প্রাণভোমরা জিইয়ে রাখতে হবে

ড. হারুন রশীদ:বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাত হচ্ছে জনশক্তি রপ্তানি খাত। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তারা তাদের শ্রমলব্ধ অর্থ দেশে পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকাকে আরো গতিশীল করছে। বলতে গেলে জনশক্তি রপ্তানি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার করেছে। বিদেশে বাংলাদেশের এক কোটিরও বেশি লোক কর্মরত। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে প্রাণভোমরার কাজ করছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায় বাঘা বাঘা দেশের অর্থনীতি মার খেলেও বাংলাদেশ বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সক্ষমতা দেখিয়েছে রেমিট্যান্স আয়ের বদৌলতে।
এটা অত্যন্ত ইতিবাচক ঘটনা। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশের জন্য শুধু মূল্যবান অর্থ বয়েই আনছে না, দক্ষ জাঁতি গঠনেও ভূমিকা রাখছে। অদক্ষ যেসব মানুষ বিদেশে কাজের জন্য যাচ্ছে তারা দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হচ্ছে কালক্রমে। কাজ শেষে দেশে ফিরে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাচ্ছে বিভিন্নভাবে। ঘন জনবসতির ক্ষুদ্র আয়তনের এ দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। এ অবস্থায় বিদেশে নিত্যনতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করে ব্যাপক হারে আরো জনশক্তি রপ্তানির পথ উন্মুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করার পথ সুগম করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষকে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চিকিৎসক ও নার্সের কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে অনুযায়ী জনবল পাঠানো যাচ্ছে না। বৈদেশিক কর্মসংস্থানের দায়িত্বে নিয়োজিত বাংলাদেশ ওভারসিস এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) প্রতিষ্ঠার পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চিকিৎসক ও নার্সদের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়। এই সময়ে শুধু সরকারি পর্যায়ে নয়, বেসরকারি পর্যায়েও ডাক্তার-নার্স পাঠানো হতো।
বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, ওমান, কুয়েত, ইরাক, লিবিয়ায় ডাক্তার-নার্সদের কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিককালে সৌদি সরকার সে দেশের স্বাস্থ্য সেক্টরে ব্যাপক বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকা- করছে। ফলে ডাক্তার-নার্স ও অন্যান্য দক্ষ জনশক্তির ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দক্ষ জনশক্তির যে বাজার সৃষ্টি হয়েছে সে সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য অবশ্যই তৎপরতা চালাতে হবে। এতে একদিকে বিদেশে দেশের ডাক্তার-নার্সদের কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও বৃদ্ধি পাবে। আর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন যত বাড়বে দেশের জন্য তা ততই মঙ্গল। সরকার দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির জন্য সারা দেশে ট্রেনিং সেন্টার গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব মেডিক্যাল কলেজ থেকে বছরে পাঁচ হাজার ডাক্তার বের হচ্ছে। পাশাপাশি দেশে হাজার হাজার নার্স বেকার রয়েছে। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে জরুরি ভিত্তিতে ডাক্তার-নার্সদের কর্মসংস্থানে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে মালয়েশিয়ায় রয়েছে বাংলাদেশের একটি বড় শ্রমবাজার। এই বাজার যাতে স্থায়ী বাজারে পরিণত হয় এজন্য বাংলাদেশ সরকারকে কাজ করে যেতে হবে। মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বে যে নতুন সরকার গঠন করা হয়েছে, সেই সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে মালয়েশিয়ায় কলিং ভিসায় কর্মী নেওয়া শুরু করলে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বেসরকারি পর্যায়ে জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বেশি টাকা নেওয়া, দালাল কর্তৃক প্রতারিত হওয়া, মালয়েশিয়ার আউটসোর্সিং কম্পানি কর্তৃক প্রতারণা, চুক্তি অনুযায়ী যথাযথভাবে কাজ না দেওয়া ইত্যাকার নানা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয় একপর্যায়ে।
মালয়েশিয়ায় বিপুল পরিমাণ কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন আছে। কিন্তু তারা চায় অভিবাসন ব্যয় কমাতে। অভিবাসন ব্যয় কমলে মালয়েশিয়ায় যেতে একজন শ্রমিকের সর্বসাকল্যে খরচ হবে ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। খরচ কম হওয়ায় তিন বছরে একজন শ্রমিক তা পুষিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু দালালচক্র বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ হলে অভিবাসন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এতে একজন শ্রমিক বিদেশে যেতে তিন লাখ থেকে চার লাখ টাকা খরচ করে। এই টাকা ওঠাতেই তাদের কয়েক বছর লেগে যায়। তার পরও প্রতারণার ফাঁদ তো রয়েছেই।
বিদেশে শ্রমিকরা গিয়ে অনেক সময় অনেক সমস্যার মধ্যে পড়ে। এজন্য সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় শ্রমিকরা বিপদে পড়েও দূতাবাস কর্মকর্তাদের কোনো রকম সহায়তা পায় না। এতে যে ওই শ্রমিকটি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু তা-ই নয়, দেশও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়। ব্যাপারটি অবশ্যই মাথায় রেখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। এ ছাড়া বিদেশে গিয়ে অনেকেই ইচ্ছা-অনিচ্ছায় নানা রকম অপরাধকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এতে ওই সব দেশে শ্রমবাজার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এজন্য এ ব্যাপারেও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এর সঙ্গে দেশের সুনামের বিষয়টিও জড়িত।
নতুন নতুন শ্রমবাজার যেমন খুঁজে বের করতে হবে, তেমনি বাজার ধরে রাখার জন্যও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আর জোর দিতে হবে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর দিকে। এজন্য প্রয়োজনে দক্ষ শ্রমিক সৃষ্টির জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে আরো জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এই খাত যাতে কিছুতেই কোনো রকম হুমকির মুখে না পড়ে সে ব্যাপারেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
বিদেশে চাকরিপ্রার্থী কেউ যাতে দালাল বা অসাধুচক্র কিংবা সরকারি কোনো কর্মী দ্বারা কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়ে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। যেখানে চাকরিপ্রার্থী, সেখানেই অবৈধ অর্থের লেনদেনÑপ্রচলিত এই কুসংস্কৃতির বেড়াজাল থেকে আমাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। জনশক্তি রপ্তানির যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পাশাপাশি তাই দুর্নীতি মাথাচাড়া দেওয়ার সব ফাঁকফোকরও বন্ধ করতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে কোনো শৈথিল্য, অব্যবস্থা, অসাধুতা ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে তার বা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here