যে রক্তাক্ত ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মে দিবস’

ফিচার ডেস্ক:আজ ১ মে। মহান মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার স্মৃতি বিজড়িত দিন। শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রতি অবিচারের অবসান ঘটানোর সূতিকাগার বলা হয় এই দিনটিকে।

প্রায় ১৫০ বছর আগে শ্রমিকদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে সূচিত হয় শ্রমজীবী মানুষের বিজয়ের ধারা। সেই বিজয়ের ধারায় উদ্ভাসিত বর্তমান বিশ্বের সকল প্রান্তের প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষ।

এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর যথাযথ মর্যাদায় ও গুরুত্বের সঙ্গে সারাবিশ্বে উদযাপিত হয়ে আসছে মহান মে দিবস। পৃথিবীর মেহনতি মানুষের কাছে এ দিনটি একদিকে যেমন তাৎপর্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আবেগ ও প্রেরণার জায়গাও।

এ দিনটির মাধ্যমে শ্রমিকরা কাজের প্রকৃত স্বীকৃতি পেয়েছে। তাই ঐতিহাসিক মে দিবস বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষার দিন। তাদের ন্যায্য পাওনা আদায় তথা অধিকার আদায়ের দিন। শ্রমিকদের অস্তিত্ব ঘোষণার দিন।

মে দিবসের প্রেক্ষাপট

একজন শ্রমিকের সবচেয়ে বড় অধিকার বা দাবি হলো, তার শ্রমের যথোপযুক্ত পারিশ্রমিক লাভ করা। ১৯ শতকের গোরার দিকের কথা। তখন দেশে দেশে পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের কষ্টের সীমা ছিল না। মালিকেরা নগণ্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে দরিদ্র মানুষের শ্রম কিনে নিতেন। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হাড়ভাঙা শ্রম দিয়েও শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য মূল্য পেতেন না। মালিকেরা উপযুক্ত মজুরি তো দিতেনই না, বরং তারা শ্রমিকের সুবিধা-অসুবিধা, মানবিক অধিকার ও দুঃখ-কষ্ট পর্যন্ত বুঝতে চাইতেন না। মালিকেরা তাদের অধীনস্থ শ্রমিককে দাসদাসীর মতো মনে করতেন। আর তাদের সঙ্গে পশুর মতো ব্যবহার করতেন। সুযোগ পেলেই মালিকেরা শ্রমিকের ওপর নানা শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন চালাতেন। বলতে গেলে শ্রমিকের ন্যূনতম অধিকারও তখন রক্ষিত হতো না।

শ্রমিকের শরীরের ঘাম আর সীমাহীন শ্রমের বিনিময়ে মালিকরা অর্জন করতেন সীমাহীন সম্পদ। অথচ তার ছিটেফোঁটাও শ্রমিকের ভাগ্যে জুটত না। সপ্তাহে ছয় দিনের প্রতিদিনই গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার অমানবিক পরিশ্রম করতেন শ্রমিকরা। অথচ, তার বিপরীতে মিলত নগণ্য মজুরি। যা দিয়ে শ্রমিকের সংসার চলত না, স্বজনের মুখে তিন বেলা খাবার তুলে দেওয়া সম্ভব হতো না। পরিবার-পরিজন নিয়ে শ্রমিকের জীবন ছিল দুর্বিষহ। অনিরাপদ পরিবেশে রোগ-ব্যাধি, আঘাত-মৃত্যুই ছিল তাদের নির্মম সঙ্গী।

শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার ও দাবিদাওয়ার কথা মন খুলে মালিক সমাজকে বলতে পারতেন না। এমনকি তাদের পক্ষ হয়ে বলার মতো কেউ ছিল না। কাজের যেমন সুনির্দিষ্ট সময় ছিল না, তেমনি ছিল না সাপ্তাহিক ও অন্যান্য ছুটি এবং চাকরির স্থায়িত্ব ও মজুরিসহ সব বিষয় ছিল মালিকের ইচ্ছাধীন বিষয়। তখন নির্ধারিত কোনো ছুটি ছিল না, বেতন বা মজুরির কোনো স্কেল বা পরিমাণ ছিল না, চরম বিপদের দিনেও শ্রমিকরা ছুটি পেতেন না। দায়িত্বপালন কালে দুর্ঘটনায় কারো মৃত্যু ঘটলে তার পরিবারকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হতো না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দিন-রাতে প্রায়ই ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করতেন তারা। শ্রমিকরা তাদের দাবি দাওয়ার কথা বললে মালিকরা তাদের ওপর ক্ষেপে যেতেন, এমনকি মালিকদের ভাড়াটে মাস্তানরা তাদের ওপর জুলুম করতেন। মালিকরা শ্রমিকদের কলুর বলদের মতো খাটাতো। তাদের ওপর অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দিতেন। এতে শোষণ-নিপীড়ন ও বঞ্চনাই শ্রমিকের পাওনা হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে মালিকের সীমাহীন অনাচার, অর্থলিপ্সা ও একপাক্ষিক নীতির ফলে শ্রমিকদের মনে জমতে শুরু করে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও দ্রোহ। এমন অত্যাচার যখন তাদের ওপর চলছিল তখন শ্রমিকরা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে।

প্রথম দিকে তাদের প্রতিবাদ করার সাহস ছিল না। ধীরে ধীরে শ্রমিকরা সব শ্রেণির শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করতে শুরু করলো। তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রথমে ১০ ঘণ্টা কাজের দাবি ও তাদের ন্যায্য অধিকারের জন্য আন্দোলন করলো। বিশ্বের মধ্যে প্রথম ‘ট্রেড ইউনিয়ন ফিলাডেলফিয়ার মেকানিক ইউনিয়ন’ আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। তাদের এ দাবি মালিকপক্ষও মেনে নেন। কিন্তু, মুখ দিয়ে মেনে নিলেও বাস্তবে শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন অব্যাহতই রাখে।

মে দিবসের ইতিহাস

১৮৬০ সালে শ্রমিকরাই মজুরি না কেটে দৈনিক ৮ ঘণ্টা শ্রম নির্ধারণের প্রথম দাবি জানায়। কিন্তু কোনো শ্রমিক সংগঠন ছিল না বলে এই দাবি জোরালো করা সম্ভব হয়নি। এই সময় সমাজতন্ত্র শ্রমজীবী মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে। শ্রমিকরা বুঝতে পারে, বণিক ও মালিক শ্রেণির এই রক্ত শোষণ নীতির বিরুদ্ধে তাদের সংগঠিত হতে হবে। ১৮৮০-৮১ সালের দিকে শ্রমিকরা প্রতিষ্ঠা করে Federation of Organized Trades and Labor Unions of the United States and Canada। যা ১৮৮৬ সালে নাম পরিবর্তন করে করা হয় American Federation of Labor। এই সংঘের মাধ্যমে শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে শক্তি অর্জন করতে থাকে। ১৮৮৪ সালে সংঘটি ‘৮ ঘণ্টা দৈনিক মজুরি’ নির্ধারণের প্রস্তাব পাশ করে। মালিক ও বণিক শ্রেণিকে এই প্রস্তাব কার্যকরের জন্য ১৮৮৬ সালের ১ মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। তারা এই সময়ের মধ্যে সংঘের আওতাধীন সব শ্রমিক সংগঠনকে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানায়। প্রথম দিকে অনেকেই একে অবাস্তব অভিলাষ, অতি সংস্কারের উচ্চাকাঙ্খা বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে। কিন্তু বণিক-মালিক শ্রেণির কোনো ধরনের সাড়া না পেয়ে শ্রমিকরা প্রতিবাদী ও প্রস্তাব বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে থাকে।

এ সময় এলার্ম নামক একটি পত্রিকার কলাম- ‘একজন শ্রমিক ৮ ঘণ্টা কাজ করুক কিংবা ১০ ঘণ্টাই করুক, সে দাসই’ যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালে। শ্রমিক সংগঠনদের সঙ্গে বিভিন্ন সমাজতন্ত্রপন্থী দলও একাত্মতা জানায়। পয়লা মে কে ঘিরে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের আয়োজন চলতে থাকে। আর শিকাগো হয়ে ওঠে এই প্রতিবাদ প্রতিরোধের কেন্দ্রস্থল।

১লা মে এগিয়ে আসতে লাগল। মালিক-বণিক শ্রেণি অবধারিতভাবে ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। ১৮৭৭ সালে শ্রমিকরা একবার রেলপথ অবরোধ করলে পুলিশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেনারা তাদের ওপর বর্বর আক্রমণ চালায়। ঠিক একইভাবে ১লা মে কে মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রস্তুতি চলতে থাকে। পুলিশ ও জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা শিকাগো সরকারকে অস্ত্র সংগ্রহে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে। ধর্মঘট আহ্বানকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য শিকাগো বানিজ্যিক ক্লাব ইলিনয় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে দুই হাজার ডলারের মেশিন গান কিনে দেয়। ১লা মে সমগ্র যুক্ত্ররাষ্ট্রে অগণিত শ্রমিক তাদের কাজ ফেলে এদিন রাস্তায় নেমে আসে। শিকাগোতে শ্রমিক ধর্মঘট আহ্বান করা হয়, প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক কাজ ফেলে শহরের কেন্দ্রস্থলে সমবেত হয়।

অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা, মিছিল-মিটিং, ধর্মঘট, বিপ্লবী আন্দোলনের হুমকি সবকিছুই মিলে ১লা মে উত্তাল হয়ে ওঠে। পার্সন্স, জোয়ান মোস্ট, আগস্ট স্পীজ, লুই লিং সহ আরো অনেকেই শ্রমিকদের মাঝে পথিকৃত হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে আরো শ্রমিক কাজ ফেলে আন্দোলনে যোগ দেয়। আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখে।

৩ মে (কারো কারো মতে ৪ মে) ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হে-মার্কেট বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকগণ মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। আগস্ট স্পীজ জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলছিলেন। হঠাৎ দূরে দাঁড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরণ ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হয় এবং ১১ জন আহত হয়, পরে আরো ৬ জন মারা যায়। পুলিশ বাহিনীও শ্রমিকদের ওপর অতর্কিত হামলা শুরু করে, যা সঙ্গে সঙ্গেই রায়টের রূপ নেয়। রায়টে ১১ জন শ্রমিক শহিদ হন। পুলিশ হত্যা মামলায় আগস্ট স্পীজসহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। ১৮৮৬ সালের ৯ অক্টোবর বিচারের রায়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো।

কিন্তু এমন রায় মেনে নিতে পারেননি শ্রমিক নেতাদের পরিবার। তারা রায়ের প্রতিবাদ করলেন, সমাবেশ করলেন, মিছিল, বক্তৃতা দিলেন। দেশ-বিদেশের সরকারের কাছে সাহায্য চাইলেন। কিন্তু তাদের প্রতিবাদ কোনো কাজে এল না। শ্রমিক নেতাদের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ হলো না, বরং আবেদন অগৃহীত হয়ে ফাঁসির রায় অব্যাহত রইল। শ্রমিক নেতাদের দেখার জন্য তাদের পরিবারের সদস্যদেরও কোনো সুযোগ দেওয়া হলো না। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুই লিং একদিন পূর্বেই কারাভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন, অন্য একজনের পনের বছরের কারাদণ্ড হয়। ফাঁসির মঞ্চে আরোহনের আগে আগস্ট স্পীজ বলেছিলেন, ‘আজ আমাদের এই নিঃশব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে।’ ২৬শে জুন, ১৮৯৩ ইলিনয়ের গভর্ণর অভিযুক্ত আট জনকেই নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন এবং রায়টের হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। আর অজ্ঞাত সেই বোমা বিস্ফোরণকারীর পরিচয় কখনোই প্রকাশ পায়নি।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস 

শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করার দাবি অফিসিয়াল স্বীকৃতি পায়। শ্রমিক নেতাদের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ১৮৮৯ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে মে দিবসকে আর্ন্তজাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের উক্ত গৌরবময় অধ্যায়কে স্মরণ করে ১৮৯০ সাল থেকে প্রতি বছরের ১লা মে বিশ্বব্যাপী পালন হয়ে আসছে ‘মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’। ১৮৯০ সালের ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিষ্ট কংগ্রেসে’ ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখন থেকে বিভিন্ন দেশে দিনটি শ্রমিক শ্রেণি কর্তৃক উদযাপিত হয়ে আসছে। রাশিয়াসহ পরবর্তীকালে আরো কয়েকটি দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবসংঘটিত হওয়ার পর মে দিবস এক বিশেষ তাৎপর্য অর্জন করে। জাতিসংঘে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শাখা হিসেবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইত্রলও প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে শ্রমিকদের অধিকারসমূহ স্বীকৃতি লাভ করে। এবং সব দেশে শিল্প মালিক ও শ্রমিকদের তা মেনে চলার আহ্বান জানায়।

১৮৮৯ সালের প্যারিস সম্মেলনে স্বীকৃতির পর থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মে দিবস উদযাপন শুরু হয়। ১৮৯০ সালে গ্রেট ব্রিটেনের হাউড পার্কে বিশাল সমারোহে উদযাপন করা হয় প্রথম আন্তর্জাতিক মে দিবস। যুক্তরাষ্ট্রেও প্রথম মে দিবস পালন করা হয় একই বছর। ফ্রান্সে দিবসটি পালন করা হয় শ্রমিকদের বিশাল মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে। রাশিয়ায় প্রথম ১৮৯৬ সালে এবং চীনে ১৯২৪ সালে আন্তর্জাতিক মে দিবস উদযাপন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পরে এই রীতি ছড়িয়ে যায় প্রতিটি মহাদেশে। বর্তমানে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা ও ওশেনিয়া মহাদেশের প্রায় প্রতিটি উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত ছোট বড় সব দেশেই প্রতি বছর পালিত হয় আন্তর্জাতিক মে দিবস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here