আপনি কি ইচ্ছার বিরুদ্ধে মূল্যহীন কোনো জব করছেন?

নিউজ ডেস্কঃ আপনি কি কোনো মূল্যহীন, ফালতু চাকরি করছেন? ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে!

তবে এই অপচয় , কিংবা আন্তরিকতার অভাব, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, কৌটিল্যতার চাঁদর, অটোমেশন মুখোশ, ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কাজ করা, সমাজ,সময় এবং পরিস্থিতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে নিজের স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিয়ে বাধ্য হয়ে কাজ করা দেশ ও জাতির জন্য ভয়াবহ কোনো বিপর্যয় যে ডেকে আনবেনা তা নিশ্চিত করে বলাটা হবে সবথেকে বড় বোকামি।

সিসিফাস, কোরিন্থের রাজা, তার কি এমন দোষ ছিল যে ইতিহাস তাকে আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত করেছে, চিরকালের জন্য একজন ঘৃণিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় পেয়েছিলেন তিনি, আজীবনই অনেক মানুষ তাকে নিন্দার পাত্র বানিয়ে রেখেছিল। তার দোষ ছিল শুধুমাত্র এটা যে, সে একটা পাথরকে পাহাড়ের চূড়ায় উঠিয়েছিলেন, দু চারটা পাথর নিক্ষেপ ও করেছিলেন, শুধুমাত্র এটা দেখার জন্য যে পাহাড় থেকে কিভাবে একটা পাথর গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে। ডেভিড গ্র্যাবার, একজন নৃতত্ত্ববিদ, মনে করছেন যে, আধুনিক যুগেও বর্তমান অনেক কর্মীরই , কর্মী বলতে অত্যুক্তি হলেও চাকুরিজীবী বলা যায় , ঠিক একই রকম ভাগ্য বরণ করে নিতে হচ্ছে।”

তবে প্রত্যেক ব্যক্তিস্বত্বারই আলাদা আলাদা ইচ্ছা থাকে, আকাঙ্খা থাকে। পুরো ব্যক্তিস্বার্থ , নিজের ইচ্ছা সবকিছুকে জলাঞ্জলি দিয়েই অনেক যুবক যুবতী সামাজিক অবস্থানের কথা, পারিবারিক ইচ্ছার কথা, চাকরি নিরাপত্তা ,আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা , এরকম বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ইচ্ছা, আগ্রহের বাইরেই চাকরি নিয়ে নিচ্ছে। চাকরিতে ঢুকে সে যে কাজগুলো করবে, সে সব কাজই তার কাছে ভিত্তিহীন, মূল্যহীন, ফালতু। তারপরেও তার অনেকটা বাধ্য হয়েই ওই চাকরিটা করতে হয়। তবুও কিছুই করার নেই। কারন সে চাকরিতে ঢুকছে সবকিছু জেনে শুনেই। এবং উপায়ান্তর না দেখেই এখানে এসেছে সে। আর এই ধরনের অ্যাপ্রোচই দিনে দিনে ওই চাকুরিজীবীদের মধ্যে আত্মঘাতী অ্যাটিচুড তৈরী করে দেয়। নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার মতো। দার্শনিকদের কথা মনে পড়ে গেলো, সবাই ই বলেছেন , যে কাজে আনন্দ নেই, সে কাজ করে আসলে কোনো লাভ নেই, কারন সেই কাজ কখনো ঠিকভাবে করাই হয়না।

তবে গ্র্যাবার সাহেব তার বইতে ব্যখ্যাটা একটু ভিন্নভাবেই দিয়েছেন এবং ওই রকম চাকরিকে বলছেন ,” বুলশিট জব”, সংজ্ঞায়ন করেছেন ঠিক এইভাবে যে, এরকমভাবে যদি কেউ কোনো চাকরি করে, তবে সেই চাকরি নিরর্থক, অপ্রয়োজনীয় এবং সর্বনাশা, এবং এমনই সর্বনাশা যে, চাকুরিজীবী অনুভবই করতে পারেন না, টেরই পাননা যে কতবড় ক্ষতিকর একটা কিছু অবিরত ঘটে চলছে তার সাথে। মাঝে মধ্যে যদিও তারা অভিনয় করে , যে না সবকিছু তো ঠিকই আছে। এই সংজ্ঞায়ন তথা তার বইয়ের অনেকটা অংশ জুড়েই বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দুই ধরনের ভূমিকা পালন করে সবাই, সম্মিলিত ভূমিকা। প্রথমটি হলো চাকরি , যা গ্র্যাবার মনে করেন সামাজিকভাবে মূল্যহীন। (এই যেমন ধরুন কর্পোরেট আইনজীবী কিংবা বিনিয়োগকারী ব্যাঙ্কার। তবে কিছু চাকুরিজীবী আবার নৃতত্ত্ববিদদের কাজ নিয়েও সন্দেহ পোষণ করে প্রশ্ন তুলতে পারেন। আর দ্বিতীয় ক্যাটাগরির চাকরিগুলোতে মনে হবে যেন চাকুরিজীবী নিঃশব্দেই ব্যস্ত , অনেক অনেক ব্যস্ত, আদতে আসলে তার কিছুই করার নেই, অথবা যা ও বা আছে তা খুবই নগণ্য।

এসব কথার মানে কি? যুক্তি কি? গ্র্যাভারের এসব কথার পেছনে প্রমাণ কি? কিসের উপর ভিত্তি করে তিনি এসব বলছেন। তবে লেখক এসব বলার পেছনে বেশ কিছু কল্পকাহিনী এবং অনলাইন জরিপের উপর বিশ্বাস রেখেছেন, যে জরিপগুলো বলছে, শুধুমাত্র ব্রিটেন এবং নেদারল্যান্ডের চাকুরিজীবীদের মধ্যেই মাত্র ৩৭% থেকে ৪০% চাকুরিজীবী মনে করেন তারা এই পৃথিবীর জন্য কিছু হলেও অবদান রাখতে পেরেছে। তবে তার কাছে মনে হচ্ছেনা যে বিনয় কিংবা লজ্জা ,সংযম কিংবা পরিস্থিতি তাদের উত্তর নিয়ন্ত্রণ করবে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই , চাকরি করতে গিয়ে তর্ক বিতর্ক দিয়েই আমরা অনেক সময় নষ্ট করে ফেলি। এটা নতুন কিছু নয়। নর্থকোট পারকিনসন এর ধারণা ছিল যে, “ কাজ উপলভ্য সময় পূরণের স্বার্থই অনুসরণ করে” , ১৯৫৫ সালে দ্যা ইকোনোমিস্টের একটা রচনায় তিনি আরো বলেন কাজের মধ্যে এবং চাকুরিজীবীদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক না থাকলেও চলবে, শুধুমাত্র কাজ হলেই হয়। আর মিডল ক্লাস চাকরির ব্যর্থতাও নতুন কিছু নয়। কাজের ক্ষেত্র কিন্তু আবার শুধু বিরক্তির মনোভাব আর অর্থহীন কার্যকলাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনা। স্কুলে পড়েছে এমন যে কেউ ই মনে করতে পারবে যে, তাকে রচনা লিখতে বাধ্য করা হয়েছে কিংবা সে পরীক্ষা শুরু হওয়া মাত্র অংশ নিতে বাধ্য থাকিবে এমন কিছু। যা অনেকটাই বাধ্য হয়ে করতে হতো উদ্যমহীন বটবৃক্ষের মতো। এবং ওই শিক্ষার অনেক কিছুই আছে যা পরবর্তী জীবনে কোন কাজে আসেনা। আবার অনেক শিক্ষক ও স্কুল ওয়ার্ক বানাতে বানাতেই অতিষ্ঠ হয়ে যান, তাহলে যারা এই তৈরি করা স্কুল ওয়ার্ক গুলো নিয়ে কাজ করছে, তাদের অবস্থা কেমন হবার কথা তা খুব সহজেই অনুমেয়।

তবুও কিছু চাকুরিজীবী মনে করছেন যে, গ্র্যাবের এই বিশ্লেষণ একদম পুরোপুরি যুক্তিযুক্ত এবং সময়োপযোগী। অর্থহীন চাকুরি পদ আর মন না টানা সব কাজ কর্ম দিন দিন গুনিতক হিসেবে বেড়েই চলছে, গ্যারি হ্যামেল এবং মাইকেল জ্যানিনি, দুজন ব্যবস্থাপনা তত্ত্ববিদ, হিসেব করেছেন যে, আমেরিকাতে আমলাতন্ত্রের প্রভাব ও বেশ জটিল, এখানে প্রায় ২৪ মিলিয়ন আমলা কাজ করে, এবং প্রতি ৪.৭ জন চাকুরীজীবী প্রতি এক জন আমলার অধীনে কাজ করেন। আর উৎপাদনশীল কর্মের দরুন আমেরিকার অর্থনীতি প্রতি বছর তিন ট্রিলিয়ন হারে ক্রমবর্ধমান থাকে।

গ্র্যাবার এছাড়াও আরো কিছু সুস্পষ্ট তত্ত্ব দিয়েছেন , যেমন এরকম সমস্যা সৃষ্টি হবার কারন কি? তিনি বলছিলেন যে, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে, অটোমেশন (রোবোটের ব্যবহার) ব্যাপক হারে বেকারত্বের সৃষ্টি করেছে, কিন্তু আমাদের এই সমাজই আবার ষড়যন্ত্র করে এমন কিছু চাকরি তৈরি করেছে এই ব্যাপারটি সুকৌশলে চাঁদরে মুড়িয়ে দেবার জন্য তা সত্যিকার অর্থেই নিন্দার স্বার্থে প্রশংসনীয়। তিনি আবার যুক্তিও দেখিয়েছেন যে, রেগান/থ্যাচার যুগে এক এক জন নির্বাহী তাদের অধীনে কতজন কাজ করছেন সেই হিসেব নিয়েই ক্ষান্ত থাকতেন না এবং গর্ব ও করতেন বটে। তারপর গর্বের স্বার্থে কিছু ব্যবস্থাপনা প্রোডিজি নিয়ে আসতেন তারা নিজেদের যে একটা স্ট্যাটাস আছে তা ফুটিয়ে তুলবার জন্য। এবং তিনি একটি স্বতঃসিদ্ধ নীতিই দিয়ে গেছিলেন যে, এগুলো হচ্ছে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থারই একটা অংশ। যেই ব্যবস্থায় অল্প বয়সের যুবক যুবতীরাই ঋণের ভাড়ে ন্যুজ হয়ে কুজ হয়ে থাকে এবং পরবর্তীতে সেই ঋণ চুকানোর জন্য তারা অর্থহীন, মূল্যহীন, ফালতু (ব্যক্তি আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায়) চাকরিতে ঢুকে যায়, যা আস্তে আস্তে তাদের সত্যিকার প্রতিভাকে ধবংস করে দেয়, এবং আত্মঘাতী হবার ফলে কাজের উপযুক্তিতার মান দিন দিন কমে যায়।

এই ব্যাখ্যা যেমন অসাধারন তেমনি আদতে উল্টোদিকে ঠিক অসম্ভবও। আধুনিক নিরবাহীরা সুদ ,লাভ ক্ষতি ,প্রোফিট বিবেচনায় নিয়ে টার্গেট পূরণের লক্ষ্যে কাজ করে। আর এই টার্গেট নির্ধারণী ব্যবস্থাই তাদের জন্য সবথেকে বড় মোটিভেটিং ফ্যাক্টর। এবং তারা নিয়মিত বিনিয়োগকারীদের অনুসরণ করে থাকে। এবং যে কর্মীর কাজ , পারফরম্যান্স ভালো থাকবেনা, তাদেরকে যেকোনো সময় ছাটাই করে দেবার ক্ষমতাও থাকে আধুনিক এই নির্বাহীদের।আর এ ধরনের হুমকির সম্মুখীন করে আপনাকে নিয়োগ দেবার অর্থই হচ্ছে যে, সে নিয়োগ দেবার সময়ই অদক্ষ , বেহুদা, মুনাফা কমিয়ে দিতে পারে এমন কর্মী ছাটাই করে ফেলেন। যদি ধান গাছের আগাছার মতো কেউ টিকেও যায়, হয় সে শিখে ভালো করবে আর তা না হলে হারিয়ে যাবে। আর বর্তমান প্রতিযগিতার এই যুগে এসব কিছু খুব অস্বাভাবিক কিছুই না!

তবে আসল সমস্যা হলো পরিষেবা কোম্পানিগুলোর ধরনেই। এবং আপনি কোনো একটা ফ্যাক্টরিতে হিসেব করতে পারবেন যে, আজ কতগুলো কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে, কটা সফল, কটা বিফল এবং মুনাফা কতো। এসব হিসেব করতে পারা মানেই হলো, বোকামোর সুযোগ খুবই সীমিত। বইয়ের লেখাটা অনেকটা এরকম, দেয়ার ইজ নো প্লেস ফর বুলশিট!!কোনো পরিষেবা ব্যবসায়, আউটপুট তথা ফলাফলের গুনগত মান এবং পরিমাণগত মান এর উপর পূর্ণ নজরদারি চালানো আসলে বলতে গেলে প্রায় অসম্বব একটা কাজ। বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে গ্রামের বাড়িতে প্রথমবারের মতো ব্যাঙ ধরতে যাওয়ার পুরোনো কৌতুহলের মতো, নির্বাহীরা কর্মকর্তারা হয়তো জানেন যে, যারা তাদের চাকুরী করছেন অর্থাৎ যারা তাদের কর্মী তাদের করা কাজ এ যে পরিমাণ সময় ব্যায় হয় তার অর্ধেক সময়ই ম্যাগডেবারগ ব্রিজের জলের মধ্যে যায়।

জ্ঞান এবং দক্ষতার যে এই অভাব, তা পূরণ করতেই নির্বাহীরা একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয় তাদের কর্মীদের জন্য , কারন এখানে কর্মীদের প্রতিক্রিয়া দেয়া যে খুব একটা ফলপ্রসূ হবেনা তা তারা খুব ভালোভাবেই জানে। আসলেই কি হচ্ছে না হচ্ছে এসব কিছুর খবর রাখার জন্যই নির্বাহীরা ঘন ঘন মিটিং ডেকে থাকে। হ্যামেল আর জামেলির মতে, কোনো সংগঠন তার নিজস্ব জটিলতার ভাঁড়ে যাতে ন্যুজ না হয়ে যায়, শুধু এই একটা দিক ঠিক করতেই কর্মীদের একটা বড় পারসেন্টিজের সময় অপচয় হয়ে যায়।

অন্য কথায় বলতে গেলে, গ্র্যাবারের অপচয় করা এই সময় , শ্রম এবং আন্তরিক প্রচেষ্টা ব্যখ্যা করবার জন্য উদারপন্থী নিওলিবারাল ষড়যন্ত্রের বিশাল কোন তত্ত্ব আবিষ্কারের কোনো দরকারই ছিলনা । কারন পারকিনসন ছয় যুগ আগেই বলে গিয়েছিলেন যে, “Officials make work for each other”.

তবে এই অপচয় , কিংবা আন্তরিকতার অভাব, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, কৌটিল্যতার চাঁদর, অটোমেশন মুখোশ, ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কাজ করা, সমাজ,সময় এবং পরিস্থিতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে নিজের স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিয়ে বাধ্য হয়ে কাজ করা দেশ ও জাতির জন্য ভয়াবহ কোনো বিপর্যয় যে ডেকে আনবেনা তা নিশ্চিত করে বলাটা হবে সবথেকে বড় বোকামি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here