মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নিহত ও পঙ্গু হওয়া সংখ্যা

নিজস্ব প্রতিনিধিঃমোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নিহত ও পঙ্গু হওয়ার সংখ্যা। ওই বাহনটির কারণে গত ঈদে মোট দুর্ঘটনার ৪৪ শতাংশ ঘটেছে। তাতে প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে। শুধু ঈদের সময়ই দুর্ঘটনায় ১৯০ জন মোটরসাইকেল আরোহী মারা গেছে। আর পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮০০ জনেরও বেশি। দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অন্যান্য হাসপাতালেও অনেকে ভর্তি হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দেশে ৩৬ লাখ ৫০ হাজার মোটরসাইকেলকে রেজিস্ট্রেশন দিয়েছে। অথচ তার বিপরীতে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া চালকের সংখ্যা ২৩ লাখ ৫০ হাজার। অর্থাৎ ১৩ লাখ চালকেরই মোটরসাইকেল চালানোর অনুমোদন নেই। বিআরটিএ এবং বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, অত্যাধিক মোটরসাইকেল এখন দেশের সড়ক-মহাসড়কে যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং অহরহ দুর্ঘটনার শিকার  হচ্ছে। ঈদের আগে গত ২৬ এপ্রিল থেকে ১০ মে সময় পর্যন্ত সময়ে দেশে ৩৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত ও ৮৪৪ জন আহত হয়েছে। গত বছরের ঈদুল ফিতরের সঙ্গে তুলনা করলে দুর্ঘটনার হার ১৪ দশমিক ৫১ শতাংশ, নিহত ২২ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা ২৬ দশমিক ৩০ শতাংশ বেড়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এবারের ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা ও হতাহতের পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। ১৬৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫৬ জন নিহত ও ১১০ জন আহত হয়েছে। যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪৪ দশমিক ০৮ শতাংশ, নিহতের হার ৩৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং আহত প্রায় ১৩ দশমিক ০৩ শতাংশ। এবার ঈদযাত্রায় ২৫ লাখ মোটরসাইকেল ও ৪০ লাখ ইজিবাইক রাস্তায় নেমেছে।

সূত্র জানায়, ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) দুর্ঘটনা আহত হয়ে যারা চিকিৎসা নিতে এসেছে তাদের একটি বড় অংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। প্রতিদিন গড়ে ২০০ জন রোগী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে। এ বছর তা বেড়েছে। ঈদের সময় দুর্ঘটনার প্রবণতা আরো বেশি হয়েছে। যতো রোগী এসেছে তার মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এসেছে। বাংলাদেশ রোড সেইফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে ২০২১ সালে সারা দেশে ৫ হাজার ৩৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ২৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয় ৭ হাজার ৪৬৮ জন। ওসব দুর্ঘটনার মধ্যে ২ হাজার ৭৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ২১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাতে মোট দুর্ঘটনার মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা মোট নিহতের ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ।

সূত্র আরো জানায়, চালকের লাইসেন্স না থাকলেও মোটরসাইকেল নিবন্ধনের কোনো বাধ্যবাধকতা আইনে নেই। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নিবন্ধন দিলেও মোটরসাইকেল চালাতে নিরুৎসাহিত করছে বিআরটিএ। অতিসম্প্রতি সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা রোধে ‘সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি’ জারি করেছে। তাতে বলা হয়, দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। মোটরসাইকেল অপেক্ষাকৃত একটি অনিরাপদ বাহন। তাই মোটরসাইকেলের চালকদের ফুল হাতা শার্ট, ফুল প্যান্ট, কেডস বা জুতাসহ মানসম্মত নিরাপত্তা সরঞ্জাম পরে মোটরসাইকেল চালাতে হবে।

এদিকে দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত দেশে মোটরসাইকেল চালানোর সময় বিশেষ পোশাক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এদেশে ওই রীতি নেই। ফলে এখানে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বেশি। তরুণ প্রজন্মের মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব কমাতে জরুরি ভিত্তিতে মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক আমদানি ও নিবন্ধন বন্ধ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মহাসড়কে অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণ, আলোকসজ্জার ব্যবস্থা, দক্ষ চালক তৈরি, ধীরগতির যান ও দ্রুতগতির যানের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা, চালকদের বেতন ও কর্ম-ঘণ্টা নিশ্চিত করাসহ মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত এবং নিয়মিত রোড সেফটির বিষয়টি অডিট করা দরকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here