সিন্ডিকেটের কবলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইসিটি প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিনিধিঃশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়নাধীন আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন প্রকল্প (২য় পর্যায়) বাস্তবায়নের শুরুতেই কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে। এতে বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তার মুখে পতিত হয়েছে প্রকল্পটি।

জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন প্রকল্প (২য় পর্যায়) আইসিটির মাধ্যমে বাস্তবায়নের একটি সিদ্ধান্ত সরকার কর্তৃক গৃহীত হয়। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৫ লক্ষাধিক শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ শিক্ষকপুল তৈরিকরণ, শিক্ষায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সমন্বয় সাধন, ৪৬০০০ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও ২৫০০ স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপনের মাধ্যমে মাধ্যমে শিক্ষার আধুনিকায়নের লক্ষ্যে এক হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৬-২০ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা করা হয়। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ইতিমধ্যেই ৪৬ হাজার শিক্ষক প্রশিক্ষণের লক্ষ্য নিয়ে ২৭০ জন মাস্টার ট্রেনারের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা হয়েছে। এছাড়াও এ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল তৈরিসহ অন্যান্য কার্যক্রমও এগিয়ে চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করে প্রকল্প পরিচালককে ওএসডি করার মাধ্যমে প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

বিস্তারিত তদন্তে জানা যায়, প্রকল্পের শুরুতে স্মার্ট টেকনোলজি ডকইয়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লি. সরাসরি এই প্রকল্পের জন্যে ল্যাপটপ সরবরাহের প্রচেষ্টা শুরু করে। কিন্তু মন্ত্রণালয় এ প্রচেষ্টায় সায় না দিলে তারা ভিন্নভাবে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। এ বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী প্রকল্পের অধীনে বর্তমান অর্থবছরে e-GP তে ১০টি প্যাকেজের দরপত্র আহবান করা হয়। তন্মধ্যে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ক্রয়সংক্রান্ত ৪টি প্যাকেজের ২টিতে কোনো দরদাতাই অংশগ্রহণ করেনি। এ বিষয়ে প্রকল্পপরিচালকের বক্তব্য থেকে জানা যায়, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ দেশের স্বার্থ বিবেচনায় বরাদ্দ অনুযায়ী মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের Specification তৈরি করে দিলে e-GP তে প্রজেক্টরের শিডিউল ক্রয়কারী স্মার্ট টেকনোলজি, ওরিয়ন কম্পিউটার, ইউনিক বিজনেস সিস্টেম, গ্লোবাল ইত্যাদি ৭টি প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট করে নিম্নমানের Specification এবং অযৌক্তিক Qualification Criteria নির্ধারণের প্রস্তাব করে। Qualification Criteria এর ক্ষেত্রে তারা শুধুমাত্র মাল্টিমিডিয়া এবং DLP টেকনোলজির প্রজেক্টর সরবরাহ করে তাদেরকে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দাবি করে। এছাড়া নিম্নমানের প্রজেক্টরের স্পেসিফিকেশন তৈরি করা, প্রজেক্টরের সিলিং কিট, সিকিউরিটি বক্স সরবরাহ না করা, প্রজেক্টরের অটোস্ক্রিন এর পরিবর্তে ট্রাইপড স্ক্রিন সরবরাহ করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইন্সটল না করে শুর্ধমাত্র টিচার্স ট্রেনিং কলেজে সরবরাহ করা ইত্যাদি অযৌক্তিক দাবি পেশ করে। কিন্তু প্রকল্প কর্তৃপক্ষ অযৌক্তিক এবং দেশের স্বার্থ ও পিপিআর বিরোধী কোনো দাবি বিবেচনায় না নেয়ায়, বর্ণিত প্রতিষ্ঠানসমূহ দরপত্রে অংশগ্রহণ করেনি।

এ অবস্থায় ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সমূহ e-GP দরপত্রের ২টি প্যাকেজে অংশগ্রহণকারী ২টি প্রতিষ্ঠানের দরপত্র বাতিলের জন্য প্রকল্প পরিচালককে আর্থিক প্রলোভনসহ বিভিন্ন ভাবে চাপ প্রয়োগ ও হুমকি প্রদর্শন প্রদান করতে থাকে মর্মে জানা যায়। প্রজেক্টর সরবরাহের ২টি প্যাকেজের দরপত্র রেসপন্সিভ বিবেচীত হওয়ায় তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠালে তা বাতিল করার জন্য তারা উঠে পড়ে লাগে এবং বিভিন্ন মিডিয়ায় মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে ও বিভিন্ন মহলে প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে থাকে।

এখানে আরো উল্লেখ্য যে, মন্ত্রণালয় ল্যাপটপের সঙ্গে Genuine সফটওয়্যার (Windows এবং Office) ক্রয় করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কারণেল স্মার্ট টেকনোলজি বিভিন্নভাবে সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাতিলের চেষ্টা শুরু করে। কারণ ওই প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের ৪৮,০০০ ডেস্কটপ/ল্যাপটপ কম্পিউটার পিপিআর এর বিধি উপেক্ষা করে ডকইয়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মাধ্যমে সরাসরি সরবরাহের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে এবং ল্যাপটপের সঙ্গে পাইরেটেড সফটওয়্যার সরবরাহ করে প্রচুর মুনাফা করার নজির প্রায় সকল প্রকল্পে বিদ্যমান আছে।

জানা যায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী টেসিস থেকে প্রকল্পের ডিজিটাল ডিভাইস ক্রয়ের অনুশাসন জারি করলেও স্মার্ট টেকনোলজি, ওরিয়ন কম্পিউটার, ইউনিক বিজনেস সিস্টেম, গ্লোবাল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান জোটবদ্ধ ভাবে প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রম বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে। তাদের অপচেষ্টার কারণে অবশেষে মন্ত্রণালয় প্রকল্প পরিচালককে ওএসডি করে দিলে প্রকল্প বাস্তবায়ন এক প্রকার বন্ধ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে, সিন্ডিকেটের কবলে পড়ার কারণে এক ৩৫০ কোটি টাকার প্রকল্পটি শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে এবং প্রকল্পের বিপরীতে বর্তমান অর্থবছরের অব্যয়িত ১৫০ কোটি টাকা ফেরত যাবে বলে জানা যায়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়নাধীন আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন প্রকল্পটি (২য় পর্যায়) সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এ ধরনের একটা প্রকল্প অসৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে বন্ধ হয়ে গেলে তা হবে খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত। জরুরি ভিত্তিতে এতে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here