করোনার আরেক রূপ ব্ল্যাক ডেথ

কানিছ সুলতানা কেয়া :

সারা বিশ্ব এখন করোনায় আতঙ্কিত। চীনের উহান থেকে এটি বিস্তার লাভ করলেও বর্তমানে অনেক দেশ এতে আক্রান্ত। এরইমধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন প্রায় চার হাজার মানুষ। কোভিড-১৯ যা করনাভাইরাস নামেই পরিচিত।

জানেন কি? বিশ্বে এর আগে বেশ কিছু ভাইরাস সংক্রমন হয়েছিল। যা মহামারী রূপ ধারণ করেছিল। যাতে মারা গেছে হাজার হাজার মানুষ। ২০০২ সাল থেকে চীনে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে সার্স। যার পুরো নাম সিভিয়ার এ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম। এ ভাইরাসের সংক্রমণে পৃথিবীতে ৭৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল আর ৮০৯৮ জন সংক্রমিত হয়েছিল। সেটিও ছিল এক ধরণের করোনাভাইরাস।

১৪ শতাব্দীতে ইউরোপে দেখা দিয়েছিল ব্ল্যাক ডেথ। সে সময় সারা বিশ্বে প্রায় ৫০মিলিয়ন মানুষ এ ভাইরাসে মারা গিয়েছিল। সময়টা ছিল ১৩৪৭ থেকে ১৩৪৮। এ সময়টাতেই ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ ইউরোপকে প্রায় বিধ্বস্ত করে ফেলেছিল।

ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ ইউরোপকে প্রায় বিধ্বস্ত করে ফেলেছিলআজ আপনাদের মহামারী করোনার আরেক রূপ ব্ল্যাক ডেথের আদ্যোপান্তই জানাবো-

ব্ল্যাক ডেথের সময়কাল:

এ মহামারীর সময়কাল ছিল ১৩৪৭ থেকে ১৩৪৮ সাল পর্যন্ত। এরমধ্যে ১৩৪৭ সালে ইউরোপে আর পরের বছর অর্থাৎ ১৩৪৮ সালে এটি হানা দেয় ইংল্যান্ডে। এই কম সময়েই প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষের প্রাণ নেয় এটি। ১৩৫০ এর শুরুর দিকেই ব্ল্যাক ডেথের প্রাদুর্ভাব কমে যায়।

কেমন ছিল ব্ল্যাক ডেথ?

মধ্যযুগের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় ব্ল্যাক ডেথ। এই মহামারীতে মৃত্যুর হাড় এতই ছিল যে অনেকে এটিকে ‘ম্যাগনা মরটালিটাস’ বলে অভিহিত করেছেন। একজন পর্যবেক্ষক বলেছিলেন, জীবিত লোকেরা মৃতদেহকে কবর দেয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। এতো মানুষ মারা গিয়েছিল যে তাদের কবর বা সৎকার করার মতোও যথেষ্ট সুস্থ মানুষ পাওয়া যেত না।

ব্ল্যাক ডেথের উদ্ভব:

ব্ল্যাক ডেথ পূর্ব ও ভূমধ্যসাগর থেকে শুরু হয়ে ইতালি, স্পেন ও ফ্রান্সে সংক্রমণ ঘটায়। এরপর এটি ব্রিটেনে ছড়িয়ে পরে। সেইসঙ্গে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে ডরসেট এবং হ্যাম্পশায়ারে ছড়িয়ে যায়। এখান থেকে  উত্তর এবং পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পরে স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং রাশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

বাদুড়কীভাবে ব্ল্যাক ডেথ ছড়িয়েছিল?

কোভিড-১৯ ছড়িয়েছে বাদুড়ের মাধ্যমে। সেসময় ধারণা করা হয় যে প্লেগ বা ব্ল্যাক ডেথ ইঁদুর থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। যদিও অধ্যাপক স্যামুয়েল কোহনের মতে, সেসময়কার কোনো পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছিলেন ইঁদুরের মাধ্যমে এর আগে এমন কোনো ভাইরাস এর আগে ছড়ায়নি।

প্লেগ বা ব্ল্যাক ডেথ ইঁদুর থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিলকারা বেশি আক্রান্ত হয়েছিলেন?

বৃদ্ধ, যুবক, নারী, পুরুষ সব বয়সী মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল। কেউ-ই এ থেকে সুরক্ষিত ছিল না। ইতালির ক্যাথেড্রাল বিল্ডিং থেকে ইংল্যান্ডে মৃৎশিল্প উত্পাদন কারিগরসহ সব পেশার মানুষ আক্রান্ত হয়ে মারা যায় তখন। সেসময় এমন হয়েছিল যে জমি চাষ বা গবাদি পশু চড়ানোর জন্য কোনো লোক ছিল না। এ  ভাইরাসে মারা যান সিয়ানার লরিঞ্জের মতো বিখ্যাত শিল্পী। এছাড়াও ইংরেজ রাজকীয় রাজমিস্ত্রি রামসিস মারা গিয়েছিলেন ব্ল্যাক ডেথে।

ব্ল্যাক ডেথের লক্ষণগুলো কী ছিল?

ব্লয়াক ডেথের বেশ কিছু লক্ষণ ছিল। যার মধ্যে সব থেকে বেশি যে লক্ষণ দেখা দিত। তা হলো- শরীর ফুলে যাওয়া, কুচকানো অংশ যেমন ঘাড়, বগল এসব জায়গায় ঘা হওয়া, রক্ত বমি ইত্যাদি। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আধা ঘণ্টা থেকে পাঁচ দিনের মধ্যেই রোগীর মৃত্যু হয়।

কতো লোক মারা গিয়েছিল ব্ল্যাক ডেথে?

ব্ল্যাক ডেথ এতো মানুষ মারা গিয়েছিল যে তাদের কবর বা সৎকার করার মতোও যথেষ্ট সুস্থ মানুষ পাওয়া যেত নামাত্র দুই বছরে ইউরোপে ব্ল্যাক ডেথের ফলে ৫০ মিলিয়ন লোক মারা গিয়েছিল। যা তাদের জনসংখ্যা প্রায় ৮ কোটি থেকে কমে ৩ কোটিতে পৌঁছেছিল। এতো মানুষ মারা গিয়েছিল যে তাদের কবর বা সৎকার করার মতোও যথেষ্ট সুস্থ মানুষ পাওয়া যেত না। এমনকি পরবর্তিতে এমন হয়েছিল যে জমি চাষের জন্যও লোক ছিল না  ইউরোপের গ্রামগুলোতে। বেশ কয়েক বছর খাদ্যের সংকট দেখা দেয় ইউরোপের দেশগুলোতে।

ব্ল্যাক ডেথ কি একবারই এসেছিল?

এ ভাইরাসটি পৃথিবীকে আক্রমণ করেছে তিনবার। প্রথমত, খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে এটি আন্তর্জাতিক মহামারী আকারে দেখা দিয়েছিল। দ্বিতীয়বার ১৩৬১ সালে ব্রিটেনে ফিরে এসেছিল এটি। সেসময় কম বয়সী এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে এ ভাইরাসটি। শেষবার ১৮৯০ এর দশকে এশিয়াতে আরও একবার এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে।

ব্ল্যাক ডেথের চিকিত্সার জন্য কোন প্রতিকারগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল?

মধ্যযুগের লোকেরা বিশ্বাস করত যে ব্ল্যাক ডেথ ইশ্বরের কাছ থেকে এসেছে। তাই তারা প্রার্থনা ও মিছিলের মাধ্যমে এর প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল। এছাড়া সেসময় এর তেমন কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারেনি বিজ্ঞানীরা। তবে ১৮৯০ এর দশকে এশিয়ায় এ ভাইরাসের সংক্রমন দেখা দিলে তখন কিছু প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়েছিল। ১৯ শতকে চীন এবং ২০ শতকে এসে ভিয়েতনামে এর আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here