সিনিয়রদের কাঁধে ভর করে আর কতো?

নিউজ ডেস্কঃ মাশরাফি, তামিম, সাকিব, মুশফিক আর মাহমুদউল্লাহ, বাংলাদেশ ক্রিকেটের পঞ্চ পাণ্ডব বলেই তাদের আমরা জানি। প্রায় এক যুগ থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট এই পঞ্চ পাণ্ডবদের কাঁধে ভর করে এগিয়ে যাচ্ছে। তারাও তাদের সর্বোচ্চ দিয়ে যাচ্ছে দলের জন্য। কিন্ত পশ্ন হলো সিনিয়ররা খেলা ছেড়ে দিলে কি বাংলাদেশে ক্রিকেট থেমে যাবে? তারা তাদের সৃষ্টি করা সকল ইতিহাস কে বিলীন হতে দেখবে? কি হবে এর উত্তর?

এই পঞ্চপাণ্ডবের জায়গা খালি করে দিলে তাদের জায়গা দখল করার মত আর কোন পাণ্ডব কি তৈরি হয়েছে? পাইপ লাইনে যারা আছে বা জুনিয়রদের পারফরমেন্স কিন্তু তা বলে না। দল জেতার জন্য রান যা করার সিনিয়ররাই করেন। বেশি উইকেটও ঘুরে ফিরে তারাই নেন। তরুণদের পারফরমেন্স খারাপ, তারা যে দলের সাফল্যে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারছেন না সেটাও সবার জানা।

বর্তমানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের দিকে তাকালেই ব্যাপার টা অনেকাংশে ক্লিয়ার হয়ে যাবে। টেস্টে মহা বিপর্যয়ের পর মাশরাফির হাত ধরে প্রথম ওয়ানডেতে জয় পায় লাল-সবুজের জার্সিধারীরা। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ও জয়ের কাছে গিয়ে তরী ডুবে টাইগারদের। চার রানে না হারলে ওই ম্যাচেই সিরিজ নিশ্চিত হতো বাংলাদেশের। তৃতীয় ম্যাচ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো না টাইগারদের। শেষ পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচে টাইগাররা জয় পেয়েছে ১৮ রানে। এই জয়ের ফলে টাইগাররা ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতে নিল।

বিদেশের মাটিতে দীর্ঘ নয় বছর পর সিরিজ জয়ের অবসান ঘটল মাশরাফি বাহিনীর। এর আগে ২০০৯ সালে জিম্বাবুয়ের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। পাঁচ ম্যাচের ওই সিরিজটি বাংলাদেশ জিতেছিল ৪-১ ব্যবধানে। এ ম্যাচেও জয়ের কান্ডারী সেই পঞ্চ পাণ্ডব।

গায়ানার প্রোভিডেন্স স্টেডিয়ামে স্বাগতিক উইন্ডিজকে ৪৮ রানে হারিয়ে জয়ের পথ খুঁজে পায় টাইগাররা। কিন্তু এই জয়ও আসে সিনিয়রদের কাঁধে ভর করে। এ সাফল্য পঞ্চ পান্ডবের মধ্যে চার সিনিয়র তামিম, সাকিব, মুশফিক ও মাশরাফির ডানায় উড়ে আসা।

সংক্ষেপে ম্যাচের অবস্থা ছিল এমন টস জিতে আগে ব্যাট করা বাংলাদেশ করেছে ২৭৯ রান। যার প্রায় ৯০ শতাংশ স্কোর মানে ২৫৭ রানই এসেছে তিন সিনিয়র তামিম (১৩০*), সাকিব (৯৭ ) ও মুশফিকের (৩০) ব্যাট থেকে। মাত্র একটি বল খেলার সুযোগ পাওয়া পঞ্চ পান্ডবের আরেক সদস্য মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ শেষ বল খেলে বাউন্ডারি হাঁকিয়েছেন। তার মানে ১ বলে তার সংগ্রহ ৪। সব মিলে ২৬১। বাকি ১৮ রান এসেছে অন্য খাত থেকে। যার মধ্যে ১৫ রান আসে (লেগবাই ৭,ওয়াইড ৮) অতিরিক্ত।

বাকি যে দুই ব্যাটসম্যান ব্যাট করার সুযোগ পেয়েছেন, সেই ওপেনার এনামুল হক বিজয় (০) আর মুশফিকুর রহীমের আগে চার নম্বরে প্রমোশন পাওয়া সাব্বির রহমান রুম্মন (৩)। এই দুইজনের সংগ্রহ মোটে ৩। ওপেনার এনামুল হক বিজয় দ্বিতীয় ওভারে শূন্য রানে ফেরত যাওয়ায় শুরুতেই বিপর্যয়। সে অনিশ্চিত যাত্রা ও ধাক্কা সামলে দেন দুই সিনিয়র তামিম ও সাকিব। দ্বিতীয় উইকেটে তাদের জুড়ে দেয়া ২০৭ রানের বিশাল জুটিতেই গড়ে ওঠে লড়াকু পুঁজির ভিত। শেষ দুই ওভারে ওঠে ৪৩ রান। এর মধ্যে ৩৪ রান করেন মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ। বোলিংয়েও ঘুরে ফিরে সেই বড়দের বড়ভাই মাশরাফি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ৩৭ রানে ৪ উইকেট শিকারী টাইগার অধিনায়ক।

দ্বিতীয় ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ৩ রানের আক্ষেপ থেকে গেছে। স্বাগতিকরা টস হেরে ব্যাট করতে নেমে ২৭২ রানের লক্ষ্য ছুড়ে দেয় টাইগারদের সামনে। কিন্তু টাইগাররা ২৬৮ রানেই সব বল শেষ করে হার মেনে নেয়। এই ম্যাচ হারলেও ত্রাতা ছিল সেই পঞ্চ পাণ্ডবই। তামিম ৫৪, সাকিব ৫৬, মুশফিক ৬৮ রানের ইনিংস খেলেন। এ ম্যাচে তিনটা অর্ধশত আসে, তাও সিনিয়রদের হাত দিয়ে। মাহমুদউল্লাহ ৩৯ রানের একটা ভালো ইনিংস উপহার দেয়। যদিও শেষ পর্যন্ত ভাগ্যের কাছে হার মেনে নিতে হয়েছে টাইগারদের।

সেইন্ট কিটসে তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। এরপর তামিমের সেঞ্চুরি (১০৩), রিয়াদের হাফ সেঞ্চুরি (৬৭*, ৪৯ বলে), মাশরাফির ঝড়ো ইনিংসে শেষ এক দিনের ম্যাচে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ছয় উইকেটে ৩০১ রানের বড় স্কোর গড়ে বাংলাদেশ। ওয়ানডেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের এটি সর্বোচ্চ স্কোর।

বাংলাদেশের দেয়া ৩০২ রানের জয়ের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ছয় উইকেট হারিয়ে ২৮৩ রান সংগ্রহ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে মাশরাফি বিন মুর্তজা ২টি, মেহেদী হাসান মিরাজ ১টি, মোস্তাফিজুর রহমান ১টি ও রুবেল হোসেন ১টি করে উইকেট শিকার করেন। বাংলাদেশ পায় সিরিজ জয়ের স্বাদ। আর এই সিরিজ জয়ে মূল ভূমিকা পালন করেন পঞ্চপাণ্ডবের সেনাপতি মাশরাফি বিন মর্তুজা ও প্রধান সহযোগী তামিম ইকবাল।

ডেইলি বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য সিনিয়র ও জুনিয়রদের পারফরমেন্সের একটা ধারনা তুলে ধরা হলো :

প্রথমেই পাঁচ সিনিয়র ক্রিকেটারের সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান দেয়া হলো।

মাশরাফি বিন মর্তুজা

শুরুটা পঞ্চ পাণ্ডব অধিনায়ক মাশরাফিকে দিয়েই হোক। টাইগার অধিনায়কের নেতৃত্বগুণের কথা কার না জানা। ওয়ানডে দলের বড় সম্পদ মাশরাফির গতিশীল, সাহসী, বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্ব। পুরো দলকে এক সুতোয় গেঁথে ভাল খেলতে উদ্বুদ্ধ করার কাজটি খুব ভাল পারেন, জানেন। তাই দেশে ও বিদেশে সবার চোখে মাশরাফি আদর্শ অধিনায়ক।

অধিনায়কের পর এবার বোলার মাশরাফি ক্যারিয়ারের স্বর্ণ সময় পিছনে ফেলে এসেছেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে কয়েক বছর ১৪০ কিলোমিটার গতিতে বল করা মাশরাফি সাত-আট বারের অপারেশনের ধকল সামলে এখন জেন্টল মিডিয়াম হয়ে গেছেন। মধ্য তিরিশে গিয়ে এখন অনেক গতি কমিয়ে লাইন-লেন্থ আর বুদ্ধি খাটিয়ে বল করেন। তারপরও শেষ ২৩ ওয়ানডেতে বল হাতে তিনি দখল করেছেন ৩০ উইকেট। পরিসংখ্যানে ২৩ ম্যাচ থাকলেও বাস্তবে ১৬ ম্যাচে ৩০ উইকেট পেয়েছেন। কারণ, সাত ম্যাচে ছিলেন উইকেটশূন্য। চার উইকেট শিকার করেছেন দুইবার। তিন উইকেট পেয়েছেন একবার। আর ছয়বার দুই উইকেট জমা পড়েছে নড়াইল এক্সপ্রেসের পকেটে।

ব্যাট হাতে আলো ছড়াতে না পারলেও গত ১৭ ইনিংসে তিনটি বড় স্কোর আছে মাশরাফির। প্রথমটি ৪৪ (২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর শেরে বাংলায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২৯ বলে)। আর দ্বিতীয়টি গত বছর ১৫ জুন বার্মিংহামে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ২৫ বলে অপরাজিত ৩০ রান। ২০১৮ তে এসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ জয়েওর ম্যাচে ২৫ বলে ৩০ রানের একটা ইনিংস খেলে সিরিজ জয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন ওয়ানডে অধিনায়ক। এ ছাড়া এ বছর চার ইনিংস ব্যাট করার সুযোগ পাওয়া মাশরাফির সংগ্রহ মাত্র (৬+০+১+৫) = ১২ রান।

তামিম ইকবাল

দলের এক নম্বর ব্যাটসম্যান পঞ্চ পান্ডবের অন্যতম সদস্য, তামিম ইকবাল শেষ চার বছর ক্যারিয়ারের সেরা সময় কাটাচ্ছেন। তামিম এখন অনেক পরিণত, অনেক ধীরস্থির। তেড়েফুঁড়ে বাহারি শটস খেলার চেয়ে দায়িত্ববোধটাই এখন তার প্রথম লক্ষ্য। এভাবে খেলা শুরু করেছেন সেই ২০১৫ সাল থেকে। ওই বছরের ১১ নভেম্বর থেকে শেষ ৩১ ওয়ানডেতে তামিমের ব্যাটে রানের নহর বইছে। ছয় সেঞ্চুরি আর ১১ হাফ সেঞ্চুরিসহ ১৭৯৫ রান করেছেন তামিম। ছয়টি শতরান ছাড়া গত বছর ৫ জুন ওভালে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপেক্ষ একা লড়ে (১১৪ বলে ৯৫ রান) প্রায় শতরান করে ফেলেছিলেন। এছাড়া আরও ছয়টি (৮০, ৮৪, ৮৪ এবং ৭৩, ৭০ ও ৭৬) বিগ ফিফটিও আছে এ বাঁ-হাতি ওপেনারের। ২০১৮ তে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে নিজেকে মেলে ধরেছেন তামিম। সিরিজ জয়ের মূল ভূমিকা পালন করেন তিনি। প্রথম ওয়ানডেতে অপরাজিত ১৩০ রান। দ্বিতীয়তে ৫৪ রান ও সিরিজ জয়ের ম্যাচে ১০৩ রানের বড় স্কোর উপহার দেন দলকে।

সাকিব আল হাসান

এবার বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের পারফরমেন্সের দিকে একটু তাকাতে পারি। এ বাঁ-হাতি স্পিনার ২০১৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর ক্রাইস্টচার্চে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা ম্যাচ থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২৪ ম্যাচে ২২ উইকেট শিকার করেছেন। এ সময়ে পাঁচ ও চার উইকেট পাননি একবারও। তবে ৩ উইকেট আছে ৪ বার। সেরা বোলিং ৩/৩৪। ব্যাট হাতে ২০১৭ সালের ৯ জুন কার্ডিফে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে (১১৫ বলে ১১৪) সেঞ্চুরিসহ আরও নয়বার পঞ্চাশের ঘরে পা রেখে শেষ ২৪ ম্যাচে সাকিবের রান ৯৫৯। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরির কাছে গিয়ে ৯৭ রান করে ফিরতে হয়েছে তাকে। দ্বিতীয় ম্যাচে ৫৬ ও শেষ ম্যাচে ৩৭ রান করেন।

মুশফিকুর রহিম

ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট এ জয় এনে দেওয়া ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ মুশফিকও কম যাননি। ধারাবাহিকভাবে ভাল খেলে দলের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন প্রায় নিয়মিত। ২০১৬ সালের ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ৬২ বলে ৬৭ রানের হার না মানা ইনিংসসহ শেষ ২৪ ইনিংসে মুশফিকের রান ৮৪৯। এ সময় তার ব্যাট থেকে এসেছে ৭টি হাফ সেঞ্চুরি। একটি শতরানও (২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবর, কিম্বার্লিতে ১১৬ বলে ১১০) আছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে ও সে একটা অর্ধশত রানের মালিক।

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ

পঞ্চ পান্ডবের পাঁচ নম্বর সদস্য মাহমুদউল্লাহর রিয়াদের সময়টা তেমন ভাল যাচ্ছে না। ক্যারিয়ারের সূর্য্য এখন আর সেভাবে আলো ছড়াচ্ছে না। তারপরও ২০১৭ সালের ৯ জুন কার্ডিফে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ১০৭ বলে ১০২* রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে সাকিবের সাথে দলের ঐতিহাসিক জয়ে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর ঢাকার শেরে বাংলায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৮৮ বলে ৭৫ রান থেকে শেষ ২৫ ইনিংসে ১ সেঞ্চুরি ও ৪ হাফ সেঞ্চুরিসহ মোট রান ৬৬৮। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজেও ৬৭ রানের একটা বড় ইনিংস উপহার দিয়েছেন দলকে।

এবার সিনিয়রদের পরে জুনিয়রদের পারফরমেন্সের দিকে একটু খেয়াল করলেই পার্থক্যটা চোখের সামনে চলে আসবে।

এনামুল হক বিজয়

প্রথমেই এনামুল হক বিজয়কে দিয়ে শুরু করা যাক। শুরুটা দেখে মনে হইয়েছিল রেসের তেজি ঘোড়া। হয়তো বাংলাদেশ নতুন কোন বোমা পেল। প্রথম ১৮ ইনিংসে তিন তিনবার তিন অংকে পা রাখা বিজয়কেই ভাবা হচ্ছিল সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তামিমের যোগ্য সঙ্গী। কিন্তু হায়! সেই এনামুল বিজয় যেন নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন। সময় যত গড়াচ্ছে ততই কেমন যেন চুপসে যাচ্ছেন তিনি। খারাপ ফর্মের কারণে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের পর প্রায় তিন বছর দলের বাইরে ছিলেন। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মেলবোর্নে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আইসিসি বিশ্বকাপে ৪৩ বলে ২৯ রান করার ৩৫ মাস পর আবার সুযোগ পান এ বছর, মানে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। ঘরের মাঠে ওই তিন জাতি ক্রিকেটে সুযোগ পেয়েও কিছু করতে পারেননি। চার ম্যাচে তার ব্যাট থেকে আসে (১৯+৩৫+১+০) ৫৫ রান এবং সবশেষ তিন ইনিংসের অবস্থা খুবই খারাপ ১, ০ এবং ০। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেও আউট হয়ে গেছেন ০ রানে। তবে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৯ বলে ২৩ রানের একটা ঝড় ইনিংস খেলেছেন। আর শেষ ম্যাচেও মাত্র ১০ রান করে সাজঘরে ফিরে যান তিনি।

সাব্বির রহমান রুম্মন

এরপর পর্যায়ক্রমে সাব্বির রহমান রুম্মনের প্রসঙ্গ চলে আসে। সবার ধারনা ছিল, রাজশাহীর এ ড্যাশিং উইলোবাজ হবেন মিডল অর্ডারের বড় স্তম্ভ। উইকেটে গিয়ে সেট হতে সময় লাগে কম। উইকেটের সামনে ও দুইদিকে প্রায় সব শট খেলতে পারেন। অনায়াসে অবলীলায় বিগ হিট নিতে পারেন। চার বছর আগে ২০১৪ সালের ২১ নভেম্বর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেকে তেমন সাব্বিরের দেখাই মিলেছিল। ২৫ বলে সমান তিনটি করে বাউন্ডারি ও ছক্কা হাকিয়ে ৪৪ রানের হার না মানা ইনিংস খেলে সাব্বির জানান দিয়েছিলেন ঝড়ো উইলোবাজিটা আমি ভালই পারি। কিন্তু তিনিও নিজেকে কোথায় যেন হারিয়ে খুঁজছেন। তার ব্যাটের তেজ কমেছে বিস্ময়করভাবে। ২০১৭ সালের ২৪ মে ডাবলিনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৬৫ রানের ইনিংসটিই শেষ। এরপর আর পঞ্চাশের ঘরে পা রাখা সম্ভব হয়নি। এ বছর মানে ২০১৮ সালে সাব্বিরের অবস্থা আরও খারাপ। শেষ আট ওয়ানডেতে একদমই অনুজ্জ্বল (২৪+৬+১০+২+৩+১২+১২+৩ = ৭২ রান)। আর তারপরও একেরপর এক বিতর্কের জন্ম দিয়ে চলেছেন তিনি।

লিটন দাস

সেই ২০১৫ সালের ১৮ জুন শেরে বাংলায় ভারতের সাথে ৮ রান দিয়ে শুরু লিটন দাসের ওয়ানডে ক্যারিয়ার। ক্রিকেট ব্যাকরণের প্রায় সব শটই আছে তার হাতে। ঘরের ক্রিকেটে গত কয়েক বছর বিশেষ করে ঢাকার প্রিমিয়ার লিগে রানের নহর বইয়ে দিয়েছেন। কয়েক গন্ডা শতকও আছে ঢাকা লিগে। কিন্তু সেই ফ্রি স্ট্রোক মেকার এখনো ওয়ানডে ক্রিকেটে ১২ ম্যাচে একবারের জন্যও পঞ্চাশের ঘরে পৌঁছাতে পারেননি। ভাবা যায়! তার সর্বোচ্চ রান মাত্র ৩৬।

শেষবার ওয়ানডে সিরিজে সুযোগ পেয়েছিলেন ২০১৭ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজে। সেটাও মোটেই সুবিধার হয়নি। তিন ম্যাচে (১+১৪+৬) করেছেন মোটে ২১।

মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত

আরেক তরুণতুর্কী ভাবা হয়েছিল মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতকে। ময়মনসিংহের এ তরুণকে সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে দেখা দিয়েছিলেন শুরুতে। ২০১৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর শেরে বাংলায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকে, চার বাউন্ডারি ও দুই ছক্কাসহ বল সমান ৪৫ রানের দ্যুতিময় ইনিংস। কিন্তু ১৯ ম্যাচের ছোট্ট ক্যারিয়ারটি কাঙ্খিত মানে পৌঁছেনি। তিনবার ব্যাটিংয়ে নামেননি। একটি ম্যাচ হয়েছে পরিত্যক্ত। যে ১৫ ইনিংস ব্যাট করেছেন, তাতে একটি মাত্র পঞ্চাশ ২০১৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর ক্রাইস্টচার্চে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে (৪৪ বলে, তিন ছক্কা ও পাঁচ বাউন্ডারিতে ৫০)। সেই ব্যাটসম্যান পরের ১৪ খেলায় কোথায় হারিয়ে গেছেন! পরের ১২ ইনিংসে (৩+২৪+১১+৯+৪১+১০+২+৭+১৫+১১+৩) করেছেন মোটে ১৩৬ রান।

বাংলাদেশ তরুণ উইলোবাজদের এই যদি হয় অবস্থা! যেখানে মধ্য তিরিশে গিয়ে মাশরাফি এখনো সেরা বোলারদের অন্যতম। গতি কমিয়ে ১২০-১২৫ কিলোমিটারের আশ পাশে বল করেও এক নম্বর পেসার। সেখানে তাসকিন, শফিউল, আবু জায়েদ রাহী ও আবু হায়দার রনিরা অনেক পিছনে।

তামিম-মুশফিক পাল্লা দিয়ে রান করছেন। সাকিব বল ও ব্যাট হাতে সমান উজ্জ্বল। মাহমুদউল্লাহর ধারাবাহিকতা কমলেও সময়মত জ্বলে ওঠার কাজটি ঠিকই করে যাচ্ছেন। তাকে তাই ‘বিগ ম্যাচ’ প্লেয়ার বলেই ডাকেন অনেকে। শেষ ২০ থেকে ২৫ ম্যাচে তামিম, মুশফিক, সাকিব ও মাহমুদউল্লাহর ব্যাট থেকে এসেছে সাতটি সেঞ্চুরি সহ প্রায় সাড়ে তিন হাজার রান। সেখানে এনামুল হক বিজয়, লিটন দাস, সাব্বির-মোসাদ্দেক সৈকতরা ভুগছেন রান খরায়।

মোটকথা, সিনিয়রদের পারফরমেন্সের কাছে উড়ে যাচ্ছে তরুনরা। বড়দের সাথে তরুণদের পারফরমেন্সের অনুপাত এখন ৪:১। কিংবা তারচেয়েও বেশি। একটা দলের পাঁচ-ছয়জন পরিণত, প্রতিষ্ঠিত ও অভিজ্ঞ পারফরমারদের সাথে যদি তরুণদের পারফরমেন্সের অনুপাত এমন হয়, তাহলে কি করে চলবে? এর উত্তর কারো কাছেই নেই। সিনিয়রদের পাশাপাশি জুনিয়ররা যদি নিজেদের মেলে ধরতে না পারে তাহলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের দুর্দিন আর বেশি দূরে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here