শিক্ষার্থীদের দাবি ও সরকারের প্রতিশ্রুতি : অমিল কোথায়

নিজস্ব প্রতিনিধিঃরাজধানীর ভিআইপি সড়কের কুর্মিটোলায় এমইএস বাসস্ট্যান্ডে বেপরোয়াগতির বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদে সারাদেশে টানা পাঁচ দিন বিক্ষোভ চলছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করছে শিক্ষার্থীরা। ঘটনার পরদিন সকালে নৌমন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়ে কুর্মিটোলায় শহীদ রমিজউদ্দিনসহ আশপাশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নিলেও, বিকেলে ৯ দফা দাবিতে মন্ত্রীর পদত্যাগ থেকে সরে আসে আন্দোলন জাগ্রতকারী। দফায় যুক্ত হয় মন্ত্রীর ক্ষমা চাওয়া। এরপর পাল্টে যায় দৃশ্যপট।

পরদিন সন্ধ্যায় নৌমন্ত্রী সমবেদনা জানাতে ছুটে যান দিয়া মিমের পরিবারের কাছে। ক্ষমাও চান তিনি। এমনকি জাতির সামনে টেলিভিশনের পর্দায় সবার কাছে ক্ষমা চান শাহজাহান খান। তিনি নিজেই বাস চালক অপরাধী বলে স্বীকার করেন। বাস দুটোর রুট পারমিট বাতিলের সুপারিশও করেন তিনি।

গত রোববার, ২৯ জুলাই জাবালে নূর পরিবহনের দুটি বাসের রেষারেষির মধ্যে একটি বাস বিমানবন্দর সড়কের এমইএস এলাকায় রাস্তার পাশে যাত্রী ছাউনির কাছে দাঁড়ানো একদল শিক্ষার্থীর উপর উঠে যায়। বাসের গতি এতটাই তীব্র ছিল যে, দেয়াল ও বহুবছরের একটি বড় গাছও উপরে যায়। বাসের মুখোমুখি আঘাত ও পাশ থেকে দেয়ালে চাপা পড়ে অনেক শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে, ক্ষোভে ফেটে পড়ে সহপাঠিরা। সড়কে নেমে আসে তারা। বন্ধ করে দেয়া হয় রাজধানীর প্রাণ গুরুত্বপূর্ণ ভিআইপি সড়ক। অবরোধ করে চলে বিক্ষোভ।

রাতে টেলিভিশনগুলোতে নৌমন্ত্রী ও পরিবহন শ্রমিক নেতা শাজাহান খানের বক্তব্য প্রচার হয়। ওই বক্তব্যে বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীরা। পরদিন ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও সড়ক অবরোধ করে মন্ত্রীর অপসারণ চেয়ে বিক্ষোভ করে। অবরোধে আটকা পড়েন মন্ত্রী, এমপিসহ বড় বড় কর্মকর্তাও। ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। জেলায় জেলায় শুরু হয় বিক্ষোভ।

দ্বিতীয় দিন স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন থেকে নয়টি দাবি উঠে আসে শিক্ষার্থীদের স্লোগানে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের কোনো সাংগঠনিক কাঠামো না থাকায়, এভাবেই আসে নয় দাবির কথা। যাতে সমর্থন দেয় অনেকেই।

বিক্ষোভের পর থেকে সরকারের মন্ত্রীরা শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণের আশ্বাসও দিয়ে আসেন। কিন্তু তাতেও হয়নি কাজ। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ আরো জোরদার হয়। এক পর্যায়ে সরকার বৃহস্পতিবার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করে। তাতেও ধমিয়ে রাখা যায়নি শিক্ষার্থীদের। ওই দিন ছাত্র বিক্ষোভ আরো দ্বিগুন হয়। অনেকটা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে রাজধানী ঢাকা। নগরীর প্রতেক্যকটা সড়ক হয়ে পড়ে যান শূণ্য। চরম দূর্ভোগে পড়েন নগরবাসী।

বৃহস্পতিবার দুপুরে দৃশ্যপট কিছুটা পাল্টায়। প্রধানমন্ত্রীর দফতরে ডেকে আনা হয় নিহত দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিম রাজীবের পরিবারকে। প্রত্যেক পরিবারকে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি সড়কে নিরাপত্তায় কঠোর কিছু নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনার আশ্বাসে শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরার আহ্বান জানান দিয়ার বাবা বাস চালক জাহাঙ্গীর।

তারপরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। সেই দ্বিতীয় দিন থেকে চলা অবরোধ, বিক্ষোভ ও সড়ক নিরাপত্তায় যানবাহনের ফিনটেস ও লাইন্সেস পরীক্ষা অব্যাহত রাখে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এমপি-মন্ত্রী, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার গাড়ি, ব্যবসায়ী, সাংবাদিকসহ অনেকেই ধরা পড়েন শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাগারে। ফুটে ওঠে সড়কে অনিয়মের বিস্তার। শুধু বাস চালকই নয়। দীর্ঘদিন চলমান অনিয়মের বেড়াজালে সবাই যেন অভ্যস্থ। আইসিটির উন্নয়ন আর যতশত নিয়মের মধ্যেও সড়কে যে সবারই পছন্দ অনিয়ম, তাই ফুটে ওঠে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদে।

বিকেলে নগরীর মিরপুরে ঘটে যায় দূঃখজনক ঘটনা। শান্ত প্রায় শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। সঙ্গে যোগ দেয় দুস্কৃতিকারীরা। লাঠি হাতে শিক্ষার্থীদের বেদড়ক পেঠায় তারা। শিক্ষার্থীরাও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভাঙচুর চালায় সরকারি একটি গাড়িতে। সংর্ঘষ ছড়িয়ে পড়ে অলিগলিতে।

পরে রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষার্থীদের ৯টি দাবির যৌক্তিকতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, এসব দাবি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রায় দেড় ঘন্টার বক্তব্যে মন্ত্রী বার বার দাবিগুলোকে যৌক্তিক স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরার আহ্বান জানান।

শিক্ষার্থীদের ৯টি দাবির বিপরীতে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার:

এক. বেপরোয়া চালককে ফাঁসি দিতে হবে এবং শাস্তি সংবিধানে সংযোজন করতে হবে।

পদক্ষেপ: দুই শিক্ষার্থীকে চাপা দেয়া ওই বাসের চালককে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে জাবালে নূর পরিবহনের মালিককেও। মামলায় দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সঙ্গে অপরাধজনিত হত্যার ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এখন বিচার প্রক্রিয়াটি আদালতের উপর নির্ভর করছে। আইনমন্ত্রী বলেছেন, দ্রুত বিচারের মাধ্যমে দোষীদের সাজা দেয়া হবে।

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর জন্য অবহেলাকারী চালকের শাস্তির মাত্রা বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়নে গতি আসে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তির জন্য নতুন আইন শিগগিরই সংসদে উপস্থাপন করা হবে।

দুই. নৌপরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।

পদক্ষেপ: নিজের ‘অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের জন্য’ দুঃখ প্রকাশ করে ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ ক্ষমাসুন্দরভাবে দেখতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। নিহত দিয়া খানম মিমের বাসায় গিয়ে তার পরিবারের কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন তিনি। শিক্ষার্থীদের স্লোগান থেকে তার পদত্যাগের দাবি উঠলেও, শাজাহান খান বলেন এটা শুধু বিএনপির পক্ষ থেকেই উঠেছে। ফলে তা তিনি আমলে নিচ্ছেন না। তবে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবিতে পদত্যাগ অংশটুকু থাকলে তিনি অবশ্যই পদত্যাগ করবেন।

তিন. শিক্ষার্থীদের চলাচলে এমইএসে ফুটওভার ব্রিজ বা বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা নিতে হবে।

পদক্ষেপ: কুর্মিটোলার সড়কের যেখানে দুই কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন, সেখানে আন্ডারপাস অথবা ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এটি নির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রী এরইমধ্যে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। রমিজউদ্দিন স্কুল ও কলেজকে ৫টি বাস দেয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন শেখ হাসিনা।

চার. প্রত্যেক সড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিড ব্রেকার দিতে হবে।

পদক্ষেপ: দিয়া ও করিমের পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী সব স্কুলের সামনে গতিরোধক স্থাপনের নির্দেশ দেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কোনো স্কুল-কলেজের পাশে রাস্তা থাকলে, সেখানে আলাদা ট্রাফিক পুলিশ থাকবে। শিক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপারে সহযোগিতা করবে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ।

পাঁচ. সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্র-ছাত্রীদের দায়ভার সরকারকে নিতে হবে।

পদক্ষেপ: নিহত শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিমের পরিবারকে ২০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আহত শিক্ষার্থীদের ব্যয়ভার গ্রহণের কথা একদিন দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সে ঘোষণা দেন।

ছয়. শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগন্যাল দিলে, থামিয়ে তাদের বাসে তুলতে হবে।

পদক্ষেপ: সরাসরি বলা হয়নি, তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় ওই দাবি বাস্তবায়নের ইঙ্গিত রয়েছে।

সাত. শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

পদক্ষেপ: এ বিষয়ে সরাসরি কিছু বলা না হলেও, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় ওই দাবি বাস্তবায়নের ইঙ্গিত আছে।

আট. রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল এবং লাইসেন্স ছাড়া চালকদের গাড়ি চালনা বন্ধ করতে হবে।

পদক্ষেপ: এটা আইনত নিষিদ্ধ। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরুর পর ঢাকার সড়কে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের ধরতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিআরটিএকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জাবালে নূর পরিবহনের বাস দুটির নিবন্ধনও বাতিল করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যান্ত্রিক ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি যাতে রাস্তায় উঠতে না পারে, সেজন্য গাড়ির যাত্রার পয়েন্টে অর্থাৎ টার্মিনালে চেকপোস্ট বসানো হবে। যাতে গাড়িটি বের হওয়া সঙ্গে সঙ্গে যেন ধরা পড়ে যে গাড়ির ফিটনেস আছে কি না? রেজিস্ট্রেশন ও চালকের লাইসেন্স সঠিক আছে কি না। তারপরও চালক গাড়িটি নিয়ে বের হলে আমরা সে ব্যবস্থাও নিচ্ছি।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা গাড়ি থামিয়ে কাগজপত্র যাচাইয়ের কাজ নিজেদের হাতে তুলে নেয়ার পর সরকারি গাড়ি চালকদের যাবতীয় মূল কাগজপত্র সঙ্গে রাখার নির্দেশ দেয় সরকার। পুলিশ সদস্যদেরও একই নির্দেশ দেয়া হয়।

নবম. বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেয়া যাবে না।

পদক্ষেপ: সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস হলে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সহজ হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুই-একটি দাবি পূরণে সময় চেয়ে বলেছেন, দুই-একটি দাবি পূরণে সময় লাগবে। যেমন ফুটওভার ব্রিজ কিংবা আন্ডারপাস নির্মাণ।

দাবি পূরণ হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরার অনুরোধ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শিক্ষার্থীদের ফেরাতে অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রতিও আহ্বান জানান তিনি। আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেয়ার ষড়যন্ত্রের আভাসও দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here