আগুনে পুড়েছে শরীর, স্বপ্ন নয়

নিউজ ডেস্ক : মাত্র দুই বছর বয়সে ভয়াবহ আগুনের লেলিহানে পুরো শরীর পুড়ে যায় লিন্ডার। বাড়ির একটি হিটার হঠাৎ করেই বিস্ফোরিত হয়। সে ও তার বড় বোন সেই অগ্নিকান্ডে মারাত্মকভাবে আহত হন। তখনই চিকিৎসক লিন্ডার মাকে বলেছিলেন, এ ধরণের থার্ড ডিগ্রী অর্থ্যাৎ মারাত্মক পুড়ে যাওয়া শিশুর সঠিক বিকাশ কখনও সম্ভব নয়। সে কখনও আর পাঁচজন সুস্থ শিশুর মত গুণাগুণ নিয়ে বড় হতে পারবে না। তার প্রতিভায় ভাটা পড়বে। তবে চিকিৎসকদের সব ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে লিন্ডার প্রতিভা ও কর্মদক্ষতা। আর তাইতো লিন্ডা রোয়ে থমাস বর্তমান সময়ের একজন সফল ও স্বণামধন্য ফ্যাশন ডিজাইনার। তার ডিজাইনকৃত পোশাক উইমেন ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশন (ডাব্লউএএনবিএ) চ্যাম্পিয়ন ক্যান্ডিস উইগিনস পর্যন্ত গায়ে জড়িয়েছেন গোল্ডেন গ্লোবের জন্য।

আরকানসাসের জ্যাকসনভিলে বসবাসকারী ৪৮ বছর বয়সী লিন্ডা বলেন, ‘আমি তখন মাত্র দু’বছরের ছিলাম তাই অগ্নিকান্ডের ঘটনাটি তেমনভাবে মনে নেই। শুধু মনে আছে আমি ও আমার বড় বোন হিটারের পাশে ছিলাম। সেই দূর্ঘটনার পাঁচ দিন পর আমার বোন মারা যায়।আমি এখনও বড় বোনের মুখটি মনে করতে পারি না।আর আমার শরীর মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। আমার দুটি হাতের প্রায় সব আঙ্গুলগুলো অক্ষম হয়ে যায়।’

‘আমার মা বলেন ছোটবেলা থেকেই আমি ফ্যাশন প্রিয় ছিলাম। নিজেই পছন্দমাফিক পোশাক পরতাম। ঘটনার দিন সকালে নিজেই একটি হুডিওয়ালা ওভারকোট পড়েছিলাম। যার ফলে আগুন আমার শরীরের ভেতরে সেভাবে প্রবেশ করতে না পারলেও আমার মুখ হাতের নখসহ পা পুড়ে যায়। আমি মজা করেই মাঝে মাঝে মা কে বলি, ওই কোটটি পড়েছিলাম বলেই হয়ত আমি প্রাণে বেঁচেছি।’

লিন্ডা অগ্নি দূর্ঘটনায় তার বাম হাতের সবগুলো আঙ্গুল হারিয়েছেন। আর ডান হাতের আঙ্গুলোও পুড়ে অক্ষম হয়ে যায়। সেসময় হিটারের দিকে মুখ থাকার কারণে আগুনের লেলিহান শিখা তার মুখে এসে পড়ে। অর্থাভাবে তখন লিন্ডার চেহারার প্লাস্টিক সার্জারি করাও সম্ভব হয়নি। ২০ বছর পর তার শরীরের পোড়া অংশগুলোর অস্ত্রোপচোর করা হয়। ছোটবেলা থেকেই লিন্ডার ছবি আঁকার প্রতিভা ছিলো। হাতের আঙ্গুলোর জন্য ঠিকভাবে আঁকাতে না পারলেও দমে যায়নি সে। বরং বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে ছবি আঁকা আয়ত্তে আনার চেষ্টা করেছেন। আর সেই প্রতিভাটিই তার ভবিষ্যত সম্ভাবণাকে উজ্জ্বল করেছে।

লিন্ডা জানান, ‘আমি কখনও নিজেকে পোড়া ব্যাক্তি হিসেবে ভাবতে পারিনি। অর্থের সীমাবদ্ধতা থাকায় আমার আমার পরিবার চিকিৎসা পর্যন্ত করাতে পারেনি। আমার যখন পাঁচ বছর বয়স তখন প্রায়ই মাকে সেলাই করতে দেখতাম। সে একজন খুবই দক্ষ দর্জি। আমি খেয়াল করে দেখতাম সে কিভাবে কাজটি করে। আমার উৎসাহ দেখে মা আমাকে সেলাই সম্পর্কিত ছোট ছোট বিষয়গুলো শেখানো শুরু করেন। আমার ডান হাতটি বেশ কার্যকরী। কিন্তু বাম হাত দিয়ে কাজ করতে কষ্ট হয়। তবুও আমি হাতটি দিয়ে নিজের মত করে কাজ করতে পারি।’

মায়ের কাছ থেকে সেলাই দক্ষতা অর্জন করার পর লিন্ডা অবশেষে তার নিজের ফ্যাশন লাইন শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘আমি যেকোন জায়গা থেকে ফ্যাশনের অনুপ্রেরণা পেয়ে থাকি। কোন মার্কেটে ঘুরতে গেলে কিংবা বীচে গেলে অন্যান্যদের পোশাক সেন্স দেখে এমনকি ভিন্ন ফেব্রিক দেখেও আইডিয়া পেয়ে যায়। আমি মূলত ক্ল্যাসিক ও কনটেম্পরারি ঘরানার ডিজাইন করতে পছন্দ করি। ছোটবেলা থেকেই আমি জ্যাকিও কে পছন্দ করি।’

এই ডিজাইনারের পোশাক পরপর সাতবার নিউইয়র্ক ফ্যাশন সপ্তাহে প্রদর্শন হয়েছে। এবং তার ডিজাইকৃত পোশাকগুলো বেইট অ্যাওয়ার্ডস সহ গোল্ডেন গ্লোব এবং এরিকা এশে অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠনেও ব্যবহৃত হয়েছে। এ বিষয়ে লিন্ডা বলেন, ‘আমার টার্নিং পয়েন্ট ছিলো যখন কেউ একজন আমার শো দেখে এসে বলেছিলেন ‘হেই, আমি নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইকের জন্য আপনাকে একজন প্রযোজক হিসেবে পরিচয় করাতে চাই।’ তিনি আরো বলেন, ‘গোল্ডেন গ্লোবের জন্য পোশাক ডিজাইন করা আমার জন্য সত্যিই গর্বের। লাল গালিচায় আমার ডিজাইনকৃত পোশাক পরে যখন সেলিব্রিটিরা হাঁটে তখন সত্যিই আমার অনেক গর্ব হয়। আমার স্বপ্ন ছিলো এটি।’

লিন্ডার সবচেয়ে বড় ভক্ত তার দুই সন্তান অ্যামারি ও জ্যাকারিয়া। তারা দু’জনই তাদের মাকে নিয়ে গর্ববোধ করে। অ্যামারি বলেন, ‘আমি কখনও দেখিনি যে আমার মা কোন কাজকে অবহেলা করেছেন। ঘর ও ঘরের বাইরে সমানভাবে কাজ করেন তিনি। ‘পারবা না’, ‘হবে না’ কিংবা করব না’ এই ধরণের শব্দগুলো কখনও তার মুখে শুনিনি। যদিও তিনি সবসময় ব্যবস্ত থাকেন তবুও সে আমাদেরকে ঠিকই সময় দেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তিনি তার সময়গুলো উৎসর্গ করেন তার কাজে। মা লিন্ডায় কন্যা অ্যামারির অণুপ্রেরণা উৎস। তিনি বলেন, ‘মাকে দেখে আমি শিখছি কিভাবে জীবনে সবকিছু জয় করতে হয়।’

লিন্ডা স্বীকার করেন যে তিনি এখনও বিভিন্ন মানষের কাছ থেকে কটূক্তি শুনে থাকেন। কিন্তু সে কখনও অপমানবোধ করেন না বরং এগুলোকে আলিঙ্গন করে নিজেকে আরো ভালো করে প্রস্তুত করার চেষ্টায় ব্যস্ত থাকেন। তিনি বলেন, ‘রাস্তায় বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে আমি বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। তারা যে বাজে শব্দগুলো ব্যবহার করে সে শব্দগুলো কিন্তু মনে রয়ে যায়। চাইলেও ভুলে থাকা যায় না। বিগত বছরগুলোতে আমি আরও বেশি আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছি।

আমি আয়নায় নিজেকে দেখি এবং আমার আমিকেই ভালোবাসি। আমার রুপ নিয়ে যে যা-ই বলুক না কেন আমি নিজেকে ভালোবাসি। আমার সন্তানরা আমাকে ভালোবাসে। মানুষের রুপ নয় বরং গুণ আসল। আর সেটি আমি সবাইকে প্রমাণ করে দিয়েছি। অগ্নি দূর্ঘটনাটির পর ডাক্তার আমার মাকে বলেছিলেন আমি হয়তবা আর পাঁচ জন স্বাভাবিক মানুষের মত কাজ করতে পারব না। কারণ আমার একটি হাত অকোজো হয়েছিলো। অবাক করার বিষয় এই যে, আজ এই দু’হাত অসাধারণ কাজ করছে।’

সূত্র: http://www.barcroft.tv/burns-survivor-fashion-designer-celebrities-clothes

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here