লিটনের গুরুত্ব ভোটারদের ভাবনায়

রাজশাহী প্রতিনিধিঃ রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচনে এবার মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও বিএনপির প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল এসেছেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নির্বাচনে শক্ত প্রার্থী বলতে এবার লিটন আর বুলবুলই রয়েছেন। সঙ্গত কারণে আলোচনায় এসেছেন তারা। তাদের নিয়েই ভাবছেন নগরবাসী। এ ক্ষেত্রে অতীত উন্নয়নের জন্য লিটনের পক্ষে যতটা বেশী আওয়াজ উঠেছে ঠিক ততটায় বিরুদ্ধাচরণ হচ্ছে বুলবুলের ক্ষেত্রে। যদিও আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে গুরুত্বের সঙ্গেই নিচ্ছে বড় দুই দল।

আওয়ামী লীগ বলছে, এবারের সিটি নির্বাচন আগামী সংসদ নির্বাচনের জন্য ওয়ার্মআপ। আর বিএনপি বলছে, এবার তারা প্রতিবাদের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তবে নগরবাসীর ভাবনায় রয়েছেন জনপ্রিয় নেতা। এ অবস্থায় জনভাবনায় এবার উঠে এসেছে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের নাম।

এবারের নির্বাচন কার্যক্রম শুরুর আগে থেকেই মাঠ সাজিয়ে রাখায় লিটনের পক্ষে দলীয় নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হলেও বুলবুলের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। একদিকে শরীক জামায়াতের টানাপোড়েন অন্যদিকে বিএনপির তৃণমুলে বুলবুলের আচরনে অসন্তোস। এই পরিস্থিতিতে ভোটের মাঠে নামতেও বেগ পেতে হচ্ছে তাকে। কোন্দল নিরসনেই সময় পার হচ্ছে বুলবুলের। যদিও এরই মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় বুলবুলের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়ক হিসেবে রাজশাহীতে অবস্থান করছেন। বুধবার রাজশাহীতে এসেই দলের সংকট নিরসনে জেলা ও মহানগরের নেতাকর্মীদের নিয়ে এ অঞ্চলে বিএনপির ‘থিঙ্কট্যাঙ্ক’ হিসেবে পরিচিত প্রবীন নেতা কবীর হোসেনের সঙ্গে রুদ্ধদার বৈঠক করেছেন। যদিও স্থানীয় নেতারা বলছেন কবীর হোসেন অসুস্থ তাই তাকে দেখতে গেছিলেন গয়েশ^র। তবে একই দলের নেতারা বলছেন, মুলত: সিটি নির্বাচন নিয়ে বুলবুলের প্রতি বিএনপির যে সংকট তা নিরসনের চেষ্টা করা হয়েছে ওই বৈঠকে। আগামী নির্বাচন পর্যন্ত গয়েশ^র রাজশাহীতেই অবস্থান করবেন বলেও জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনের আগ মুহুর্তেও দলীয় কোন্দলে বিপর্যস্ত এখন রাজশাহী বিএনপি। বিভক্ত বিএনপি নেতাদের কারণে রাজশাহীতে কোনো কর্মসূচি পালন হচ্ছে না। এবার মহানগর বিএনপির সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে দলীয় মেয়রপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন তারেক রহমান। তারেক রহমান টাকার বিনিময়ে বুলবুলের মতো বিতর্কিত নেতাকে মেয়রপ্রার্থী করায় তৃণমূল কর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তৃণমুল বিএনপির একটি অংশ এবার বুলবুলকে ভোট দিবে না বলেও সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত জেলাগুলোর মধ্যে রাজশাহী অন্যতম। এখানে বিএনপিতে বর্তমানে আটটি গ্রুপ রয়েছে। দিনে দিনে এই দ্বন্দ্ব প্রকট রুপ ধারণ করেছে। মেয়রপ্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের খারাপ ব্যবহার আর নেতাকর্মীদের বিপদে পাশে না থাকার ঘটনাগুলোর জন্য তৃণমূল নেতাকর্মীরা তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে রয়েছেন। সেই ক্ষোভের আগুনেই দগ্ধ এখন বুলবুল।

সূত্রমতে, তৃণমূল কর্মীরা মনে করেন বিএনপিকে বিভক্ত করার জন্য বুলবুলের একগুয়েমী দায়ী। বুলবুলের উচ্ছৃঙ্খলতা, দলীয় কর্মীদের অবমূল্যায়ন ও নিজেদের মধ্যে অবৈধ উপার্জনের ভাগাভাগি নিয়ে বিএনপির এক গ্রুপ অপর গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিল না। বুলবুলের উচ্ছৃঙ্খল আচরণের জন্য নেতাকর্মীরা আট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু এবং রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হকের সঙ্গে বুলবুলের ত্রিমুখী দ্বন্দ্বে খেসারত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দেওয়া লাগতে পারে বলে ধারণা করছেন বিএনপির একাধিক নেতা।

জানা যায়, রাজশাহীতে দলীয় চাপের মুখে বিএনপির কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকলেও দলীয় অন্ত:কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। অভিযোগ আছে, ২০১৪ সালে অসংখ্য মামলা দিয়ে পুলিশ তৃণমূল কর্মীদের হয়রানি করে। ঘর বাড়ি ছাড়া এসব নেতাকর্মীদের বিপদে কখনোই পাশে দাঁড়াননি বুলবুল।

এদিকে বুলবুলকে নিয়ে বিএনপিতে যখন এলোমেলো অবস্থা তখন আওয়ামী লীগের প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামার লিটন রয়েছে সাজানো মাঠে। তাকে নিয়ে নিজ দল ছাড়াও ১৪ দলের নেতাকর্মীরা রয়েছেন উজ্জীবিত। তারা চেয়ে আছেন ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু অপেক্ষায়। আগামী ১০ জুলাই থেকে প্রকাশ্যে মাঠে নামবেন তারা।

অপরদিকে ভোটরদের ভাবনায় এবার রয়েছেন লিটনের নাম। সাধারণ ভোটাররা বলছেন, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী হিসেবে খায়রুজ্জামান লিটনকে নগর পিতা নির্বাচিত করতে চান তারা। যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিয়েই তারা তাদের নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে চান। ভোটারদের এমন কথা ঠিক থাকলে এগিয়ে থাকবেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনই। কেননা, ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি মেয়র থাকাকালে নগরীতে যে দৃশ্যমান উন্নয়ন করেন, সেটুকুও ধরে রাখতে পারেননি বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের মেয়াদের শেষ দিকে ১৭৩ কোটি টাকার প্রকল্প পায় সিটি করপোরেশন। তবে এটি স্থানীয় সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশার বরাদ্দ। তিনি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেন সিটি করপোরেশনকে। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য তেমন কাজ করতে পারেনি নগর সংস্থা।

২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনে মেয়র হয়েছিলেন বুলবুল। ওই নির্বাচনের আগে চার বছর আট মাস মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের ছেলে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। এ সময়ের মধ্যে তিনি নগরীতে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ করেন। সমালোচকরাও এজন্য তার প্রশংসা করেন। এত উন্নয়নের পরও ওই বছর তার এ পরাজয়ের পেছনে আওয়ামী লীগ কর্মীদের একটি অংশের নিস্কৃয়তা, হেফাজতে ইসলামের অপপ্রচার, জামায়াতের টাকায় বিএনপি প্রার্থীর ভোট কেনা এবং নারী ভোটারদের ওপর আস্থা অর্জন না করাকে দায়ী করেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

তাই এবার আগামী ৩০ জুলাইয়ের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়ী হতে এবার অনেক আগে থেকেই প্রতিটি ওয়ার্ড, পাড়া-মহল্লা চষে বেড়িয়েছেন লিটন। মহানগর বিএনপির সভাপতি বুলবুলও নানা কৌশলে এখন নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছেন। সাবেক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন বলছেন, আবার নির্বাচিত হলে তিনি উন্নয়নের ধারা ফিরিয়ে আনবেন।

নগরীর তেরোখাদিয়া মহল্লার বাসিন্দা আলফাজ কবির বলছেন, আগের দুই মেয়াদে দু’দলের দুই প্রার্থীই মেয়র ছিলেন। রাজশাহীর জন্য কে কী করেছেন, সেটি বিবেচনা করেই তিনি ভোট দেবেন। এক্ষেত্রে দল কিংবা প্রতীক তার কাছে বড় বিষয় নয়। একই কথা বলেছেন কাদিরগঞ্জের বাসিন্দা সুমন শেখ। তার বক্তব্য, যিনি মেয়র হয়ে মশাও মারতে পারবেন না, তাকে ভোট দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সবার আগে বড় কথা নাগরিক সেবা। আর কে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবেন তা তিনি ভালো করেই জানেন।

মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও দলটির মনোনীত মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, আমি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর যে উন্নয়ন কাজগুলো করে রেখেছিলাম। সেগুলো বর্তমানে ধ্বংসের পথে। রাজশাহীতে একটি শিল্পনগরীর গড়ে তোলার আশা আমার দীর্ঘ দিনের। রাজশাহীকে ঘিরে আরও অনেক পরিকল্পনা আমার আছে। নগরীর মানুষ সেগুলো জানেন। তাই এবার নির্বাচনে তারা আমাকে ভোট দিয়ে সেই সুযোগ করে দেবে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই প্রার্থী ছাড়াও এবার রাজশাহী সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে লড়ছেন আরও চার প্রার্থী। তারা হলেন- জাতীয় পার্টির ওয়াসিউর রহমান দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির হাবিবুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শফিকুল ইসলাম ও বামপন্থি সংগঠন গণসংহতি আন্দোলন সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী মুরাদ মোর্শেদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here