আব্দুল গাফফার চৌধুরী অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন কোটি বাঙ্গালির হৃদয়ে

নিউজ ডেস্কঃকিংবদন্তি সাংবাদিক, জনপ্রিয় কলামিস্ট, শক্তিমান প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও মহান একুশের কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’র রচয়িতা আব্দুল গাফফার চৌধুরী গত ১৯ মে ভোর ৬টা ৪০ মিনিটে লন্ডনের বার্নেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার মরদেহ আজ শনিবার দেশে আনা হয়েছে।

ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকারের আন্দোলন পেরিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ আর বাংলাদেশের নানা ইতিহাসের সাক্ষী আবদুল গাফফার চৌধুরী। স্বাধীনতার পর প্রবাস জীবন বেছে নিলেও কখনও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেননি জন্মভূমি থেকে। তিনি লিখেছেন গল্প-কবিতা-উপন্যাস, করেছেন সাংবাদিকতা, বাংলাদেশে কলাম লেখাকে পেশা হিসেবে নেয়ার পথ তৈরি করেছেন- এমন নানা গুণে গুণান্বিত গাফফার চৌধুরী।

গাফফার চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর বরিশাল জেলার উলানিয়ার জমিদার পরিবারে। তার শিক্ষা জীবন শুরু হয় স্থানীয় মাদ্রাসায়। উলানিয়া জুনিয়র মাদ্রাসায় প্রাথমিকে পড়ার পর হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫০ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৫৩ সালে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি নেন।

এছাড়া ঢাকায় এসেই রাজনৈতিক সংগ্রামে নিজেকে যুক্ত করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙতে গিয়ে নিজেও আহত হয়েছিলেন। তবে পরিবার থেকেই আসে তার রাজনীতির চেতনা। তার বাবা ওয়াহেদ রেজা চৌধুরী অবিভক্ত বাংলার বরিশাল জেলা কংগ্রেস কমিটি ও খেলাফত কমিটির সভাপতি ছিলেন।

গাফফার চৌধুরী যখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র, তখন তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। ষষ্ট শ্রেণিতে থাকাকালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক নবযুগের ছোটদের পাতায় তার লেখা প্রথম ছাপা হয়। তারপর স্কুলছাত্র থাকাবস্থায়ই তার লেখা কলকাতার সওগাত, ঢাকার সোনার বাংলা (অধুনালুপ্ত) পত্রিকায় ছাপা শুরু হয়।

এসএসসি পাসের পর তিনি যখন ঢাকায় আসেন, তখন সওগাত, মোহাম্মদী, মাহে লও, দিলরুবা প্রভৃতি মাসিক পত্রিকায় তার গল্প-উপন্যাস ছাপা হতে থাকে।

গল্প-কবিতা-উপন্যাস লিখেছেন, সাংবাদিকতা করেছেন, বাংলাদেশে কলাম লেখাকে পেশা হিসেবে নেয়ার পথ তৈরি করেছেন-এমন নানা গুণে গুণান্বিত গাফফার চৌধুরী।

কিন্তু অন্য সব পরিচয় ছাপিয়ে তরুণ বেলার একটি কাজের জন্যই বাঙালি আর বাংলাদেশের সঙ্গে অনন্তকাল জড়িয়ে থাকবেন তিনি। তা হল ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র গানটি রচনা। গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কথায়, বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, এই গানটিও ততদিন থাকবে।

তিনি বলেন, এটি শুধু গান হিসেবেই ব্যবহার করেনি, এটি একটি আদর্শিক দিক উন্মোচন করেছিলো। তখন প্রতিঘাত করার প্রয়োজন ছিল, সেটা গানের মাধ্যমে উনি মিটিয়েছেন।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাঙালির মিছিলে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর গুলি চালানোর পর ঢাকা মেডিকেলে আহত ছাত্রদের দেখতে গিয়েছিলেন গাফফার চৌধুরী। তখন তিনি ঢাকা কলেজে পড়েন। মেডিকেলের বহির্বিভাগে ভাষা সংগ্রামী রফিকের মাথার খুলি উড়ে যাওয়া লাশ দেখে তার বারবার মনে হতে থাকে, এটা যেন তার নিজের ভাইয়েরই রক্তমাখা লাশ। তখনই তার মাথায় আসে একটি লাইন, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি।

এরপর ইতিহাস হয়ে যায় সেই কবিতা। প্রথমে আবদুল লতিফের সুরে তা গানে রূপ নেয়। পরে আলতাফ মাহমুদের সুরে তা হয়ে ওঠে অবিনাশী ভাষার গান। এখন প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেই গান কণ্ঠে নিয়ে প্রভাতফেরিতে যায় বাংলাদেশের মানুষ। বিবিসি শ্রোতা জরিপে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ গানের তালিকায় এটি তৃতীয় স্থানে উঠে আসে।

এদিকে ছাত্রজীবনেই সাংবাদিক হওয়ার পথ ধরেছিলেন গাফফার চৌধুরী। ১৯৫০ সালেই তিনি যোগ দেন ‘দৈনিক ইনসাফ’ পত্রিকায়। এর তিন বছর বাদে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের মাসিক সওগাতের দায়িত্ব নেন তিনি। ১৯৫৬ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক হন। দুই বছর পর ইত্তেফাক সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার রাজনৈতিক পত্রিকা ‘চাবুক’ সম্পাদনার ভার নেন তিনি। তবে পত্রিকাটি সামরিক শাসনের মধ্যে বেশিদিন বের হতে পারেনি।

গাফফার চৌধুরী এরপর দৈনিক আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী, দৈনিক জেহাদ এ কাজ করার পর ১৯৬৩ সালে সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সম্পাদক হন।

এরপর দুই বছর ছাপাখানা খুলে ব্যবসায় নামলেও আবার ফেরেন সাংবাদিকতায়। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে দৈনিক আওয়াজ বের করেন। ১৯৬৭ সালে আবার ফেরেন দৈনিক আজাদে। ১৯৬৯ সালে পুনরায় যোগ দেন দৈনিক ইত্তেফাকে। মানিক মিয়া মারা গেলে দৈনিক পূর্বদেশে যোগ দেন তিনি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সপরিবারে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আগরতলা হয়ে কলকাতা পৌঁছান। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দৈনিক জনপদ বের করেন। ১৯৭৪ সালে অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে লন্ডনে পাড়ি জমান তিনি।

তারপর থেকে প্রবাসে থিতু তিনি। সেখানে ১৯৭৬ সালে তিনি ‘বাংলার ডাক’ নামে এক সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ‘সাপ্তাহিক জাগরণ’ পত্রিকায়ও কিছুদিন কাজ করেন। ১৯৮৭ সালে ‘নতুন দিন’ পত্রিকা বের করেন। এরপর ১৯৯০ সালে ‘নতুন দেশ’ এবং ১৯৯১ সালে ‘পূর্বদেশ’ বের করেন।

প্রবাসে থাকলেও বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোতে নিয়মিতই লিখে গেছেন গাফফার চৌধুরী; আর এদেশে কোনো সংবাদপত্র বের হলেই পত্রিকার কাটতির জন্য নিয়মিত কলামিস্ট হিসেবে তার দ্বারেই যেত সম্পাদক-প্রকাশকরা।

একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ‘জয় বাংলা’, ‘যুগান্তর’ ও ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় কাজ করেছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তার লেখা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটি তাকে শুধু খ্যাতি নয়, অমরত্ব এনে দেয়। প্রথমে তিনি নিজেই গানটিতে সুর করেছিলেন। পরে শহীদ আলতাফ মাহমুদ এ গানে সুরারোপ করেন এবং বর্তমান সেই সুরেই গানটি গীত হয়। গফফার চৌধুরী একটা গীতিকবিতা লেখার পরে আর না লিখলেও তার আয়ু বাংলা ও বাঙালির সমান। তার জীবন ও সংগ্রামের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। তার অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ক্ষুরধার লেখনী তাকে বাঁচিয়ে রাখবে অনন্তকাল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here