদ না করতে বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (মহাপরিচালকের দায়িত্বপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা।

তিনি বলেন, কোভিড-১৯ চিকিৎসায় অক্সিজেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে অনেকেই বাসায় অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে রাখছেন কোভিভ-১৯ চিকিৎসায় ব্যবহার করার জন্য, যা ঠিক নয়। কারণ অক্সিজেন প্রয়োগ একটি কারিগরি বিষয়। দক্ষ চিকিৎসক ছাড়া অক্সিজেন প্রয়োগ করলে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাছাড়া কোভিড-১৯ চিকিৎসায় অনেক ক্ষেত্রে হাইপো অক্সিজেন দিতে হয়। যা বাসায় দেওয়া সম্ভব না।

তিনি বলেন, আপনার এই মজুদ অক্সিজেন সিলিন্ডারের কারণে আপনার নিকটাত্মীয় বা আপনজন হাসপাতালে অক্সিজেনের অভাবে বিপদের সম্মুখীন হতে পারে।

জনসাধারণের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, বাসায় অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে মজুদ করবেন না। তাতে বাজারে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে। হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগী অক্সিজেন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে। যা আমাদের কারো কাম্য নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here