চাল আমদানিতে শুল্ক

সম্পাদকীয়

দেশে চাল আমদানিতে নতুন করে ২৮ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিষয়টি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। সোমবার সচিবালয়ে ইইউর রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। উল্লেখ্য, গত বছর হাওড় অঞ্চলে অকাল বন্যা ও পাহাড়ী ঢলে ব্যাপক ফসলহানি এবং মধ্যাঞ্চলে অতি বৃষ্টিতে চিটা ধরে যাওয়ায় ধান উৎপাদন ব্যাহত হয়। বোরো আবাদ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারী গুদামে ঘাটতি থাকায় বাজারে চালের দাম বেড়ে যায় হু-হু করে। এতে অবশ্য চাতাল মালিক, ধান-চালের ব্যবসায়ী এবং আমদানিকারকদের কারসাজিও কম ছিল না। ফলে বাধ্য হয়ে দেশের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা চিন্তা করে সরকারকে দু’দফায় চালের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করতে হয়। মওকা বুঝে আমদানিকারকরাও চাহিদার তুলনায় ৮-১০ গুণ বেশি চাল আমদানি করে। উল্লেখ্য, গত বছর ১০ লাখ টন চাল উৎপাদন কম হয়েছিল। বিপরীতে এবার দেশে বাম্পার উৎপাদন হয়েছে। একদিকে বিপুল আমদানি অন্যদিকে প্রচুর উৎপাদন। ফলে চালের বাজার পড়তির দিকে। বাজারে বর্তমানে মোট চালসহ সব ধরনের চালের দাম কমেছে। ফলে কৃষকের ধান-চালের ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে রীতিমতো আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাজারে আপাতত ধান-চালের দাম কম থাকায় চাতাল মালিক, ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনছে না, সরকার ধান-চালের বেশি দাম বেঁধে দিলেও। এ অবস্থায় চাল আমদানিতে শুল্ক আরোপ করা হলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হতে পারে।
সত্যি বলতে কি, গত কয়েক বছর ধরেই দেশে ধান-চালের বাজারে একটা স্বস্তি ও স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছিল। দেশ খাদ্য উৎপাদন বিশেষ করে ধান-চাল উৎপাদনে হয়ে উঠেছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। এমনকি উদ্বৃত্ত কিছু পরিমাণ চাল বিদেশে রফতানিও হয়েছে। চালের দাম কম থাকায় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত এমনকি দিনমজুররা বেশ স্বস্তিতেই ছিলেন। কিছু ক্ষেত্রে বরং ধানের দাম কম থাকায় বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে কৃষককে। এ অবস্থায় সরকার কৃষককে স্বস্তি দিতে ধান-চালের সংগ্রহ মূল্যও বাড়িয়েছে সময় সময়। অবশ্য মধ্যস্বত্বভোগী, আড়তদার ও চাতাল মালিকদের দৌরাত্ম্য ও দাপটে মূল্যবৃদ্ধির এই সুফল শেষ পর্যস্ত কৃষকের ঘরে পৌঁছতে পারেনি। যা হোক, কৃষকরা যাতে দুটো পয়সা পায় তা নিশ্চিত করতে সরকার চাল আমদানির ওপর শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
বর্তমান বাজারে চালের অভাব নেই। মধ্যস্বত্বভোগী চাতালের মালিক, মজুদদার, আড়তদারসহ বাজারের ছোট-বড় ব্যবসায়ীদের কাছে চালের মজুদ যথেষ্ট ও সন্তোষজনক। বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আমদানিকারক, ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মনে রাখতে হবে যে, ধান-চালের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে নয়, বরং যুক্তিসঙ্গত মূল্যবৃদ্ধির দিকে নজর দেয়া বাঞ্ছনীয়। সরকারকেও বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে।
দেশ এখন খাদ্য উৎপাদনে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, বরং উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যে ভরপুর। প্রতি বছর সাড়ে ১২ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে জনসাধারণের দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা মিটিয়েও। বাংলাদেশের খাদ্যশস্য উৎপাদনে এই সাফল্যের প্রশংসা করা হয়েছে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকেও। বিশেষ করে নিম্ন আয়ভুক্ত দরিদ্র শ্রেণীর জন্য সরকার ১০ এবং ১৫ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির ব্যবস্থা করেছে। বিশ্বে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। আরও উন্নতমানের প্রযুক্তি, বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ইত্যাদি ব্যবহার করে এই উৎপাদন আরও বাড়ানো যায়। তবে তা না করে এখন বরং নজর দেয়া উচিত বিভিন্ন ও বহুমুখী খাদ্যশস্য উৎপাদন এবং সংরক্ষণে। সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো সব মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা। আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদেরও উচিত হবে জনসাধারণ ও সরকারকে জিম্মি কিংবা কারসাজি করে নয়, বরং আস্থায় নিয়েই ব্যবসা করা। পাশাপাশি কৃষকদের ধান-চালসহ উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here