দালাল আর মানহীন চিকিৎসায় নাজেহাল দক্ষিণাঞ্চলের রোগীরা!

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ: নগরীর সবচেয়ে ব্যস্ততম বিবিরপুকুরপাড় এলাকা। এখানকার বাটার গলিসহ আশপাশের বিভিন্ন ভবনে শতাধিক ডাক্তারের চেম্বার, রয়েছে ডায়াগনস্টিক ল্যাব। আর এখানেই ওৎ পেতে থাকে দালালচক্র।

দালালরা রোগী সংগ্রহ করে তাদের পছন্দের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে বসেই চিকিৎসার নামে অসংখ্য টেস্ট বাণিজ্যের মাধ্যমে রোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে মোটা অংকের টাকা। এভাবে নামমাত্র আবেদন করে বরিশালের অলিগলিতে চলছে ব্যক্তি মালিকানার বেশির ভাগ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে দালালদের। আর ১৫ থেকে ২০ জন ডাক্তার ওইসব দালালদের কমিশন দিয়ে থাকেন। ফলে দালাল নির্ভর চিকিৎসকদের নিয়ে চরম বিব্রতকর অবস্থায় পরেছেন পেশাদার চিকিৎসকেরা।

এনিয়ে বিশেষ অনুসন্ধানে রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, দালালরা মিথ্যা বুঝিয়ে চাকচিক্যে ভরা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা পকেটশূন্য করেন রোগীদের। অতিসম্প্রতি শরীয়তপুর থেকে আসা জোসনা বেগম নামের এক রোগী জানান, তিনি ডাঃ অসিত ভূষণ দাসকে দেখানোর জন্য বিবিরপুকুরপাড় এসে চেম্বারের খোঁজ করছিলেন। এসময় হঠাৎ কয়েকজন ব্যক্তি এসে তাকে অন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

রফিকুল ইসলাম নামের এক রোগী বলেন, আমরা গরিব মানুষ। গ্রাম থেকে শহরে আসি ভাল ডাক্তার দেখানোর জন্য। চেম্বার চিনি না বিধায় এদিক-ওদিক তাকাই ও হাঁটতে থাকি। তিনি বলেন, কেউ কেউ আইসা বলে কোন ডাক্তার দেখাবেন? বলছি, অসিত ভূষণ দাস। তখন দুইজন লোক বলেন, ওই ডাক্তার বরিশালে নাই, ঢাকায় চলে গেছে। তারা আমাগো অন্য ডাক্তারের কাছে জোর কইরা নেয়ার চেষ্টা করছে। এর আগেও এমন কইরা ভুয়া ডাক্তার দেখাইয়া ডায়াগনস্টিক ল্যাবে নিয়া অনেক টাকা নষ্ট করছে আমাগো।

সূত্রমতে, নগরীতে রোগীর দালাল চক্রের ৬০ জন সদস্য রয়েছে। এরা নগরীর সদর রোড, লঞ্চঘাট ও নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল এবং শেবাচিম হাসপাতাল এলাকায় ওৎপেতে থাকা এসব দালালরা গ্রাম থেকে আসা রোগীদের মিথ্যে তথ্য দিয়ে অন্য চিকিৎসকের কাছে নিয়ে প্রতারিত করছেন। সূত্রে আরও জানা গেছে, বরিশাল নগরী ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে প্রায় চারশ’র অধিক ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিক রয়েছে।

শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আউটডোর ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি ডাঃ সুদীপ হালদার বলেন, অনেক নয়, বরিশালে কয়েকজন ডাক্তার তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। তারা দালাল পোষে। কমিশন দিয়ে রোগী নিয়ে আসে চেম্বারে। তথাকথিত ডায়াগনস্টিক ল্যাবে ভুলভাল রিপোর্ট করাচ্ছে। এতে করে রোগীর টাকা গচ্ছা তো যাচ্ছেই, তার সাথে রোগীর জীবনও হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বরিশাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি মোঃ কাজী কামাল বলেন, একাধিকবার মানহীন ডায়াগনস্টিকের ল্যাবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। মাঝে মধ্যে ওই দালাল চক্রের বিরুদ্ধে ২/১টি অভিযান পরিচালিত হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তাই কঠোরভাবে দালালদের প্রতিহত করা না গেলে এ চক্রটি আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে।

জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ মারিয়া হাসান বলেন, দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা তৎপর আছি। প্রায়ই অভিযান চালিয়ে দালালদের আটক করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অনুমোদনের বাহিরে ডায়াগনস্টিক ল্যাব চালানোর কোন সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে সুনিদিষ্ট অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

বিএমপি গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মোঃ মনজুর রহমান পিপিএম বার বলেন, বরিশালে দালাল নির্মূল করতে আমরা সর্বদা কাজ করে যাচ্ছি। প্রতিনিয়ত ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে রোগীর দালাল আটক করে আসছে। বরিশালে ডিবি পুলিশ সবচেয়ে বেশি রোগীর দালাল আটক করেছে। তিনি আরও বলেন, আমরাও চাচ্ছি বিভিন্নস্থান থেকে আসা অসহায় মানুষরা যেন রোগীর দালালদের হাতে পরে প্রতারনা শিকার না হয়। তাই সকলে একটু সচেতন হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতা করলেই নগরী থেকে একবারে দালাল নির্মূল করা সম্ভব হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু ব্যক্তি মালিকানাধানী ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার-ই নয়। দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহত চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ প্রত্যেকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর চিকিৎসা সেবা থেকে শুরু করে অধিকাংশ চিকিৎসক রোগীর ব্যবস্থাপত্রে কোন কোম্পানীর ওষুধ লিখবেন, মালিকানাধানী কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টেস্টের জন্য রোগী পাঠাবেন এজন্য নিয়োগ রয়েছেন অসংখ্য দালাল থেকে শুরু করে নামসর্বস্ত্র ওধুধ কোম্পানীর বিক্রয় প্রতিনিধিরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here