কেন পিটার দ্য গ্রেট নিজ ছেলেকে হত্যা করেছিল?

নিউজ ডেস্ক :ইতিহাসের পাতায় শাসকদের নির্মম আচরণের কথা আমাদের অনেকেরই জানা। অনেক শাসকই নিজ পরিবারের সদস্যকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে। যেমন ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরী তার দুই স্ত্রীর শিরশ্ছেদ এর আদেশ দিয়েছিল। মিসরের ক্লিওপেট্রার নাম তো আমাদের জানা। ক্লিওপেট্রাও তার স্বামীকে হত্যার আদেশ দিয়েছিল। আবার ইনকা সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট তার সৎ ভাইকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সব থেকে আলোচিত হয়ে আছে রাশিয়ার জার পিটার দ্য গ্রেট এর নিজ পুত্রকে হত্যার ঘটনাটি।

রাশিয়ার সম্রাট প্রথম পিটার কে বলা হয় পিটার দ্য গ্রেট। আধুনিক রাশিয়ার জনক এই পিটার দ্য গ্রেট। ১৬৮২ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পিটার দ্য গ্রেট রাশিয়ার জার ছিলেন। ১৭২৫ সালে তিনি মারা যান। তার সময় তিনি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন রাশিয়াতে। রাশিয়ার ক্যালেন্ডারের সংস্কার করেন তিনি। অর্থোডক্স চার্চের স্বায়ত্বশাসন হ্রাস করেন তিনি। পুরুষের দাড়ির উপর কর আরোপ করে পিটার দ্য গ্রেট। রক্ষণশীলতা ভেঙ্গে আধুনিক রাশিয়া তৈরী করেন তিনি। রাশিয়াকে পশ্চিম ইউরোপের সব থেকে উন্নত ও শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার কৃতিত্ব তার।

পিটার রাশিয়ার সামরিক বাহিনীকে উন্নত ও আধুনিক করেন। রাশিয়ায় সর্বপ্রথম আধুনিক নৌবাহিনী গড়ে তোলেন তিনি। সেনাবাহিনীকে উন্নত করে ধারাবাহিকভাবে বিজয় ছিনিয়ে আনে বিভিন্ন রাজ্য দখল করে। সুইডেন দখল করার পর তিনি রাজধানী মস্কো থেকে সরিয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গে আনেন। শিকাগোর ইলিনয়েস বিশ্ববিদ্যালয়র রাশিয়ান ইতিহাসের অধ্যাপক জোনাথন ড্যালি বলেন, ‘পিটার গতানুগতিক মস্কো ভিত্তিক রাজনীতি সরিয়ে এনে ঐতিহ্য পরিবর্তন করেছে।‘

পিটার ১৭ বছর বয়সে বিয়ে করেন ইউডোক্সিয়া নামের এক তরুণীকে। ইউডোক্সিয়ার গর্ভে জন্ম নেয় আলেক্সিস। ইউডোক্সিয়া ধার্মিক ও রক্ষণশীল মহিলা ছিলেন। ১৬৯৮ সালে আলেক্সিসের বয়স যখন মাত্র ৮ বছর পিটার ইউডোক্সিয়াকে ছেড়ে চলে যায়। এরপর মা ছাড়া ছেলে বড় হয় খালা নাটালিয়ার কাছে। নাটালিয়ার কাছে আলেক্সিস পায় শিক্ষার আলো। শিখে বিভিন্ন বিদেশী ভাষা ও গণিত শাস্ত্র। উচ্চ শিক্ষার জন্য যায় বর্তমান জার্মানীতে। মা ছাড়া বড় হলেও মায়ের অনেক বৈশিষ্ট্য পায় ছেলে।

ইউরোপের অন্যান্য রাজার সন্তানের মত আলেক্সিসকেও বড় হতে হয় বাবার থেকে দূরে দূরে থেকে। মাঝে মাঝে দেখা হত বাবার সাথে। আলেক্সিস বড় হতে থাকে মস্কোতে আর পিটার তখন ব্যস্ত অটোমান সাম্রাজ্য ও সুইডেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। তখন থেকেই আসলে দূরত্ব শুরু হয় ছেলে ও বাবার মধ্যকার। কিশোর বয়সে আলেক্সিসকে বসানো হয় পিটারের সেনাবাহিনীর একটি পদে। সেখানে আলেক্সিসের কাজ হয় সৈন্য সংগ্রহ করা ও তাদের কোথায় পাঠানো হবে তা দেখা। কিন্তু সেখানে সে ছিল নামে মাত্র। পিটার আলেক্সিসের উপর ভরসা করতে পারত না কখনো। তার মতে আলেক্সিস ছিল অলস ও অযোগ্য।

পিটার ছেলেকে লেখা এক চিঠিতে লিখে ছিল, ’অযোগ্য উত্তরাধীকারকে সিংহাসনে বসানোর থেকে অচেনা যোগ্য কাউকে বসানো ভালো।‘’ এতে করেই বোঝা যাচ্ছিল পিতা পুত্রের সম্পর্ক ভালো ছিল না। চিঠি পেয়ে আলেক্সিস ও হতাশ হয়ে যায় এবং বাবার প্রতি ঘৃণা জন্মায়। পিটার ছিলেন আধুনিক মানুষ আর ছেলে আলেক্সিস হয়েছিল মায়ের মত ধার্মিক ও রক্ষণশীল। প্রথাগত নিয়মকানুন থেকে বের হতে পারেনি মায়ের মত। এটাও ছেলের প্রতি পিটারের অনাস্থা প্রকাশের আরেকটি কারণ। পিটার মনে করতে শুরু করে তার শত্রুপক্ষ তার আর আলেক্সিসের দূরত্বের সুযোগ নিতে পারে। ছেলেকে রাজ্য দখলের জন্য উস্কিয়ে দিয়ে পিটারকে সিংহাসনচ্যুত করতে পারে।

আলেক্সিসের ক্ষমতার প্রতি লোভও ছিলনা তেমন। পিটার ছেলেকে বলেছিল হয় যোগ্য শাসক হওয়ার চেষ্টা করো নয়তো সন্ন্যাসী হয়ে যাও। আলেক্সিস সন্ন্যাসী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তখন রাশিয়ায় পিটারের সংস্কারবাদের বিরোধী যারা ছিল তাদের সাথে তার মিত্রতা হয়। পিটার ক্ষেপে যায় এতে। তাকে রাষ্ট্রদোহী বলা হয়। আলেক্সিস এই অবস্থায় ছদ্মবেশে দেশ ত্যাগ করে আশ্রয় নেয় ভিয়েনাতে। সেখানে তাকে আশ্রয় দেয় অস্ট্রিয়ার সম্রাট পঞ্চম চার্লস। অস্ট্রিয়া সেই সময় অন্যতম এক প্রধান শক্তি ছিল। পঞ্চম চার্লস বুঝে যায় পিটার ও আলেক্সিসের সম্পর্ক ভালো নয়। পিটারের শত্রুপক্ষও জেনে যায় পিটারের দূর্বলতা।

১৭১৭ সালে পিটাররের এক গুপ্তচর খোঁজ পেয়ে যায় আলেক্সিসের।পিটার আলেক্সিকে চিঠি পাঠায় একটি। সেখানে পিটার তার অবাধ্য হওয়ার জন্য নিন্দা প্রকাশ করে এবং কথা দেয় দেশে ফিরে আসলে তিনি কোন শাস্তি দিবেন না।

দেশ ত্যাগের আগে আলেক্সিরের কাছের মানুষ তাকে বলে ছিল কোন সময় পিটার যদি তাকে পটানোর চেষ্টা করে দেশে ফেরত আনতে চায় তাও যেন সে রাশিয়ার ফেরত না আসে। আলেক্সিস তার উপদেশ মানেনি। ফিরে যায় রাশিয়ায় এবং হাটু গেড়ে ক্ষমা চায় পিটারের কাছে। পিটার তাকে আটক করে জেলে প্রেরণ করে। জেলে আলেক্সিসের সহযোগীদের নাম জানার জন্য তাকে নির্যাতন করা হয়। আলেক্সিসের অনেক সহযোগীকে আটক করা হয় এবং অনেককে হত্যা করা হয়। এমন কি পিটার তার প্রথম স্ত্রী ইউডোক্সিয়াকে বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নেয়। আলেক্সিস এর রাষ্ট্রদ্রোহী অপরাধের জন্য বিচারকার্য শুরু হয় ১৭১৮ সালের জুন মাসের ১৯ তারিখ। অনেকের মতে বিচারের শাস্তি হিসাবে ২৫ বার চাবুক আঘাত করা হয় আলেক্সিসকে এবং জুন মাসেরই ২৬ তারিখ আহত অবস্থায় জেলেই আলেক্সিস মৃত্যুবরণ করে।

পিটার দ্য গ্রেট এর নাম একজন সফল ও দক্ষ শাসক হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকলেও ছেলেকে হত্যা করার ঘটনাটি ইতিহাসের পাতায় কালো কলমে লেখা আছে।

তথ্যসুত্রঃ হিস্টোরি ডট কম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here