সড়কপথে ‘মানুষ হত্যা’ বন্ধে নাগরিক সমাজের ২১ দফা

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ দুর্ঘটনার নামে সড়কপথে ‘মানুষ হত্যা’ বন্ধ, হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা, নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতসহ ২১ দফা দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজ।

শুক্রবার (৩ আগস্ট) রাজধানীর শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনের সড়কে নাগরিক সমাজের ও ৩২টি সংগঠন এ সমাবেশ করে।

নাগরিক সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ সড়কপথ এখন এক আতঙ্কের নাম। বিরাট উদ্বেগের মধ্যে নিপতিত সারা দেশ। অব্যাহতভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় ছাত্র-শিক্ষকসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ মারা যাচ্ছে। একে দুর্ঘটনা না বলে ‘হত্যা’ বলাই সঙ্গত। অদূর ভবিষ্যতে এ মৃত্যুর মিছিল থামার কোনও সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।

তারা বলেন, গত ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলা এলাকায় রেষারেষিতে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস অপেক্ষমান কলেজ শিক্ষার্থীদের ওপর তুলে দেয় চালক। ঘটনাস্থলে মারা যায় রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী আব্দুল করিম ও দিয়া খানম মীম। দুটি বাসের হিংস্র প্রতিযোগিতার এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে।

বক্তারা আরও বলেন, এখন নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন কিনা তা কেউই জানেন না। কয়েকদিন আগে চট্টগ্রাম থেকে আসার সময় দুর্ঘটনায় আহত নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম সেমিস্টারের ছাত্র পায়েলকে চিকিৎসা দেয়ার বদলে পানিতে ফেলে মেরেছিল পরিবহন কর্মীরা। গত মে মাসে বাপা’র অফিস ও কর্মসূচি ব্যবস্থাপক উত্তম কুমার বেবনাথ বেপরোয়া গাড়ির নিচে পিষ্ট হয়ে মৃত্যু বরণ করেন। এভাবেই প্রতিদিন ঘটছে বিয়োগান্তক সব ঘটনা।

তারা অভিযোগ করে বলেন, সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারীদের অধিক মুনাফা প্রীতি ও পরিবহন নৈরাজ্য এই অবস্থার জন্য দায়ী। স্বল্প সময়ে অধিক উপার্জনের উদ্দেশ্যে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সদা ব্যস্ত। এ কাজে শ্রমিকদের ব্যবহার করা হলেও তারা সুবিধা বঞ্চিত। সব মিলে দুষ্টুচক্র আমাদের পেছন দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি বেসরকারি কর্তৃপক্ষের দায়সারা উদ্যোগ, দুর্নীতি, উদাসীনতা, উপেক্ষা সব সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী মুনাফাখোরী মনোভাবই এই অবস্থা দৃষ্টির জন্য দায়ী।

নাগরিক সমাজের উত্থাপিত ২১ দফা দাবি:
১. নিহতদের পরিবার এবং আহতদের চিকিৎসাসহ ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।
২. দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে।
৩. সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
৪. শিক্ষার্থীদের নিরাপদে যাতায়াতের জন্য প্রতিটি কমিউনিটিতে সমমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করতে হবে; যাতে প্রতিদিনই তাদের প্রধান সড়ক পার হতে না হয়।
৫. চলমান আন্দোলনে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।
৬. মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ এর যুগোপযোগী সংশোধনী ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
৭. পথচারী ও অযান্ত্রিক যানে নিরাপদে চলাচলের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
৮. উল্টোপথে গাড়ি চালানো বন্ধ করতে হবে।
৯. যথাযথভাবে ও দুর্নীতিমুক্ত প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান সড়কপথ পরিচালনা ও মেরামত করতে হবে।
১০. ভুয়া লাইসেন্সধারী চালকদের নিষিদ্ধ ও শাস্তি প্রদান এবং হেলপারদের দিয়ে হাড়ি চালানোয় সাজার বিধান চালু করতে হবে।
১১. পরিবহন মালিকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং অপরাধের ভিত্তিতে শাস্তির বিধান চালু করতে হবে।
১২. ক্রটিযুক্ত ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল বন্ধ করতে হবে; এ বিষয়ে ব্যর্থ বা অনাগ্রহী ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
১৩. গাড়ি চালকদের ট্রিপের পরিবর্তে মাসিক বেতনে নিয়োগের ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
১৪. সড়ক ব্যবহারকারী সকলের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
১৫. যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।
১৬. বিআরটিএ’কে দালাল ও দুর্নীতিমুক্ত এবং কার্যকর করতে হবে।
১৭. রেল ও নৌ ব্যবস্থার আধুনিকায়ল ও সম্প্রসারণ করতে হবে এবং সড়ক নির্ভরতা কমাতে হবে।
১৮. প্রশিক্ষিত, দক্ষ চালক তৈরি করতে প্রতিটি জেলায় প্রশিক্ষণ একাডেমি চালু করতে হবে।
১৯. যাত্রী, যানবাহনের মালিক, চালক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সকলের সহযোগিতায় সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২০. পেশাদার চালকের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে মালিকপক্ষ থেকে নিয়োগপত্র প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং
২১. পরিবহন ব্যবস্থা মনিটরিং করার জন্য নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি সমন্বয়ে স্থানীয় ভিত্তিক তদারকি কমিটি গঠন করতে হবে।

নাগরিক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন- ফক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভায়রনমেন্ট সভাপতি অধ্যাপক আবু সাঈদ, নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরামের সভাপতি হাফিজুর রহমান, জনকল্যাণ সংস্থার শিবলী আনোয়ার, সিপিডি’র সিনিয়র ফেলো ড মোস্তাফিজুর রহমান, নারী গ্রন্থ প্রবর্তনা’র সভানেত্রী ফরিদা আক্তার, পুরান ঢাকা পরিবেশ উন্নয়ন ফোরামের আহবায়ক মো, সেলিম, সচেতন নগরবাসি’র সভাপতি জি এম রস্তম আলী, বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল হাবিব, বেসরকারি সংস্থা ‘ব্রতী’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শারমীন মুরশিদসহ প্রমুখ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here