বিটকয়েনঃ বিশ্বের সর্বপ্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সির ইতিকথা

নিউজ ডেস্ক :মুদ্রা বলতে আগে আমরা বুঝতাম ধরা ছোয়া যায় এমন কোনো বস্তু। হতে পারে সেটা কাগজের অথবা ধাতুর কয়েন। বর্তমান আধুনিক যুগে ইন্টারনেটের কল্যাণে আমরা সবাই কম বেশি বিটকয়েনের নাম শুনেছি হয়ত। বিটকয়েন অন্য মুদ্রাব্যবস্থা থেকে আলাদা কেনো? কেনো বিটকয়েন এত পরিচিতি পেলো? কিন্তু তার আগে জেনে নেওয়া যাক বিটকয়েন কী?

বিটকয়েন হলো একধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি। ক্রিপ্টো শব্দের অর্থ অপ্রকাশ্য। ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো এমন একধরনের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থা যার কোনো প্রকাশ্য বা বাস্তব রূপ নেই। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো বিটকয়েন। যেকোনো মুদ্রা ব্যবস্থায় লেনদেনের ক্ষেত্রে সাধারনত একটি তৃতীয় পক্ষের আশ্রয় নিতে হয়। কিন্তু বিটকয়েন এমন একটি মুদ্রা ব্যবস্থা যাতে অর্থ আদান-প্রদানের জন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন হয় না।

বিটকয়েন ‘(peer-to-peer)’ ব্যবস্থায় লেনদেন করে। এই ব্যবস্থায় প্রেরকের কাছ থেকে সরাসরি বিটকয়েন প্রাপকের কাছে পৌছে যায়। তৃতীয় পক্ষীয় কোনো সংস্থা এই লেনদেন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে না, তাই বিটকয়েনের লেনদেনের গতিবিধি নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখেই বিটকয়েন লেনদেন করা যায়। বিটকয়েন অন্য মুদ্রার সাথে বিনিময় করা যায়। এমনকি কোনো পণ্য এবং সেবার মূল্য হিসেবে পরিশোধ করা যায়। ২০১৭ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় অনুসন্ধান করেছিলো। তাদের মতে সেই সময়ে ২.৯ থেকে ৫.৮ মিলিয়ন মানুষ ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেট ব্যবহার করতো। আর তাদের বেশির ভাগ ব্যবহার করতো বিটকয়েন।

বিটকয়েনের আবিষ্কার
তাহলে এইবার মনে প্রশ্ন আসতে পারে এই বিটকয়েন আসলো কীভাবে? কে এই মুদ্রার আবিষ্কারক? ঘটনার শুরু ২০০৮ সালের ১৮ই আগস্ট। ঐদিন প্রথম “bitcoin.org“ নামের ডোমেইন নিবন্ধন করা হয়।

ঐ বছরের নভেম্বরে সাতোশি নাকামোতো এই মুদ্রাব্যবস্থার প্রচলন করেন। ২০০৯ সালের জানুয়ারী মাসে সাতোশি নাকামোতো বিটকয়েন তৈরি করার সফটওয়্যারের কোড অনলাইনে রিলিজ করেন। তৈরি হয় বিটকয়েন ‘মাইনিং’ এর সফটওয়্যার। বিটকয়েন মাইনিং হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বিটকয়েন তৈরি করা হয়। ২০০৯ সালের এই জানুয়ারি মাসেই সাতোশি বিশ্বের প্রথম বিটকয়েন তৈরি করেন। বহু বার বহুজনকে সাতোশি নাকামোতো সন্দেহে গ্রেফতার করা হলেও প্রকৃত সাতোশি নাকামোতো কে বা এই নামের পেছনে কে বা কারা আছে তা আজও জানা যায়নি।

বিটকয়েন যেভাবে কাজ করে
বিটকয়েন হলো ওপেন সোর্স ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রোটকলের মাধ্যমে লেনদেন হওয়া সাংকেতিক মুদ্রা। তিনি এই মুদ্রাব্যবস্থাকে পিয়ার-টু-পিয়ার লেনদেন নামে অভিহিত করেন। পিয়ার টু পিয়ার ব্যবস্থার কারণে বিটকয়েন প্রেরক থেকে সরাসরি প্রাপকের ‘ডিজিটাল ওয়ালেটে’ চলে যায়। ডিজিটাল ওয়ালেট অনলাইন কিংবা অফলাইন দু’ধরনেরই হয়। অনলাইন ওয়ালেট ব্যবহারকারী তার স্মার্টফোন কিংবা কম্পিউটারের মাধ্যমে ব্যবহার করতে পারে। প্রতিটি ওয়ালেটের একটি নির্দিষ্ট এড্রেস বা ঠিকানা থাকে। ঠিকানাটি সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড হয় বলে এটি মনে রাখা অসম্ভব। বিটকয়েন লেনদেনের জন্য ব্যবহারকারী তার এই ঠিকানাটি ব্যবহার করে থাকেন। বিটকয়েন পদ্ধতিতে হিসাবের একক হলো বিটকয়েন। বিটিসি এবং এক্সবিটি ইত্যাদি প্রতীকের মাধ্যমে বিটকয়েনকে উপস্থাপন করা হয়।

বিটকয়েন লেনদেনের জন্য কোন ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রনকারী প্রতিষ্ঠান বা নিকাশ ঘরের প্রয়োজন হয় না। বিটকয়েনের লেনদেনটি বিটকয়েন মাইনার নামে একটি সার্ভার কর্তৃক সুরক্ষিত থাকে। বিটকয়েন মাইনিং একটি জটিল প্রক্রিয়া। পিয়ার-টু-পিয়ার যোগাযোগ ব্যাবস্থায় যুক্ত থাকা একাধিক কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের মধ্যে বিটকয়েন লেনদেন হলে এর কেন্দ্রীয় সার্ভার ব্যবহারকারীর লেজার হালনাগাদ করে দেয়। একটি নির্দিষ্ট মাইনিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হয়। এজন্য প্রয়োজন হয় উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কম্পিউটার। কম্পিউটারের সিপিইউ এবং জিপিইউ ব্যবহার করে জটিল কিছু গাণিতিক এলগরিদমের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। একটি লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে নতুন বিটকয়েন উৎপন্ন হয়।

২১৪০ সাল পর্যন্ত নতুন সৃষ্ট বিটকয়েনগুলো প্রত্যেক চার বছর পরপর অর্ধেকে নেমে আসবে। ২১৪০ সালের পর ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন তৈরী হয়ে গেলে আর কোন নতুন বিটকয়েন তৈরী করা হবে না। বিটকয়েন লেনদেন ও নতুন বিটকয়েন তৈরির এই সমস্ত প্রক্রিয়াটিই ঘটে অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে। ফলে এতে কোনো ধরনের ছলচাতুরী কিংবা প্রতারণার সম্ভবনা থাকে না। উভয় পক্ষেরই পরিচয় থাকে গোপন।

সম্প্রতি কানাডার ভ্যানক্যুভারে বিটকয়েন এর প্রথম এটিএম মেশিন চালু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এটি বিটকয়েনকে আরও আগিয়ে নিয়ে যাবে। এটি কোন কেন্দ্রীয় নিকাশঘরের মধ্য দিয়ে যায় না কিংবা এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান নেই। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার সাথে সাথে এটি গ্রাহকের ওয়ালেটে সংরক্ষিত থাকে। এই সংরক্ষিত বিটকয়েন যদি গ্রাহক কর্তৃক অন্য কারও একাউন্টে পাঠানো হয় তাহলে এই লেনদেনের জন্য একটি স্বতন্ত্র ইলেক্ট্রনিক সিগনেচার তৈরী হয়ে যায় যা অন্যান্য মাইনার কর্তৃক নিরীক্ষিত হয় এবং নেটওয়ার্কের মধ্যে গোপন অথচ সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত হয়।

একই সাথে গ্রাহকদের বর্তমান লেজার কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে হালনাগাদ হয়। বিটকয়েন দিয়ে কোন পণ্য কেনা হলে তা বিক্রেতার একাউন্টে পাঠানো হয় এবং বিক্রেতা পরবর্তীতে সেই বিটকয়েন দিয়ে পুনরায় পণ্য কিনতে পারে, অপরদিকে সমান পরিমাণ বিটকয়েন ক্রেতার লেজার থেকে কমিয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যেক চার বছর পর পর বিটকয়েনের মোট সংখ্যা পুনঃনির্ধারন করা হয় যাতে করে বাস্তব মুদ্রার সাথে সামঞ্জস্য রাখা যায়। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াটা সবসময় অনুমানযোগ্য এবং সীমিত। বিটকয়েনকে অনেকে ফিউচার মানি হিসেবে মনে করছে।

বিটকয়েনের অনন্য কিছু বৈশিষ্ট্য

বিটকয়েন পদ্ধতি অনেকটা নতুন বিষয়। এটাও পেপাল, মানি বুকার্স এর মতো লেনদেন পদ্ধতি বা গেটওয়ে। অন্য কোনো শেয়ার মার্কেট অথবা বিটকয়েন মার্কেটে এটি বিক্রয় করা যাবে।

বর্তমানে ইউরোপ, আমেরিকার বহু দেশে বিটকয়েন জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সমগ্র বিশ্বে বিটকয়েন চালু হইতে খুব বেশি দেরি নেই।

বিটকয়েন একটি সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীভূত মুদ্রা ব্যবস্থা। সরকার কিংবা কোনো কর্তৃপক্ষ এটি নিয়ন্ত্রণ করে না। পিয়ার টু পিয়ার ব্যবস্থার ফলে এখানে প্রত্যেক ব্যবহারকারী তাদের বিটকয়েনের প্রকৃত মালিক। অন্য কেউ তাদের বিটকয়েন নেটওয়ার্কের মালিকানা নিতে পারে না।

বিটকয়েন লেনদেনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিই হয় নাম বিহীনভাবে। একজন বিটকয়েন ব্যবহারকারী একাধিক বিটকয়েন একাউন্ট খুলতে পারে। এসব একাউন্ট খোলার জন্য কোনো ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন ব্যবহারকারীর নাম, ঠিকানা ইত্যাদি প্রয়োজন হয় না। ফলে ব্যবহারকারীর প্রকৃত পরিচয় থাকে গোপন।

বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অত্যন্ত স্বছভাবে। প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড ব্লকচেইনে জমা থাকে যা যে কেউ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে যখন তখন দেখতে সক্ষম। ফলে এখানে কোনো দুর্নীতির সুযোগ নেই।

বিটকয়েন একাউন্ট খোলা খুবই সহজ। এক্ষেত্রে সাধারণ ব্যাংক একাউন্ট খোলার মতো কোনো ঝামেলাযুক্ত ফর্ম পূরণ করতে হয় না। কোন এক্সট্রা ফি-ও প্রয়োজন হয় না। কোনো কাগজপত্রও জমা দেওয়া লাগে না।

বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া খুবই দ্রুত। পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই বিটকয়েন পাঠানো হোক না কেন তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রাপকের কাছে পৌঁছে যাবে।

বিটকয়েনের কিছু অসুবিধা

বিটকয়েন সম্পূর্ণ অফেরতযোগ্য। অর্থাৎ কেউ ভুল করে কোনো ভুল ঠিকানায় বিটকয়েন পাঠিয়ে দিলে তা আর ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়।

বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে না। প্রেরক-প্রাপক উভয়ের পরিচয়ই সম্পূর্ণ গোপন থাকে। ফলে অনেক অপরাধমূলক কাজে বিটকয়েন ব্যবহার করা সম্ভব। অবৈধ পণ্যের কেনা বেচাতেও বিটকয়েন ব্যবহৃত হয়। ইন্টারনেটের গোপন অংশ ডার্ক ওয়েবের সমস্ত লেনদেন হয় বিটকয়েনের মাধ্যমে।

বিটকয়েনের মূল্য অনেকটাই অস্থিতিশীল। কখনো বিশাল পরিমাণে বাড়ে তো কখনো বিশাল ধস নামে।

বর্তমান বিশ্বে বিটকয়েনের মূল্য ও বাংলাদেশে এর অবস্থা

বিটকয়েন প্রথম চালু হওয়ার পর থেকে দিন দিন এর মূল্য বেড়েই চলেছে। ২০১১ সালে বিটকয়েনের বাজারমূল্য সর্বপ্রথম ০.৩০ ডলার থেকে ৩২ ডলারে উঠে। এরপর ২০১৩ সালে এর দাম উঠে যায় ২৬৬ ডলারে।

এভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বিটকয়েনের দাম। ২০১৬ সালের শেষের দিকে এই দাম চলে আসে ৬০০ ডলারের উপরে। এরপর ২০১৭ সালে বিটকয়েনের দাম বেড়ে যায় রেকর্ড পরিমাণ। বর্তমানে ১ বিটকয়েন সমান ৬৪৬৪.৫০ ইউএস ডলার এবং বাংলাদেশে ১ বিটকয়েন সমান ৫,৪৪,৩৭২ টাকা। অর্থাৎ অনেকটা শেয়ার বাজারের মতোই এর দাম উঠানামা করে। বিশ্বের বহু দেশে বিটকয়েন অনেক জনপ্রিয়। ওয়ার্ডপ্রেস, মাইক্রোসফট, উইকিপিডিয়া, ওভারস্টকের মতো বিশ্বের প্রায় ত্রিশ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান বিটকয়েন গ্রহণ করে। দিন দিন এর জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বাড়ছে। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস পর্যন্ত বিটকয়েন নিয়ে মন্তব্য করছেন, ‘Bitcoin is better than currency’।

বাংলাদেশ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসাবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনে অন্তর্ভুক্ত হয় ২০১৪ সালের ১৫ আগস্টে। কিন্তু বিটকয়েন ফাউন্ডেশনে যুক্ত হওয়ার ঠিক এক মাসের মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় বিটকয়েনের সকল লেনদেনের উপর। অর্থাৎ বাংলাদেশে বিটকয়েন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “যে কেউ ভার্চুয়াল মুদ্রা নিয়ে ধরা পড়লে দেশের অবৈধভাবে পাওয়া অর্থের যথাযথ বিধি অনুযায়ী জেল হতে পারে।“ অর্থাৎ বিটকয়েন লেনদেনকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশে বিটকয়েনের উপর এই নিষেধাজ্ঞা বজায় রয়েছে। বিভিন্ন কারনে বিটকয়েনের সমালোচনা করা হয়। মূল্য ধারনার অনিশ্চয়তা, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং অবৈধ ব্যবহার এদের মধ্যে অন্যতম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here