কথা বলতে না পারলেও ‘পরিশ্রমে’ আলো ছড়িয়েছেন তারা!

জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : সৃষ্টিকর্তার কী অমোঘ নিয়ম। ওরা তিনজনেই বাক প্রতিবন্ধী। সোজা বাংলায় যাকে আমরা বলে থাকি বোবা। তিনজনেই কথা বলতে পারেন না। কিন্তু চাকরি করেন একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। বোবা মানে ওরা কর্মক্ষমতাহীন নয়। ওরা স্বাভাবিক জীবনযাপনে সক্ষম কিন্তু বাকশক্তিহীন। এরা হলেন-ইসলাম আহমদ, সিরাজুল ইসলাম কাকা ও জাকির হোসেন। তিনজনের বাড়ি চট্টগ্রাম কর্ণফুলী উপজেলার জুলধা ডাঙারচর এলাকায়।

স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, ২০১০ সাল থেকে তিনজনেই চাকুরী করে আসছেন জুলধা ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ার পূর্বে এদের পেশা ছিলো কৃষি কাজ, দিনমজুর কিংবা নৌকার মাঝি। তিন জনের সংসার চলতো এভাবেই। কখনো আধা বেলা কখনো পুরো দিনের খাবারের যোগান হতো।

নিম্নমধ্যবিত্ত সংসারের দায়িত্ব ছিলো তাঁদের কাঁধে। সংসার ও ছেলে মেয়েদের খরচ যোগাতে মাঠে ঘাটে কাজ আর কাজ। কিন্তু একর্ণ ইনফ্রাস্ট্রাকচার সার্ভিসেস লিমিটেডের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর থেকে দৈনিক মজুরীতে শ্রমিক হিসেবে কাজে নিয়োগ পান তিনজনেই। কপাল খুলে এতে। নিশ্চিত হয় দুমুঠো ভাতের।

এর কৃতিত্ব শুধুমাত্র মানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কতৃপক্ষের। প্রথমে ইসলাম আহমদ ও সিরাজুল ইসলাম কাজে যোগ দিলেও পরে জাকির হোসেনও কাজ পান একই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। সবমিলিয়ে তাঁদের বেতন এখন জনপ্রতি ১৫ হাজারে দাঁড়িয়েছে।

বাড়ির পাশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র। তাতে বাড়তি কোন যাতায়াত খরচ, কিংবা খাবারের বিল নেই। দুপুরে বাসায় গিয়ে খেয়ে পূনরায় কাজে যোগ দিতে পারেন তাঁরা। এখন বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দৈনিক শ্রমিকের সংখ্যা ৩০ জনের উপরে। যাদের মধ্যে এরা তিনজন বেশ পরিশ্রমি। তাঁদের কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। কিন্তু কাজের প্রতি তাঁদের একাগ্রতা আর নিষ্ঠা এতদুর নিয়ে এসেছে বলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের লোকজন জানান।

এরা তিনজনের কাজের সঙ্গী হিসেবে রয়েছেন একই এলাকার আরো কয়েকজন। মোহাম্মদ ইলিয়াস, মোহাম্মদ আবু, মোঃ নাদিম ও নুরুল আবছারের মতো আরো বেশ দক্ষ শ্রমিক। যারা সকলে এই মানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কাজ করছেন।

জুলধা গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য সিরাজুল ইসলাম হৃদয় বলেন, তিন বোবা ও বাক প্রতিবন্ধীর পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক হৃদয়ের পরিচয় দিয়েছেন বিদ্যুৎ কেন্দ্র কতৃপক্ষ। এজন্য এলাকাবাসির পক্ষ থেকে AISL (Acorn Infrastructure Services Limited) কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। অন্তত কিছু পরিবারকে স্বাবলম্বী করেছেন।

বাক প্রতিবন্ধী সিরাজুল ইসলাম কাকার আত্মীয় (বোন জামাই) ফখরুল ইসলাম বলেন, প্রতিবন্ধী শালার চাকুরী হওয়ায় পরিবারটি দু’মুঠো ডাল ভাত খেয়ে দিনযাপন করতে পাচ্ছে। এতে আমরা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

বাক প্রতিবন্ধী ইসলাম আহমদ এর ভাতিজা মোঃ আব্বাস উদ্দিন বলেন, বাংলা ক্যাট কতৃপক্ষকে ধন্যবাদ অসহায় ব্যক্তিদের কাজে নিয়োগ দেওয়ার জন্য। এটা মানবিকতা। এটা শ্রমের মূল্যায়ন। তাঁরা উদারতার পরিচয় দিয়েছেন।

পাওয়ার প্লান্টের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ গোলাম মোহাম্মদ শাহরিয়ার চৌধুরী বলেন, অন্যদের তুলনায় ওরা তিনজনের কাজে মনোযোগ অনেক বেশি। যেকোনো কাজ একবার বুঝিয়ে দিলে ভালোভাবে শেষ করেন তাঁরা। কাজে কোন ফাঁকি নেই তাঁদের। শুনেছি এরা সামাজিক সংগঠন কর্ণফুলী এন্টারপ্রাইজের সদস্য। প্রতি বছর দুই ঈদে সংগঠন থেকে ঈদ বোনাস হিসেবে এককালীন সন্তোষজনক অর্থও পেয়ে থাকেন।

প্লান্ট এডমিন শাহাবুল হুদা জুলফিকার বলেন, আমরা অনেকেই ওদের বিশেষণ দিয়ে থাকি বাক প্রতিবন্ধী কিংবা বোবা। কিন্তু ওরা মানুষ। ওদের কণ্ঠ স্তব্ধ হলেও এরা দেখতে পান। ওদের দুহাত সচল। ওরা কাজ করতে পারেন। ওরা পরিশ্রমি। কাজের প্রতি তাদের যে মনোযোগ তা অন্য কারো পক্ষে সম্ভব না। আমরা তাঁদের কাজের প্রতি সন্তুষ্ট বলে কাজ দিয়েছি। আমাদের মিশন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ব্যবহার করে নির্ভরযোগ্য এবং টেকসই শক্তি সমাধান করা।

প্রসঙ্গত, শক্তিমান বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে টেকসই ভবিষ্যত নির্মাণে কাজ করছেন ACORN ইনফ্রাস্ট্রাকচার সার্ভিসেস লিমিটেড। এটি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের স্বনামধন্য ব্যবসায়িক সংগঠন, বাংলা ট্র্যাক লিমিটেডের একটি প্রতিষ্ঠান। যারা বাংলাদেশের জন্য একটি টেকসই ভবিষ্যৎ পাওয়ার হাউসের জন্য নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ এবং উদ্ভাবনী শক্তি তৈরি করছেন।

ACORN প্লান্টটি বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এইচএফও ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুবিধা দিয়েছে। ২০১২ সালে ১০০ মেগাওয়াট এর প্রাথমিক ক্ষমতা দিয়ে শুরু করে, বর্তমানে যার সম্মিলিত ক্ষমতা ৮০০ মেগাওয়াট গণনা চলছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here