মুরগি পালন করে চলে শিক্ষিকা শিল্পী রাণীর সংসার

রিজাউল করিম: শিল্পী রাণী পাটোয়ারি। খুলনার সোনার তরী নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। গত ২০০৪ সাল থেকে শিক্ষাকতা করছেন তিনি। দীর্ঘ এ জীবনে তাই দেওয়ার পাল্লাটাই তার ভারি। পাওয়ার পাল্লাটা প্রাই শূন্য। আশা ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হবে। শিক্ষকতার প্রাপ্তি তখনই মিলবে। কিন্তু শিক্ষক জীবনের ১৪টি বছর পেরিয়ে গেলেও কাঙ্খিত সেই প্রাপ্তি আজও মেলেনি।

শিল্পী রাণী আশা করেছিলেন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলে তার অর্থনৈতিক দৈন্যতা থাকবে না। কিন্তু এমপিওভুক্ত না হওয়ার কারণে আজ অর্থ কষ্টে জর্জরিত তার সংসার জীবন। অর্থের টানা পড়েনে তাকে হারাতে হয়েছে নিজের স্বামীকেও। কারণ একজন শিক্ষক বা চাকরিজীবী পরিচয়ের কারণেই স্বামী তাকে বিবাহ করেছিলেন। কিন্তু এতোটি বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও যখন তার চাকরিতে কাঙ্খিত বেতন না আসে, তখন স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যায়। এখন অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া এক ছেলে নিয়েই চলছে তার জীবন। তবে সে জীবন সুখের নয়, বড় কষ্টের। স্বামী হারা শিল্পী রাণীর জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে কয়েকটি মুরগির ওপর। ছোট-বড় মিলিয়ে ২০টি মুরগি পালন করেন শিল্পী রাণী। যেখান থেকে মাসে আয় হয় হাজার খানেক টাকা। যা তার আয়ের প্রধান উৎস। তবে তিনি সাতজন ছাত্রীকে প্রাইভেটও পড়ান। কিন্তু সেখান থেকে পান ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। যা আবার কোন কোন মাসে পুরোটা পান না। একজন শিক্ষিকা হয়েও যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তার আয়ের দরজা প্রাই বন্ধ। তখন হাতে গোনা ১৫টি মুরগি-ই হলো তার জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম।

শিক্ষিকা শিল্পী রাণী বলেন, আমি একজন শিক্ষিকা। বড় আশা করে এ পেশায় এসেছিলাম। কারণ এটা সম্মান ও মর্যাদার পেশা। কিন্তু এখন দেখছি এটা সবচেয়ে অবহেলিত একটা পেশা। বার বার আমরা এমপিওর দাবি তুলি আমাদের বারবার আশ্বাস দেওয়া হয় কিন্তু আশ্বাস বাস্তবায়ন করা হয় না। জীবনের এ বয়সেও এসে আর অন্য কিছু করারও উপয় নেই। তাই ছেলে-মেয়েদের বলি তারা যেন শিক্ষকতা পেশায় না আসে।

তিনি বলেন, প্রতিটি মানুষের জীবনে দেওয়া ও পাওয়ার বিষয় থাকে। আমার এ শিক্ষকতা জীবনে দিয়েই গেলাম। বিনিময় পেলাম না। আমার ছাত্রীরা অনেকেই এখন সরকারিসহ বিভিন্ন কোম্পানির চাকরি করছে। তারা বেতন পাচ্ছে। জীবনটা অর্থপূর্ণ করে তুলছে। আর আমি তাদের শিক্ষক হয়ে আজ অর্থ কষ্টে জীবন যাপন করছি। নিজের স্বামীও হারিয়ে ফেলেছি। আর যে সম্মান ও মর্যাদার কথা ভেবে এ পেশায় এসেছিলাম সেটা তো নেই-ই। কারণ এ সমাজে যার অর্থ নেই তার সম্মান নেই। সরকারের কাছে আমি হাত জোড় করে বলি আমাদের একটু সম্মান নিয়ে বাঁচার সুযোগ করে দিন। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্ত করে নিন।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এমনই জীবন সংগ্রামের কথা বলছিলেন বগুড়া খানপুর খায়ারখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রেবেকা সুলতানা ও সহকারি শিক্ষিকা আমেনা খাতুন। নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিওভুক্তির প্রয়োজনীযয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি চলাকালীন তারা এসব কথা বলেন। গত ১৫ দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে তারা ননএমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক কর্মচারী ফেডারেশনের ব্যানারে।

এসময় ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ ড. বিনয় ভূষণ রায় বলেন, আজকের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সব স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার ঘোষণা না এলে আগামীকাল সকাল ১০টা থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শিক্ষকরা আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করবে। এতে করে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির জন্য আপনারাই দায়ী থাকবেন।

প্রসঙ্গত, গত ১০ জুন থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। এর আগে একই দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনশন কর্মসূচিতে নামে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশন।

এর আগে ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত অনশন করার পর প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে তারা অনশন ভঙ্গ করে ফিরে যায়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা তখন তাদের দাবি পূরণের প্রতিশ্রুতি দেন।

সারাদেশে বর্তমানে সাড়ে সাত হাজার নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ২৪২টি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসাকে। স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এসব প্রতিষ্ঠানকে এখনো এমপিওভুক্ত না করায় ফের আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষকরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here