২০ হাজার বছরের পুরনো মানবগোষ্ঠী ওরা

ফিচার ডেস্ক:আধুনিকতা আর ২০ হাজার বছরের প্রাচীন শিকারজীবী সমাজের সংস্কৃতির মাঝে পড়ে নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলতে বসেছে স্যান সম্প্রদায়ের উপজাতীরা। বর্তমান আধুনিক সংস্কৃতির সঙ্গে পেরে উঠছে না এই সম্প্রদায়টি। চিরতরে নিজেদের সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলার ঝুঁকিতে আছে তারা।

আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দা স্যান সম্প্রদায়কে বলা হয় আমাদের প্রথম আদিপুরুষ। সম্প্রদায়টির লোকজনের ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা যায়, তারা সরাসরি প্রথম যুগের হোমো সেপিয়েন্সদের উত্তরসূরি। অর্থাৎ বর্তমান মানবজাতি, যাদের হোমো সেপিয়েন্স বলে আখ্যায়িত করা হয়, স্যান সম্প্রদায়ের লোকজন এই হোমো সেপিয়েন্সদের সবচেয়ে প্রাচীন আদিপুরুষ।

২০ হাজার বছরের প্রাচীন এই সম্প্রদায়টি এখন তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং প্রাচীন প্রথা হারিয়ে ফেলার সবচেয়ে ভয়াবহ ঝুঁকির মুখোমুখি। আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা, বতসোয়ানা, অ্যাঙ্গোলা এবং নামিবিয়াজুড়ে বাস এই স্যান সম্প্রদায়ের। বতসোয়ানায় এদের বলা হয় ‘বাসারওয়া’। হাজার বছর ধরে বতসোয়ানায় যাযাবর হিসেবে নির্বিঘ্ন জীবনযাপন করে আসছে তারা।

স্যান সম্প্রদায়ের একজন সদস্য বিহেলা সিকেয়ার। এক সময় বতসোয়ানায় ব্রিটিশ দূতাবাসে কাজ করতেন তিনি। নিজের সম্প্রদায়ের প্রাচীন ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলা প্রসঙ্গে সিকেয়ার বলেন, ‘সংস্কৃতি এমন একটি বিষয়, যা মারা যেতে পারে। আমাদের বোঝা উচিত, সংস্কৃতি হচ্ছে গতিশীল।’

বতসোয়ানার কালাহারি মরুভূমির মধ্য কালাহারি অভয়ারণ্য অঞ্চলে বড় হয়েছেন সিকেয়ার। এটা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মরু অভয়ারণ্য। সিকেয়ারের পরিবারের মধ্যে তার বাবা সর্বশেষ শিকারজীবী হিসেবে জীবনধারণ করেছেন। তবে ১৯৯৭ সালে মধ্য কালাহারি অভয়ারণ্য থেকে স্যান সম্প্রদায়ের লোকদের অন্যত্র সরিয়ে নিতে শুরু করে দেশটির সরকার। অভয়ারণ্যটি সংরক্ষণ এবং আদিম এই সম্প্রদায়টিকে সমাজের মূল ধারায় নিয়ে আসার উদ্দেশ্যেই এ উদ্যোগ নেয় সরকার।

স্যান সম্প্রদায়কে যেসব গ্রামে পুনর্বাসিত করা হয়েছে সেখানে নিজেদের হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়েছে। সিকেয়ার জানান, স্যান সম্প্রদায়ের শিশুদের স্কুলে নিয়ে গিয়ে নতুন নতুন বিষয়ে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। এতে তারা তাদের ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলতে পারে। কারণ এতদিন শিকারজীবী হিসেবে জীবনধারণ করে আসলেও এখন তাদের জীবনযাপনের অন্য পদ্ধতি শেখানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘যদি ভাষা থেকে শুরু করি, তাহলে বলতে হবে, তারা যদি সেতসোয়ানা (বতসোয়ানার ভাষা) এবং ইংরেজি ভাষা শেখে তবে এক সময় তাদের নিজেদের ভাষা সংকটে পড়ে যাবে।’ বর্তমানে স্যান সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণীরা তাদের মুঠোফোন এবং রেডিওতে আধুনিক সঙ্গীত শুনতেই পছন্দ করে। এভাবে চললে একসময় স্যান সংস্কৃতির প্রধান উপাদান ঐতিহ্যবাহী ‘ট্র্যান্স নাচ’ হারিয়ে যাবে।

তবে সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকলেও এখনো আশা হারায়নি। অনেকেই এখনো তাদের আদিম সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে চান। স্যানদের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোতে গিয়ে আগ্রহীদের নিজেদের সংস্কৃতি সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করেন স্থানীয় বাসিন্দা জোনেট। এছাড়া তাদের পুরনো শিল্প-সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে ‘কুরু আর্ট প্রোজেক্ট’।

এই উদ্যোগের অন্যতম অংশীদার ব্রিটিশ-ক্যারিবীয় শিল্পী অ্যান গলিফার বলেন, স্যান সম্প্রদায়ের শিল্পকর্মে মূলত তারা তাদের হাজার বছরের পুরনো শিকারজীবী জীবনধারা ফুটিয়ে তুলতো। আধুনিক উপকরণ ব্যবহার করে প্রাচীন ঐতিহ্য চিত্রায়নের মাধ্যমে তাদের শিল্পকর্ম সারা বিশ্বে বিক্রি করা হয়েছে বলেও জানান গলিফার।

নিজেদের সংস্কৃতির বিকাশ প্রসঙ্গে সিকেয়ার বলেন, ‘সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল। তবে ইচ্ছা এবং প্রতিজ্ঞার মাধ্যমে এটাকে চাইলে টিকিয়ে রাখা যায়। সংস্কৃতি হচ্ছে তাই, যা আপনাকে নিজেকে চিনতে শেখায়। আমাদের যুবকদের কাজ হচ্ছে বয়স্কদের কাছ থেকে এটা শিখে রাখা, এর বিকাশ ঘটানো এবং সংরক্ষণ করা।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here