বাজেটে নতুন সম্ভাবনা কম

সালেহউদ্দিন আহমেদ: প্রথমে বলে রাখি, বাজেট এরইমধ্যে পাস হয়ে গেছে এবং অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে বাজেট প্রস্তাব করার পর। কিন্তু যে কথাটি এখন বলার, তা হচ্ছেÑপ্রস্তাবিত বাজেট থেকে পাস হওয়া বাজেট খুব বেশি আলাদা কিছু নয়। দুটি বাজেট মোটামুটি একই রকম আছে বলা যায়, তবে কিছু বিষয়ে অল্প কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে।
ই-বিজনেসের ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখানে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ধরা হয়েছে, যেটি আগে ছিল ৫ শতাংশ। আমি মনে করি, এটি একটি ইতিবাচক দিক। এখন তো ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ ভালো একটি সুবিধা পাচ্ছে। কাজেই এটি কাজের দিক বলে মনে হয়। এটি সরকার বিবেচনায় নিয়েছে নানা রকম কর্মকা- দেখে। আর লোকাল যে মোবাইল ফোন সংযোজন হবে, সেটি প্রস্তাবিত বাজেটে ১৫ শতাংশ করেছিল, সেটি আবার কমিয়ে ৫ শতাংশে নিয়ে এসেছে। এটিও একটি ভালো দিক। মানুষের সুবিধার কথা বিবেচনা করে এটি করা হয়েছে। তার মানে তথ্য-প্রযুক্তির ওপর বেশ খানিকটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং প্রণোদনা বেশি দেওয়া হয়েছে।
দেশীয় শিল্পের বিকাশে কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়া হয়েছে এবং কিছুকিছু ছাড় দেওয়া হয়েছে। এটিও অত্যন্ত ভালো একটি দিক। আশা করি, এ ধরনের গুরুত্ব ও প্রণোদনা বাজেটে নিয়মিত থাকবে। এ বাজেটেই যেন ব্যাপারটি শেষ হয়ে না যায়, আগামি বাজেটেও চালু থাকে। পরবর্তী বাজেট যে সরকারই পাস করুক না কেন, এটি চালু রাখতে হবেÑআমরা সেটিই বিশেষভাবে প্রত্যাশা করি।
বার্ষিক পরিকল্পনার বিষয়টি আগের মতোই আছে, টাকা-পয়সার ব্যাপারে সেখানে তেমন কোনো পরিবর্তন নেই বা প্রজেক্টগুলো পরিবর্তন করা হয়নি, যেটি আমরা বারবার বলেছিলাম। তবে একটি বিষয়ে পরিবর্তন এসেছেÑপ্রকল্প পরিচালকের প্রথম দুই কিস্তির অর্থ তারা নিজেরাই চালু করতে পারবে। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পগুলোর দায়িত্ব যাকে দেওয়া হয়েছে, তিনি তাঁর নিজের বিবেচনায় অর্থ ছাড়তে পারবেন। আগে এর জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হতো এবং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়েরও অনুমোদন লাগত। প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির ওপর এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে, সামনে কী হবে। এটা একটা দিক। তবে এখানে একটি বিষয়Ñপ্রকল্প পরিচালকের কাজের দক্ষতা, সততা ও কাজের অগ্রগতির ওপর এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। পরের ধাপগুলো পরিচালনা করার জন্য মনোনয়ন লাগবে আর চতুর্থ স্টেপে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে। বার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রচেষ্টা খারাপ নয়Ñএটি ইতিবাচক।
সার্বিকভাবে যে বাজেটটি দেওয়া হলো, আমরা আগেই আলোচনা করছিলাম যে এটি বিশাল বাজেট না হলেও বিরাট বাজেট। বিরাট বাজেটে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে সমস্যা ও আশঙ্কা ছিল প্রস্তাবিত বাজেটের পরে, বাজেট পাস হওয়ার সময় সেই বিষয়গুলোতে খুব কম নজর দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত পর্যায়ে বাজেট পাস করার সময় কৌশলগত কোনো বিষয় আর আসবে না। কারণ প্রস্তাবিত বাজেটেই কৌশলগত দিকে যথেষ্ট ঘাটতি ছিল। তারপর কোন কোন খাতে গুরুত্ব দেবে, ভবিষ্যতের জন্য যে পথযাত্রাÑসেগুলো কিন্তু বাজেটে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ নেই। তার মানে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে পরামর্শগুলো দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো বিবেচনা করা হয়নি। অতএব এটি বলা যেতে পারে যে প্রস্তাবিত বাজেটে যেটি দেওয়া হয়েছিল, সরকার মনে করেছে, সেসব বাস্তবায়ন করতে পারবে। তাদের সে ক্যাপাসিটি আছে বলে তারা ভেবে নিয়েছে।
বাজেট পাস হওয়ার পর আমরা যদি এর পরিপ্রেক্ষিত দেখি, এর আগে কিন্তু অনেকে বাজেট নিয়ে বাস্তবভিত্তিক সাজেশন দিয়েছিল। বাজেটে এত বড় রেভিনিউ টার্গেট কেন করা হচ্ছে? এত বড় টার্গেট করলে রাজস্ব ঘাটতি দেখা দেবে। অথচ বাজেট বাস্তবায়নের যে সক্ষমতা, সেটি নিয়ে কথা নেই। যেমন বাজেটে বলা হয়েছে, এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। আদতে তা হয়নি। কারণ এনবিআরের লোকবল বাড়ানো হয়েছে; কিন্তু তাদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য যে কর্মপরিকল্পনাÑসেসবে আমার মনে হয় যথেষ্ট ঘাটতি আছে। কাজের সব কিছু আপডেট করা হয়েছে কি না, ভ্যাট আদায়ের পদ্ধতি ও প্রসেসের কাগজপত্র কম্পিউটারাইজড করা, কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো, প্রত্যেক ব্যবসায়ীর দোকানে বিলের কাগজগুলো অটোমেটিক ক্যাশ রেজিস্টার হয়েছে কি না তা পরিষ্কার নয়। এটি কিন্তু একটি বড় ব্যাপার।
তৃতীয় যে বিষয়টি দেখলাম, সেটি আমার মনঃপূত হয়নিÑট্যাক্স আদায়ের জন্য টার্গেট বা ট্যাক্স সিলিংটা নির্ধারণ করা। বাজেটে বলা হয়েছে, মিনিমাম আড়াই লাখ টাকা আয় হলে ট্যাক্স ধরা হবে। আমরা এটি তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা করার কথা বলেছিলাম। এই বাড়ানোটা যুক্তিসংগত ছিল। সরকার বা এনবিআর থেকে বলা হচ্ছে, বছরে আড়াই লাখ, যা মাসে ২০ হাজার টাকা হয়Ñএটি হলে ভ্যাট দিতে হবে। তারা বলছে, পরিমাণটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এভাবেই আছে। এটি একটি ত্রুটিপূর্ণ যুক্তি।
এখন মানুষের মোটামুটি আয় বেড়েছে এবং ব্যয়ও বেড়েছে। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, জীবনযাত্রার মান ও ব্যয় বেড়েছে। মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন নতুন জিনিস সংযোজিত হচ্ছে। এতে নিম্নবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের অসুবিধাও হয়েছে। সে ক্ষেত্রে আড়াই লাখ টাকার বেশি করলে আমাদের আপত্তি ছিল না। একটি আর্গুমেন্ট হলো বাইরের দেশের তুলনা নিয়ে। বাইরের দেশের একজন মানুষের, সে সরকারি চাকরি করুক বা না করুক, প্রত্যেকেরই সামাজিক ইনস্যুরেন্স আছে, স্বাস্থ্যের জন্য তাদের ব্যয় করতে হয় অপেক্ষাকৃত কম, ট্রান্সপোর্ট এবং অন্যান্য অনেক সুবিধা আছে। কল্যাণমূলক ফান্ড আছে। আমাদের দেশে তো এসব নেই। আমরা যেটি আয় করি, সেখান থেকেই স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করতে হয়। এখানে সরকারি হাসপাতালে তো চিকিৎসার সুযোগ খুবই কম। ফলে প্রাইভেট সেক্টরে যেতে হয়। সেখানে আবার এই ব্যয় অনেক বেশি। ১০০ টাকা আয় করলে চিকিৎসার জন্য ব্যয় করতে হয় ৬০ টাকার বেশি। আমাদের শিক্ষার ব্যয় আছে। হঠাৎ কোনো বিপদ হলে সেটির ব্যয় আছে। সামাজিক নিরাপত্তার জন্য আমাকে সঞ্চয় করতে হয়। কাজেই সেই পরিপ্রেক্ষিতে আড়াই লাখ টাকা তো কিছুই না। কিন্তু তারা বলছে, আড়াই লাখ টাকা আয় হলে ট্যাক্স দিতে হবে। এর বেশি হলে সেটি অতিরিক্ত হয়ে যায়। মোটেই না। গত বছর যে টাকা ছিল, এবার সাড়ে তিন লাখ করলেও সরকারের আয় কম হবে, এমন নয়। তারা হয়তো ভেবেছে, এর বাইরে হলে রাজস্ব কম হয়ে যায়। এই বিবেচনা একেবারেই ঠিক হচ্ছে না।
আবার অনেক ব্যবসায়ী আছেন, যাঁরা ভ্যাটের আওতার বাইরে। তাঁদের জন্য এনবিআরের কোনো তৎপরতা নেই। যাঁরা শহরে বা ছোট শহরে, লোকাল এলাকায় ব্যবসা করেন এবং হিসাব করলে দেখা যাবে, তাঁদের আয়ও অনেক ভালো। তাঁদের করের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু সরকারের মনোযোগ এখনো সেদিকে যায়নি বলে মনে হয়। এ কারণে আমরা বলেছিলাম এটি আরেকটু বাড়াতে। দেশে অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে আয় করেন। তাঁদের আইডেন্টিফাই করে তাঁদের নিয়ে ভ্যাটের আওতাটা বাড়াতে হবে। যাঁরা দিচ্ছেন তাঁরা তো দিচ্ছেনই; কিন্তু অনেক পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী ভ্যাটের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
আমরা যেটা প্রত্যাশা করেছিলাম, শুধু ভিজিডি দিলেই তো হবে না, সামাজিক নিরাপত্তাটা বাড়াতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তার জন্য যেটি করা হয়Ñসাধারণত পেনশন এবং গ্র্যাচুইটি সুবিধার জন্য ব্যয় করা হয়। এর বাইরে সামাজিক সুবিধা সেই অর্থে নেই। সরকার অবশ্য বলেছিল, বেসরকারি খাতে ইনস্যুরেন্স দেবে। কিন্তু তা দেয়নি। এবারের বাজেটেই দিতে পারত। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আমরা দেখছি, ভাবছি। অথবা প্রাইভেট সেক্টরের দু-একটা এরিয়ায় অর্থমন্ত্রী এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার কথা বাজেটে বলতে পারতেন। আর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে তো বাড়ানোই হয়নি। স্বাস্থ্য খাতে আমাদের এখানে ব্যয় করা হয় জিডিপির ১ শতাংশ। কিন্তু এটির আন্তর্জাতিক মান হচ্ছে ৪ শতাংশ। ফলে এভাবে কী করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মান বাড়বে আমি বুঝতে পারছি না।
একটা ব্যাপার আমাদের খুব অবাক করেছেÑআর্থিক খাতের যে এত দুরবস্থা, সেটি নিয়ে তিনি এখনো নির্বিকার। এ বিষয়ে কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত পঁচিশ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি আছে। এটি কিভাবে পূরণ করা হবে? একটি বিকল্প আছে যে তারা অনুদান পাবে। অনুদান পেলে ভালো। না হলে দেশীয় সম্পদ থেকে ঘাটতি পূরণ করতে হবে। অনুদান মানে দেশীয় সম্পদ এবং সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিতে হবে। তাহলে তো ঘাটতিটা কমল না। এই ঘাটতিটা মেটানো যেত এভাবে যে অন্য প্রকল্পগুলো ছোট করে বাজেটটা আরেকটু ছোট করলে ব্যাপারটা সহজ হতো। তাতে ব্যাংকের ওপর চাপ কমত।
একটি বিষয় হতাশ করেছে। বাজেটের আগে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, করপোরেট ট্যাক্স কমাবেন। আমাদের এখন মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। সেটি বাড়াতে হলে তো সুদের হার কমানোর চেষ্টা করতে হবে। এটি কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারবে জানি না। এ বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। কারণ আদেশ বা নির্দেশ দিয়ে ব্যাংকের সুদের হার কমানো যায় না। ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা যদি না বাড়ানো হয়, অপারেশন খরচ যদি কমানো না হয় এবং প্রফিট মোটিভ যদি না কমে, তাহলে কিন্তু সুদের হার কমার সুযোগ নেই। করপোরেট ট্যাক্স কমালেই সুদের হার কমবে না। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা, মনিটরিং এবং দুর্নীতি না কমাতে পারলে এটি সফল হবে বলে মনে হয় না। আর আশপাশের অনেক দেশের তুলনায় আমাদের দেশের করপোরেট ট্যাক্সও অনেক বেশি।
সার্বিকভাবে বলতে গেলে এবারের বাজেট সমতাভিত্তিক যেমন হয়নি, কর্মসংস্থান তৈরিতে সহায়ক বা সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণমুখী হয়নি। ফলে এবারের বাজেটে নতুন সম্ভাবনার বিষয় কম এবং একটি গতানুগতিক বাজেটই হয়েছে।

লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here