নিজেদের প্রণয় দিয়ে ইতিহাসে আলোচিত যারা

নিউজ ডেস্ক : মানবজাতির সৃষ্টির আদি থেকে এই পর্যন্ত অনেক কিছু বদলে গেলেও যে জিনিসটি আজও বদলায়নি তা হচ্ছে নর-নারীর প্রেম। তারা এখনো একে অন্যের জন্য তীব্রতা অনুভব করে। বিচ্ছেদে জেগে ওঠে বিরহ আর একে অন্যকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুলতা তাদের অস্থির করে তোলে। পৃথিবীতে বিচরণকারী নরনারীর একের প্রতি অন্যের রহস্যাতীত আকর্ষণবোধকে কেউ কোন কিছু দিয়েই ব্যাখ্যা করতে পারেনি।

এইসব অনুভূতি মানুষের দেশ, ধর্ম ও অবস্থানভেদে ভিন্ন হয় না। তবে নিজেদের অবস্থানের জন্য কারো কারোটা ইতিহাসের পাতায় অক্ষয় হয়ে যায়। এমন বেশ কিছু বিখ্যাত মানুষ ছিলেন যারা তাদের কীর্তির পাশাপাশি ইতিহাসে অক্ষয় হয়েছেন তাদের প্রেমের জন্য। এমনই কিছু ইতিহাস বিখ্যাত মানুষের প্রেম নিয়ে আলোচনা করবো।

ক্লিওপেট্রা ও অ্যান্টনি
শতাব্দীর পর শতাব্দী যার নাম ব্যবহৃত হয়ে এসেছে সৌন্দর্যের উপমা হিসেবে, যার সৌন্দর্য সবাইকে তাক লাগিয়ে এসেছে, যার সৌন্দর্যের মায়াজালে আটকা পড়েছে অনেক বড় বড় মানুষ সে আর কেও নন, রানী ক্লিওপেট্রা। আলেকজেন্ডার মিশর দখল করার পর তার সেনাপতি প্রথম টলেমী মিশরের দায়িত্ব হাতে নেন এবং মিশরের রাজা নিযুক্ত হন। খ্রিষ্টপূর্ব ৫১ শতাব্দীতে ক্লিওপেট্রার পিতা দ্বাদশ টলেমী যখন মারা যান ক্লিওপেট্রার বয়স তখন মাত্র ১৮ এবং তার ভাই ত্রয়োদশ টলেমীর বয়স মাত্র ১০।

তখনকার মিসরীয় আইন অনুসারে দ্বৈত শাসনের নিয়মে রানী ক্লিওপেট্রার একজন নিজস্ব সঙ্গী থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। কাজেই ক্লিওপেট্রাকে বিয়ে করতে হয় তারই ছোটভাই টলেমি-১৩ কে, যখন টলেমির বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে তাদের মাঝে নানা বাঁধা চলে আসে। যার ফলে সৃষ্টি হয় দূরত্ব। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার মিশরে এসেই ক্লিওপেট্রার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তার প্রেমে হাবুডুবু খেতে শুরু করেন এবং ক্লিওপেট্রার বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়ে টলেমীকে পরাজিত করেন ও ক্লিওপেট্রা কে মিশরের একমাত্র সম্রাজ্ঞী হিসেবে ঘোষণা করেন।

বেশ কয়েক বছর পর মিশরে আবির্ভাব ঘটে রোমের পরাক্রমশালী বীর মার্ক অ্যান্টনির। তিনি ক্লিওপেট্রার রূপ-লাবণ্যের সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন। সাগ্রহে অপেক্ষা করে ছিলেন তার সাহচর্য পাওয়ার জন্য। ক্লিওপেট্রাকে এক নজর দেখার আশায় তিনি রোম থেকে এসে হাজির হলেন ক্লিওপেট্রার প্রাসাদের সামনে। অ্যান্টনির এই আগ্রহের কথা ক্লিওপেট্রারও অজানা ছিল না। বীর অ্যান্টনির আগমনের খবর পেয়ে রানী ক্লিওপেট্রাও আগ্রহী হয়ে পড়েন এই বীরের ব্যাপারে। প্রথম দেখায়ই একজন আরেকজনের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। মিসর জয় করতে এসে রানীকেই জয় করে নেন রোমান বীর অ্যান্টনি। অ্যান্টনির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা প্রকট রূপ নিল। তার জন্য ক্লিওপেট্রাকে পাওয়া যেন দেশ জয় করার চেয়েও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়লো।

সিজার নিহত হওয়ায় সাম্রাজ্যের হাল ধরার জন্য ক্লিওপেট্রারও একজন যোগ্য শাসকের দরকার ছিল। অবশেষে তারা বিয়ে করেন কিন্তু তাদের পরিণতি মোটেই সুখকর ছিল না। এক যুদ্ধ ক্ষেত্রে এন্টোনি কে মিথ্যে খবর দেওয়া হয় যে শত্রুপক্ষের হাতে ক্লিওপেট্রা খুন হয়েছেন। তাকে ছাড়া বেঁচে থাকার কথা চিন্তা করতে না পেরে অ্যান্টোনি আত্মহত্যা করেন। এই খবর পেয়ে ক্লিওপেট্রা ও আত্মহত্যা করেন নিজের কপালে মিশরীয় গোখরো সাপের ছোবল নিয়ে।

নেপোলিয়ন অ্যান্ড জোসেফাইন
১৭৬৩ সালে মারি জোসেফ রোজ টাস্চার দে লা পেজিয়ের জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রোজ বা ম্যারি নামে পরিচিত ছিলেন এবং নেপোলিয়ন ছিলেন যিনি তাকে জোসেফাইন নাম দিয়েছিলেন। ১৬ বছর বয়সে তার ভিক্টে দে বিউহারানিসের সাথে বিয়ে হয় এবং তিনি ফ্রান্সে স্থানান্তরিত হন। ১৭৯৪ সালে বিউহারানিসকে সন্ত্রাস করার দায়ে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। তার বিধবা হিসেবে রোজ কারাগারে কয়েক মাস কাটান, কিন্তু তিনি ফ্রান্সের বাহিনীতে নিযুক্ত থাকায় এবং অত্যন্ত সুন্দরী হওয়ায় প্রধান উপদেষ্টা ব্যরাসের নজরে পড়েন, ব্যারাস তাকে তার রক্ষিতা হিসেবে রেখে দেন।

ব্যারাসের মাধ্যমেই তার পরিচয় হয় লাজুক, সুদর্শন যুবক কর্সিয়ান আর্মি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এর সাথে। যে তার ছয় বছরের ছোট ছিল। তারা প্যারিসে একটি সাধারণ চার্চে লুকিয়ে বিয়ে করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করার জন্য নিয়োজিত কর্মকর্তা এ বিয়ে করাতে ব্যর্থ হন কেননা বয়স ছাড়াও তখনকার নিয়মে এ বিয়ে বেশ কিছু ক্ষেত্রে অবৈধ ছিল। জোসেপাইন তার বয়স চার বছর কমিয়ে ৩৩ থেকে ২৯ করেন এবং নেপোলিয়ন তার মিথ্যা জন্মতারিখ বসিয়ে এই বিয়ে সম্পাদন করেন। নেপোলিয়ন রোমান সম্রাট হওয়ার পর ১৮০৪ সালে প্রকাশ্যে রোমান ক্যাথলিক নিয়মানুসারে বিয়ে করেন।

দিন অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে নেপোলিয়ন বুঝতে পারেন যে জোসেফাইন সন্তান ধারণে অক্ষম কিন্তু নেপোলিয়ন খুব চাইতেন জোসেপাইনের গর্ভে যেন তাঁর সন্তান হয়। ১৮০৯ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে প্যারিসে নেপোলিয়ন শেষপর্যন্ত জোসেফিনকে জানান যে, তিনি তাকে তালাক দিতে যাচ্ছেন। ১৪ ডিসেম্বর তিউলিরের সিংহাসন রুমে তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক বিবাহ বিচ্ছেদের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। নেপোলিয়ন এ বিচ্ছেদ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, তিনি ফ্রান্সের সর্বোত্তম স্বার্থর জন্য ও এদেশের ভবিষ্যতের জন্যই শুধুমাত্র তার স্ত্রীকে ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, কিন্তু তার জোসেফাইন তাকে যে ভালবাসা, বিশ্বাস ও ভক্তি দিয়েছেন তার জন্য তিনি সবসময় কৃতজ্ঞ থাকবেন।

এরপর তার হাত ধরে, জোসেফিন একটি প্রস্তুতকৃত বিবৃতি পড়তে শুরু করেন, যেখানে তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে, তার স্বামীকে তালাক দেয়ার অনুমতি দিতে পেরে এবং এর মাধ্যমে তার ভক্তির সম্ভাব্য প্রমাণ দিতে পেরে সে গর্বিত কিন্তু শেষ করার আগেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং একটি পরিচারক তার জন্য বক্তৃতা সমাপ্ত করেন। তিনি এবং নেপোলিয়ন উভয়ই বিচ্ছেদনামায় স্বাক্ষর করেন এবং নেপোলিয়ন তার কপালে চুম্বন দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিবাহের বিচ্ছেদ ঘটান। তাঁরা দুজনেই তাঁদের সম্পর্কের বিষয়ে শ্রদ্ধাবোধ, এবং ত্যাগ বজায় রেখেছিলেন।

নেপোলিয়ন জোসেফিনের সার্বিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করেন এবং তার জন্য প্রচুর অর্থ বরাদ্দ করেন এবং তাকে এমপ্রেস ডোগারের মতো যথাযথ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল। চিরজীবন তারা তাদের প্রতি ভালোবাসা ধরে রেখেছিলেন।

অরফিয়াস অ্যান্ড ইরিডাইস
এটি একটি গ্রীক মিথ। সাহিত্যে তাঁদের কাহিনীকে স্বীকৃত দেয়া হয়, “tale of desperate love” বলে। গ্রীক পুরাণ মতে, ইরিডাইস নামে স্বর্গের এক বিবাহিত পরীর প্রেমে পড়েন হারপুন নামক এক বাদ্যবাজক অরফিয়াস এর সাথে। কিন্তু দেবতা এরিসটেইয়াসের সাথে এক দুর্ঘটনায় অরফিয়াস, ইরিডাইসকে হারিয়ে ফেলে। তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় পাতালপুরীতে। কিন্তু অরফিয়াস তাঁর হারপুন বাজিয়ে জাদুকরী এক বাদ্য মূর্ছনা দিয়ে দেব- দেবীর মন জয় করে ফেলে। তিনি তাঁর রাজ্য ফেলে ক্রমাগত হারপুন বাজিয়ে তাঁর ভালোবাসা ইরিডাইসের জন্য নানা জায়গায় অপেক্ষা করতে থাকেন।

অবশেষে সঙ্গীত দেবতা হেডস ও পারসিফোন তা সুরে মুগ্ধ হয়ে ক্ষমা করে দেন। অরফিয়াস পাতালপুরীতে যায় ইরিডাইসকে উদ্ধার করতে। কিন্তু শর্ত থাকে যে, অরফিয়াস পৃথিবীতে অবতরণের আগে ইরিডাইসকে পিছন ফিরে দেখতে পারবেন না। কিন্তু অরফিয়াস অতি আবেগে আর উৎকণ্ঠায় দেবতাদের শর্তের কথা ভুলে যায় এবং ইরিডাইসকে দেখতে থাকে। ফলাফল, চিরতরের জন্য ইরিডাইসকে হারিয়ে ফেলে। বলা হয়ে থাকে, এই যে প্রেম কিংবা বিরহে সঙ্গীত অনেক বড় ভুমিকা রাখে, সেটা নাকি অরফিয়াস আর ইরিডাইসের প্রেমকাহিনী থেকেই অনুপ্রাণিত হওয়া।

রামোস ও থিইবী
ব্যবিলনের সবচেয়ে সুন্দরী কুমারী থিইবীর বাল্যকালের বন্ধু ছিল সুপুরুষ রামোস। তাঁরা ছোটবেলা থেকেই এক সাথে খেলাধুলা করতো। একই সাথে বেড়ে উঠার সময় একে অপরের প্রেমে পড়ে। কিন্তু তাঁদের পরিবার এই সম্পর্ক মেনে নেয় না। তাই তাঁরা ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। সূর্যাস্তের সময় নদীর পার্শ্ববর্তী একটা ম্যালবেরী গাছের কাছে দুজনের দেখা করার কথা থাকে। থিইবী কারো কাছে ধরা না পড়ে যাওয়ার জন্য মুখে একটা কাপড় পরে (veil) রেমোসের জন্য গাছের নিচে অপেক্ষা করতে থাকে। হঠাৎ এক ক্ষুধার্ত সিংহ আসে থিইবীর কাছে। ভয় পেয়ে দৌড়ে অন্য জায়গায় আশ্রয় নেয়ার সময় তাঁর মুখের কাপড়টি খুলে পড়ে যায়। পরে রামোস এসে দেখে যে, সিংহের মুখে সেই কাপড়। সে ভাবে যে, সিংহ তাঁর থিইবীকে ভক্ষণ করেছে। সেও তাঁর ছুরি দিয়ে নিজের বুক কেটে ফেলে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর থিইবী এসে মৃত রামোসকে দেখতে পায়। তারপর সেও সেই একই ছুরি দিয়ে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেয়।

সেলিম ও আনারকলি
আনারকলি ছিল এক ইতালীয় সওদাগরের সুন্দরী কন্যা। যে তার পিতার সঙ্গে আফ্রিকার উত্তর উপকূল থেকে সওদাগর জাহাজে করে যাত্রা করে, তখন তার বয়স মাত্র ১৫। জলদস্যুরা তার বাবাকে হত্যা করে তাকে অপহরণ করে এবং ইস্তাম্বুল ক্রীতদাস বাজারে এক পতিতালয় মালিকের কাছে বিক্রি করে। সম্রাট আকবরের মনোরঞ্জনের জন্য তুরস্কের সুলতান ইতালীয় এই নাচনেওয়ালীকে পাঠিয়েছিলেন। যে শুধু নাচ নয়, কাব্য, সাহিত্য ও সংগীতেও ছিলেন পারদর্শী। তিনি যখন নাচ শুরু করতেন তখন কোন বাদ্য যন্ত্র থাকত না, কেবল তার হাতের চুড়িগুলোর সংঘর্ষে সৃষ্ট মূর্ছনা আর নূপুরের কিন্নরই তার সঙ্গী হত। আর তাতেই মোহ আবিষ্ট হয়ে যেতেন মুঘল সম্রাট। আনারকলির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল তার চোখ। গাঢ় নীল ও বেগুনির মধ্যবর্তী রংয়ের এ চোখের চাহনিতে সম্রাতপুত্র সেলিম আটকে যায়। যেকোন মূল্যে আনারকলিকে পাওয়াই তার লক্ষ্য হয়ে উঠে। তার পেতেই হবে, এছাড়া কোনো উপায় নেই। সেলিম একথা পর্যন্ত ভুলে যায় যে আনারকলি তার বাবার রক্ষিতা।

আনারকলিও তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। তারা চুপিসারে দেখা সাক্ষাৎ করতেন। তবে তাদের মধ্যকার দেখা সাক্ষৎ গোপন রাখা হতো। তাদের এ নিষিদ্ধ সম্পর্কের সময় আনারকলির বয়স ছিল চল্লিশের কোঠায় কিংবা তার চেয়ে বেশি আর শাহজাদা সেলিমের বয়স ছিল ত্রিশের কোঠায়। তিনি ছিলেন তখন অন্তত তিনটি পুত্র সন্তানের পিতা। তাদের এই প্রেম আর বেশিদিন গোপন থাকেনা। আকবরের আদেশে বন্দি করে আনারকলিকে হেরেম খানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সেলিমের উপস্থিতিতে আনারকলিকে জ্যান্ত কবর দেবার শাস্তি দেয়া হয় যেন আনারকলি তিলে তিলে মারা যায়। পরে জানা যায়, সেলিমের অনুরোধে তার দাদি হামিদা সম্রাট আকবরের মা আনারকলিকে গোপনে বিষ সরবরাহ করে যেন কষ্ট পেয়ে মারা না যেয়ে, একবারে মারা যায়।

পৃথিবীব্যাপী আরও অনেক প্রেম কাহিনী রয়েছে যেগুলো এই কাহিনীগুলোর থেকেও হয়তো বেশি রোমাঞ্চকর কিন্তু সময় ও বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে এগুলো আলোচিত হয়েছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here