বাংলাদেশের শেষ গ্রাম: থেগামুখ বা থেগাদোর

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি করে নদীর পাড়ে সৃষ্ট বাংলার অপরূপ একেকটি গ্রাম। তেমনি একটি নদী পাড়ে দাড়িয়ে আছে বাংলাদেশের শেষ সীমান্তবর্তী গ্রাম। কর্ণফুলী নদী বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ নদী। এই কর্ণফুলীর উৎস মুখে রয়েছে বাংলাদেশের শেষ এবং সীমানা গ্রাম থেগামুখ। স্থানীয় উচ্চারণ অনুযায়ী থেগামুখ বা থেগাদোর বললেও শুদ্ধ বাংলায় এর উচ্চারণ হয় ঠেগামুখ।

বাংলাদেশের তিনটি পার্বত্য জেলার একটি হলো রাঙ্গামাটি। বাংলাদেশের সর্ব বৃহৎ হ্রদ কাপ্তাই থেকে শুরু করে বেশ কিছু প্রাকৃতিক নৈসর্গিক স্থানের জন্য বিখ্যাত হলো রাঙ্গামাটি। এই রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলার ছোট হরিণা থেকে ২৬ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত থেগামুখ হলো বাংলাদেশের সীমান্তের শেষ গ্রাম। ভৌগলিকভাবে গ্রামটির যেমন গুরুত্ব রয়েছে তেমনি এর সৌন্দর্যেরও জুড়ি মেলা ভার। থেগামুখ প্রান্ত থেকেই মুলত কর্ণফুলীর যাত্রা শুরু।

থেগামুখে নদী তীরবর্তী হওয়াতে এখানে নৌপথেই যেতে হয়। রাঙ্গামাটি থেকে কর্ণফুলী নদী ধরে গেলেই একসময় চোখে পরে প্রকৃতির অপূর্ব সাজসজ্জা নিয়ে দাড়িয়ে থাকা থেগামুখ গ্রাম। রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার সমতাঘাট থেকে ছোট বা বড় ট্রলারের মাধ্যমে ছোট হরিণায় যেতে হয়। তারপর ছোট হরিণা থেকে নৌপথে বড় হরিণা হয়ে যেতে হয় থেগামুখ। থেগামুখে ছোটবড় প্রায় একশত পরিবারের বাস। মূলত চাকমা ও মারমা উপজাতিরা এখানে বসবাস করে। এখানে একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। আর রয়েছে একটি বাজার। এখানে প্রতি সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার হাট বসে। যেখানে দেশীয় বিভিন্ন পন্য ছাড়াও ভারতীয় বিভিন্ন পন্য বেচাকেনা হয়। ২০০৩ সালে বাজারটিকে সরকারীকরণ করা হয়।

থেগামুখের পাশেই রয়েছে ভারতের মিজোরাম রাজ্য। থেগা থেকেই মিজোরাম দেখতে পাওয়া যায়। ওপারে শিলচর নামের একটি বাজার রয়েছে। এপার আর ওপারের মানুষের মাঝে বেশ সদ্ভাব রয়েছে এখানে। তারা নদীর এপারে আর ওপারে প্রয়োজনে চলাচল করে। ভারতে এদেশীয় পণ্যের বেশ চাহিদা থকায় স্থানীয়রা এসব পণ্যের ব্যাবসা করে। দিনে যেয়ে বাজার সদাই শেষ করে থেগার বসবাসরত আদিবাসী বাঙ্গালিরা আবার সন্ধ্যায় এদেশে চলে আসে। একইভাবে ভারতীয়রাও যাতায়াত করে। এভাবেই তারা তাদের মাঝে প্রীতি ও সদ্ভাব বজায় রেখেছে। থেগামুখের পাশেই রয়াছে একটি ছড়া, এই ছড়াটির নামই হলো থেগা। আর ছড়া থেকে উৎপন্ন নদীর নাম হলো থেগা নদী যা গ্রামের পাশ দিয়েই সাজেকের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। মূলত এখান থেকেই গ্রামের নাম রাখা হয়েছে থেগামুখ।

থেগামুখের পাহাড়ের প্রান্তে দাঁড়ালেই ওপারে মিজোরামের লুসাই পাহাড় বা ব্লু মাউন্টেন চোখে পরড়ে। এখান থেকেই কর্ণফুলীর শুরু। নদীর বাংলাদেশ প্রান্তেও ভারতীয় পতাকাবাহী বিভিন্ন নৌযান চোখে পড়ে, যেগুলো বাণিজ্যিক কাজে এদেশে এসেছে। তাছাড়া মিজোরামের বেশ আধুনিক রাস্তাঘাট সহ বসতি চোখে পড়ে আর চোখে পড়ে দিগিন্ত বিস্তৃত পাহাড় আর সবুজের সমারোহ। থেগার বাংলাদেশ প্রান্তে বাংলাদেশের আর অন্য আট দশটি গ্রামের মতনই সরলতা চোখে পড়ে। সাজানো বাগানের ন্যায় জুম চাষ আর সবুজের সমারোহ, বিভিন্ন পাখির কলতান আর পাহারী ছড়ার ঝিরঝির শব্দ এখানে যে কাউকে মুগ্ধ করে রাখবে। তবে এখানে পানির খুব সমস্যা। পানির জন্য স্থানীয়দের পাহাড়ী ছড়া বা নদীর উপরই নির্ভর করতে হয়। গ্রামে প্রবেশ করলেই ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হৈ-হুল্লোড়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, কর্মচঞ্চল স্থানীয় আদিবাসীদের বিভিন্ন কাজে ব্যাস্ত থাকতে দেখা যায়।

ছোট হরিণার শেষ কিছু স্থান মূলত স্থানীয় আদিবাসী ছাড়া অন্য কারো জন্য নিরাপদ না থাকায় মূলত এখানে সবার যাওয়ার অনুমতি মেলেনা। বিজিবি থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখিয়ে ছাড়পত্র নিলে তবেই থেগামুখ যাওয়ার অনুমতি মেলে। রাঙ্গামাটির জিওএস ৩০৫ পদাতিক ব্রিগেড বরাবর আবেদন করলে তারা অনুমতি প্রদান করে থাকে। এখানে পৌঁছাতে পথের ক্লান্তি সহ বেশ কিছু সমস্যা নিয়ে বেগ পেতে হলেও পৌঁছালে থেগার নান্দনিক সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করে দিতে বাধ্য। সীমান্তবর্তী গ্রাম হওয়াতে বিজিবির কড়া নিরাপত্তা সহই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে কর্ণফুলী নদীর মুখকে যেনো পাহারা দিয়ে আছে বাংলাদেশের শেষ গ্রাম থেগামুখ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here