থামছেনা শেবাচিমের ওষুধ চুরি

নিজস্ব প্রতিনিধি:নিত্যনতুন কৌশলে চুরি হচ্ছে বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়(শেবাচিম) হাসপাতালের ওষুধ। সরকারি বরাদ্দের বাইরে রোগীদের কেনা ওষুধও চুরি হচ্ছে একইভাবে। দীর্ঘ দিন ধরে ওষুধ চুরিতে সংঘবদ্ধ একটি সিন্ডিকেট শেবাচিম হাসপাতালে গড়ে তুলেছে রামরাজত্ব।

তথ্য মতে, সিন্ডিকেটের যোগসাজশে শেবাচিম হাসপাতাল থেকে অন্তত অর্ধকোটি টাকার ওষুধ চুরি হচ্ছে প্রতি মাসে। অভিযোগ আছে, হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের রেজিস্ট্রার, সহকারী রেজিস্ট্রার, ইনডোর মেডিকেল অফিসার (আইএমও), স্টোর অফিসার, নার্স ও আয়ারা রয়েছেন এ ওষুধ চুরির নেপথ্যে। আর ওষুধ পাচারের মূল কাজটির সঙ্গে জড়িত শেবাচিম হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা। আবার রোগীদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ করা এসব ওষুধ বাজারজাতকরণের কাজে রয়েছে সিন্ডিকেটের অপর একটি অংশ। শেবাচিম হাসপাতাল ঘিরে গড়ে ওঠা ফার্মেসিগুলোই এ ওষুধের ক্রেতা।

এ ছাড়া বরিশালের পাইকারি ওষুধের বড় বাজার সদর রোডেও শেবাচিম হাসপাতালের ওষুধ পাচার হয়। তবে বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে বিক্রয় নিষিদ্ধ চিহ্নিত সরকারি ওষুধ পাওয়া গেলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক বেসরকারি কোম্পানি থেকে কেনা ওষুধ চিহ্নিত করা যায় না। এদিকে বিভিন্ন কর্মচারী ও বহিরাগত দালালদের বিরুদ্ধে একাধিকবার পদক্ষেপ নিয়েও ওষুধ চুরি ঠেকাতে পারছেন না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

তবে হাতেনাতে ও সুস্পষ্ট প্রমাণ পেলে ওষুধ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা হাসপাতাল প্রশাসন থেকে বলা হলেও নিয়ন্ত্রণকারীরা রয়েছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সূত্র জানায়, শেবাচিম হাসপাতালের জন্য ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ওষুধ ও মেডিকেল সার্জিক্যাল রিকুইজিট (এমএসআর) মিলে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে রোগীদের ওষুধের জন্যই বরাদ্দ রয়েছে বেশি টাকা। হাসপাতালে ব্যবহ্নত ব্যান্ডেজ, গজ, তুলা, অপারেশনের সুই, সিরিঞ্জ ইত্যাদি রয়েছে। কিন্তু কোটি কোটি টাকা ওষুধে বরাদ্দের পরও রোগীদের কপালে জোটে না সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ।

ওয়ার্ড মাষ্টাররাও ওষুধ চোর সিন্ডিকেটের হোতা হিসেবে পরিচিত। শেবাচিম হাসপাতালের ওষুধ পাচারের সঙ্গে ওয়ার্ড মাস্টার আবুল কালাম জড়িত আছেন এমন অভিযোগ দীর্ঘ দিন থেকে।কিন্তু শাস্তি হিসেবে সম্প্রতি তাকে বরগুনা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে নতুন করে ওষুধ চুরির কাজে জড়িত রয়েছেন হাসপাতালের (৫মতলায়) জেনারেল অপারেশন থিয়েটারের ইনচার্জ শাহিদা পারভীন,গাইনী ওটি’র ইনচার্জ নাসরিন বেগম, অর্থপেডিক ওটি’র ইনচার্জ পারভীন বেগম, চক্ষু ওটি’র ইনচার্জ রিনা পারভীন, নাক-কান-গলা ওটি’র ইনচার্জ হাসিনা বেগম,(২য় তলায়)শিশু সার্জারী ওয়ার্ডের ইনচার্জ সুরাইয়া বেগম,সেবিকা শিলা আক্তার,মহিলা সার্জারী ওয়ার্ডের সেবিকা খুকু রাণী হালদার,(নীচ তলায়) জরুরী বিভাগের মিনি ওটি’র ইনচার্জ হরে কৃষ্ণ,অর্থপেডিক ওটি’র ইনচার্জ ফরিদ হোসেন ও সার্জারী ওটি’র ইনচার্জ ওয়ালিদ হোসেন,আইসিউ ওয়ার্ডের ইনচার্জ ফরিদা বানু ও সেবিকা কানিজ ফাতেমা’র নাম।

আর এসব ওষুধ বাহিরে বিক্রি করছেন ওয়ার্ড মাষ্টার মশিউল আলম, মোদাচ্ছের আলী ওরফে মোদাচ্ছের কবীর,ইউনুস সরদার ও জেনারেল ওটি’র চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ইমাম। এর সঙ্গে শুধু সেবিকা ও কর্মচারীরাই দায়ী নন। সাব-স্টোরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সিনিয়র স্টোর অফিসার চিকিৎসক অনামিকা ভট্টাচার্য্য জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০১৭ সালের ১৬মে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ওষুধ চুরি ও উদ্ধারের ঘটনায় হাসপাতাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়।

মামলায় তৎকালীন মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে অবৈধভাবে ওষুধ জমিয়ে রাখার দায়ে ইনচার্জ বিলকিস জাহান,অফিস সহায়ক শেফালী বেগম,লিটন ও নির্মলেন্দুকে গ্রেপ্তার করা হয়।এসময় গ্রেপ্তার আতঙ্কে পালিয়েছেন হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণি’র কর্মচারী কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ও বর্তমান ওয়ার্ড মাষ্টার মোদাচ্ছের আলী, নার্স আফরোজা বেগম, সার্জারি বিভাগের এমএলএসএস দেলোয়ার ও নার্স বিলকিস বেগমের আত্মীয় (অস্থায়ী কর্মী) বিউটি বেগম। এদের মধ্যে অনেকেই কারাভোগ করেছেন। বর্তমানে এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীও চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও অদৃশ্য কারণে এসব ওষুধ চুরির বিষয় স্টোর অফিসারকে ম্যানেজ করে এবং চিকিৎসকের স্বাক্ষর নকল করে স্টোর থেকে ওষুধ পাচার করেন বলে অভিযোগ আছে।

এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের স্টোর কিপার সাইফুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাতে কথা হলে তিনি বলেন,‘অফিস সময়ে ওষুধ সম্পর্কে কিছু বলা যাবে না। এই কক্ষে গোপন ক্যামেরা রয়েছে।আপনার(প্রতিবেদকের) সঙ্গে পরে কথা হবে’। সিনিয়র স্টোর অফিসার চিকিৎসক অনামিকা ভট্টাচার্য্য বলেন,‘রোগীদের বিনা মূল্যে কত প্রকার ওষুধ দেয়া হয় তার কোন তালিকা নেই। তাছাড়া ওষুধের কোন বিষয় জানতে হলে তিনি হাসপাতাল পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন’।

মঙ্গলবার সকালে শেবাচিম হাসপাতালে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, নিচতলার প্রধান ফটকের দেয়ালে রয়েছে হাসপাতালে বিনামূল্যে দেয়া ওষুধের একটি নোটিশ। কিন্তু এ নোটিশ হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রদর্শনীয়ভাবে টাঙানোর নিয়ম থাকলেও আছে কয়েকটি ওয়ার্ডে। অভিযোগ আছে, ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ড মাস্টার, আয়া ও ওয়ার্ডবয়রা ছিঁড়ে ফেলেন এ নোটিশ। এ কারণে তালিকাভুক্ত এক-তৃতীয়াংশ ওষুধও পান না রোগীরা। শেবাচিম হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ড সার্জারি, নিউরো সার্জারি, মেডিসিন, শিশুরোগ, হৃদরোগ, অর্থোপেডিকস, গাইনী, ক্যাজুয়ালিটি বিভাগের কয়েকজন রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব ওয়ার্ড থেকে কোনো সরকারি ওষুধ পাওয়া যায় না।

এ প্রসঙ্গে শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা.মো.বাকির হোসেন বরিশালের সংবাদকর্মীদের সহায়তা চেয়ে বলেন,“ফার্মেসী থেকে কেনা গরীব-দুঃখী রোগীদের ওষুধ কতিপয় অসাধু কর্মচারী তাদেরকে ফেরত না দিয়ে বাহিরে বিক্রি করে দেয়। এমনটা অভিযোগ রয়েছে। একারনে অপারেশন থিয়েটারগুলোতে আসা রোগী ও স্বজনদের সচেতন করার লক্ষ্যে প্রতি মাসে একটি সভাও করা হয়। তাছাড়া বিনামূল্যে দেয়া ওষুধের তালিকা ছিঁড়ে ফেললে লেমিনিটিং করে দেয়ালে লাগানো হবে। প্রয়োজনবোধে বিনামূল্যে দেয়া ওষুধের তালিকা ডিজিটাল বোর্ডে লেখা থাকবে। তিনি আরো বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠিনতর মনিটরিং করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে”।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here