বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যা: হিসেবটা মিলছে না

আশীষ কুমার দেঃ
বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে গত ২৬ জুন সকালে দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে ফিল্মিস্টাইলে কুপিয়ে হত্যা করে ওই কলেজের শিক্ষার্থী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির স্বামী স্থানীয় যুবক রিফাত শরীফকে। নৃশংস সেই হত্যাকান্ডের ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে হত্যাকারীদের চেহারা সহজেই উন্মোচিত এবং দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, হত্যার সঙ্গে জড়িত দু’জন বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের নিকটাত্মীয়। তবে এখন নতুন করে আলোচনামুখর হয়ে উঠেছে বরগুনার সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে সুনাম দেবনাথের নাম।

বরগুনায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু ও দেলোয়ার হোসেন পরস্পর বিপরীতমুখী অবস্থানে। তাঁদের এই দ্বন্ধের নেপথে সাংসদ পদে দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তির প্রতিযোগীতা। সে দৌঁড়ে সব সময়েই শম্ভু এগিয়ে আছেন।

কিন্তু ২৬ জুনের রোমহর্ষক হত্যাকান্ডের পক্ষকাল পর মাঠে সক্রিয় হয়েছেন সাংসদ শম্ভুর পুত্র সুনাম দেবনাথ। তিনি মাঠে নামার একদিন আগে নিহত রিফাত শরীফের বাবা চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার ১ নম্বর সাক্ষী তাঁরই পুত্রবধূ সদ্যবিধবা আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির বিরুদ্ধে হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে তাঁকে গ্রেপ্তারের দাবি তোলেন। এরপর স্থানীয় কিছু লোকজন ওই দাবির সমর্থনে পরেরদিন শহরে মানববন্ধন করেন; যেখানে সুনাম দেবনাথ কার্যত প্রধান বক্তা ছিলেন এবং দীর্ঘক্ষণ বক্তৃতা করেন।

তবে ওই মানববন্ধন থেকে মূল খুনী নয়ন বন্ডের (ক্রসফায়ারে নিহত) পলাতক সহযোগীদের গ্রেপ্তারের জোরালো দাবি না উঠলেও, ০০৭ গ্রুপের সন্ত্রাসী ও তাদের গডফাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারিত না হলেও আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেপ্তারের জোরালো দাবি তোলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গ্রেপ্তার করা হয় মিন্নিকে; এখন তিনি পাঁচ দিনের পুলিশ রিমান্ডে আছেন।

আজ সকালে বরগুনার পুলিশ সুপারের বক্তব্য অনুযায়ী, রিমান্ডে আনার পরই নাকি স্বামী রিফাত খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন মিন্নি। তবে গতকাল যখন মিন্নিকে পুলিশ আদালতে তুলে রিমান্ডের আবেদন করেছিল তখন মিন্নির পক্ষে শুনানির জন্য সেখানে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। এ কারণে আদালত মিন্নিকেই কথা বলার সুযোগ দেন। তখন মিন্নি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে স্বামী রিফাত শরীফ হত্যার ন্যায় বিচার দাবি করেন। একই সঙ্গে বলেন, তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার।

অন্যদিকে পৈশাচিক ও রোমহর্ষক হত্যাকান্ডের বিষয়ে এখন যতোটা না আলোচনা হচ্ছে, তার বহুগুণ বেশি আলোচনা হচ্ছে মিন্নির চরিত্র নিয়ে। তিনি রিফাতকে বিয়ে করার আগে নয়ন বন্ডকে বিয়ে করেছিলেন, তাকে তালাক না দিয়ে রিফাতকে বিয়ে করেছেন, রিফাতের সঙ্গে বিয়ের পরও নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির যোগাযোগ ছিল ইত্যাদি নানা কথা।

এসব মুখরোচক আলোচনার সূত্রপাত করেন ক্রসফায়ারে নিহত নয়ন বন্ডের মা এবং পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রচার করেন নিহত রিফাতের বাবা। এরপর সুনাম দেবনাথের প্রকাশ্য তৎপরতা। সাংসদপুত্র সুনাম দেবনাথ মানববন্ধনে রিফাত হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করলেও বরগুনায় ০০৭ বাহিনীর দীর্ঘদিনের নানা অপকর্ম এবং রিফাতকে নৃশংসভাবে হত্যায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কিছুই বলেননি।

এছাড়া ক্রসফায়ারে নিহত নয়ন বন্ডের মায়ের বক্তব্য এবং নৃশংসভাবে খুনের শিকার রিফাত শরীফের বাবার বক্তব্য ও দাবি আমলে নিয়ে সুনাম দেবনাথ ও তার অনুসারীদের মানববন্ধনে উত্থাপিত দাবি আমলে নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে মিন্নিকে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ, রাতে গ্রেপ্তার এবং পরেরদিন আদালতের অনুমতি নিয়ে পুলিশ হেফাজতে আনার মধ্য দিয়ে জনমনে ধু¤্রজাল সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে, আদালতে মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী না দাঁড়ানো, পুলিশ হেফাজতে কিংবা আদালতে তাঁর সঙ্গে বাবা-মার দেখা করতে ও কথা বলতে না দেয়া এবং রিফাত হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত ছিল না- ০০৭ বাহিনীর অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের বড় ধরনের কোনো অভিযান এখনও পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

এ বিষয়ে সিনিয়র সাংবাদিক শ্রদ্ধেয় বিভুরঞ্জন সরকারের ফেসবুকে দেবদুলাল মুন্নার একটি পোস্ট তুলে ধরা হয়েছে; যার শিরোনাম ছিল- ‘মিন্নি কেইসটা হ্যান্ডেলিং করতে হলে যে সব প্রশ্ন জাগা দরকারি’। আমি সেই পোস্টটি নিচে তুলে ধরছি:-

নয়নের সাথে মিন্নির বিয়ের দাবি প্রসংগে- মিন্নির দাবি, নয়ন তাকে অস্ত্রের মুখে একটি ঘরে নিয়ে বিয়ের কাবিনের বইয়ে স্বাক্ষর নিয়েছিল। তিনি নয়নকে বিয়ে করেননি। অপরদিকে এই বিয়ে যদি সত্যও হয়ে থাকে, তাহলে কী করে মিন্নি নয়নকে ডিভোর্স না দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করলেন? রিফাত যে মিন্নির স্বামী, এটা পরিবার-সমাজ সবাই জানে। নয়নও যে মিন্নির স্বামী, এটা কি সবাই আগে থেকে জানত? হত্যাকা- ঘটার পর এসব প্রকাশ করা হলো কেন? নিশ্চয়ই কারো স্বার্থ রক্ষার জন্য! একটা মেয়ে কিভাবে নয়নের মতো এমন একটা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর স্ত্রী হয়ে কোনো দেনদরবার ছ্ড়াাই রিফাতকে বিয়ে করে!!! তখন এ নিয়ে কেন সমাজে কোনো আলোচনা ছিল না। তখন নয়ন, তার মা ও প্রভাবশালীরা কোথায় ছিলেন! এসব প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক কারণেই সামনে চলে আসেছে।

এখন মিন্নির শ্বশুর দুলাল শরীফ নতুন করে নয়নের সাথে মিন্নির বিয়ের কাহিনি নিয়ে কথা তুললেন ! বলছেন, এ কথা তিনি আগে জানতেন না। তাহলে তিনি কবে জেনেছেন এই কথা? নয়নের স্ত্রীর বিয়ে হয়ে যায়, আর নয়নও এটা গোপন রাখলো? নয়নের মাও কারো কাছে এর একটা বিহিত চাননি? এটা কি প্রশ্ন জাগার মতো নয়?

রিফাতের সাথে যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে মিন্নির বিয়ে হয়, সেদিন নয়ন কি দেশে ছিল না? যদি দেশে থেকে থাকে তাহলে কেন সে তার ০০৭ বাহিনি নিয়ে রিফাতের বাড়িতে গিয়ে বলে না যে মিন্নি তার স্ত্রী! এই দুনিয়ায় প্রেমিকার বিয়েতে বাধা দেয়ার ঘটনা শোনা যায়, কিন্তু নিজের স্ত্রীর বিয়ে হয়ে যায় সেই বিয়েতে কোনো বাধা নাই! রিফাতের বাবাকে তো নয়ন ফোন করেও বলতে পারতো- মিন্নি তার স্ত্রী! আর নয়নের মা এখন বলছে, মিন্নি দুই স্বামীর ! এই দাবি যদি সত্য হয় তাহলে এই অন্যায় চলাকালে এর বিরুদ্ধে কী প্রতিবাদ করেছেন নয়নে মা? কার কাছে নালিশ করেছেন? এই প্রশ্ন কি ওঠে না?

নয়নের মা রিফাত হত্যার পর থেকে ঘরে তালা মেরে অন্য কোথাও ছিলেন। এতদিন পর পুলিশ নয়নের মাকে নিয়ে তার ঘরে ঠুকলেন, নয়নের সাথে মিন্নির সম্পর্ক নিয়ে আলাপ করলেন, আর এর পরই তিনি মিন্নির বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে সব দোষ মিন্নিকে দিলেন, যারা খুন করলো তাদের বিরুদ্ধে একটি শব্দও বললেন না!

অন্যাদিকে, নয়নের মার বক্তব্য মিডিয়ায় আসার পরই রিফাতের বাবা সংবাদ সম্মেলন করার জন্য হাজির হয়ে গেলেন প্রেসক্লাবে! এত সহজেই? যিনি আপনার পুত্রবধূ, যার বিরুদ্ধে আপনার কোনো অভিযোগই ছিল না, ১২ জনকে আসামি করলেন আর মিন্নিকে মানলেন প্রত্যক্ষ এবং বিশ্বস্ত সাক্ষী! এখন খুনি নয়নের মার বক্তব্য শুনেই সব পাল্টে গেল! তা যাচাই করার জন্য সময় নেওয়ার সরকার মনে করলেন না, তাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানাতে সংবাদ সম্মেলন করতে প্রেসক্লাবে চলে এলেন! আবার সেই সংবাদ সম্মেলনের সময় স্থানীয় সাংসদ শম্ভুর ছেলে সুনাম দেবনাথ প্রেসক্লাবে আসা যাওয়া করছিলেন! তবে কী উদ্দেশ্যে তিনি তখন প্রেসক্লাবে উপস্থিত ছিলেন, মামলার তদন্তের সার্থে তা জানা জরুরি নয় কি? এরই মধ্যে মিন্নিকে গ্রেফতারের দাবিতে এলাকায় দীর্ঘ মানববন্ধন হয়ে গেল! স্লোাগান দেয়া হলো ‘মিন্নির ফাঁসি চাই’। আবার সেই মানববন্ধনে উপস্থিত থাকলেন শম্ভুর ছেলে সুনাম দেবনাথ! যার বিরুদ্ধে নয়নের সাথে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ আগে থেকেই। এসব কেন হচ্ছে, কারা করছে, মামলার তদন্তের সার্থে এটা কি জানা প্রয়োজন নেই?

আমার প্রশ্ন, মিন্নিকে গ্রেফতারের জন্য এলাকায় মানববন্ধন হয়, কিন্তু রিফাত হত্যার খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও বাকি ৫ জন্য খুনিকে গ্রেফতারের দাবিতে কেন মানববন্ধন হয় না? এখন প্রশ্ন হলো, এলাকায় প্রভাবশালীরা কার পাশে, মিন্নির না খুনিদের? কী মনে হয় আপনাদের কাছে? প্রশ্ন জাগে না? নয়ন এত এত মামলার আসামি হয়ে কিভাবে, কার শক্তিতে এলাকায় দাপিয়ে বেড়াত? কার ইশারায় অস্ত্র মামলায়ও সে জামিন পেয়ে যেত? এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি আজও। আমার ধারণা, এসব প্রশ্নের উত্তর পেলে এই ঘটনার তদন্ত সঠিক পথে মোড় নেবে।

বরগুনার চলমান এ বিষয়ের ওপর আজ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হুমায়ুন কবির বুলবুলের ফেসবুকে তাঁর একটি স্ট্যাটাসের ওপর জনৈক তৌফিকুল ইসলামের মন্তব্য এখানে তুলে ধরছি-
“০০৭ গ্রুপের প্রধান এমপি-পুত্র সুনাম বন্ড’কে গ্রেপ্তার না করলে অনেক কিছুই অজানা থেকে যাবে।
একবার ভাবুন মিন্নীর পক্ষে একজনও উকিল নেই কেন…?
সে জঘন্য অপরাধী হতে পারে……!!!
মামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার সফল চেস্টা
মিন্নীকে বাচানোর দরকার নেই কিন্তু প্রকৃত অপরাধী যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে না যায়।
নয়ন বন্ড এর ক্রসফায়ার মিন্নীকে গ্রেফতার…. এমপি পুত্র সুনামের জয় জয়কার….
বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন…….”

সিনিয়র সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের ফেসবুক টাইমলাইনে দেব দুলাল মুন্নার অনুসন্ধিৎসু নানা প্রশ্ন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হুমায়ুন কবির বুলবুলের টাইমলাইনে তাঁর নিজের মতামত এবং সেখানে তৌফিকুল ইসলামের মন্তব্য- কোনোটিই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

তাই পরিশেষে বলতে চাই, আমরা কেউই নৃশংস হত্যাকান্ড চাই না, খুনীরা বেঁচে যাক- তাও চাই না। তবে প্রত্যক্ষ খুনীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। ০০৭ বাহিনী তৈরিতে নয়ন বন্ডকে যারা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে, বরগুনায় নানা অপকর্ম করতে নয়ন বন্ড ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের দীর্ঘদিন যাবত যারা সব ধরনের সহায়তা দিয়ে আসছে- এসব নেপথ্য গডফাদারদের মুখোশ উন্মোচন ও গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।

যেহেতু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন, সেহেতু বরগুনার বিষয়ে তিনি দ্রুত হস্তক্ষেপ করবেন বলে প্রত্যাশা করি। তাই রিফাত শরীফ হত্যা, নয়ন বন্ডকে ক্রসফায়ারে হত্যা এবং সর্বশেষ মিন্নিকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়ার মতো একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচনের স্বার্থে একটি বিচারভিাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করাও জরুরি হয়ে পড়েছে।
আশীষ কুমার দে: সম্পাদক, পিটিবিনিউজ.কম ও সাপ্তাহিক পাঠকের কন্ঠ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here