পবিত্র রমজানে বদর যুদ্ধে মুসলমানদের অলৌকিক বিজয়

নিজস্ব প্রতিনিধিঃআজ ১৭ রমজান। ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধ ২ হিজরির ১৭ রমজান মদিনার মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে সংঘটিত হয়। বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর নবুয়তের ঘোষণা প্রকাশ হয় রমজান মাসেই। এ মাসেই পবিত্র কোরআন নাজিল হয়।

বদর যুদ্ধ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। বদরের যুদ্ধে মুসলমান বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিলো ৩১৩ জন। এই ৩১৩ জনকে বদরী সাহাবি বলা হয়। এদের মধ্যে ৮০ জন ছিলো মুহাজির সাহাবি ও ২৩৩ জন ছিলো আনসারী সাহাবি।

বদর যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনীর ছিল এক হাজার সশস্ত্র সেনা। এই বাহিনীতে একশটি ঘোড়া ও সাতশটি উট ছিল। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল উতবা, শায়বা ও ওয়ালিদ। কুরাইশরা চারশ পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে মদিনার উপকণ্ঠে এসে আক্রমণ করল।

নবীজি (সা.) মদিনার পবিত্রতা ও নিরাপত্তা রক্ষার খাতিরে এবং নারী ও শিশুদের হেফাজতের কথা ভেবে মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে মদিনা থেকে দেড় শ কিলোমিটার দূরত্বে বদরে এসে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিলেন।

এই আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবি ছিলেন মাত্র ৩১৩ জন। সঙ্গে দুটি ঘোড়া ও সত্তরটি উট। সাহাবারা মদিনা থেকে তিন দিনে বদর গিরি প্রান্তরে পৌঁছালেন। নেতৃত্বে ছিলেন নবীজি (সা.)–এর চাচা আবুল ফজল আব্বাস (রা.) ও চাচা আমির হামজা (রা.)।

বদর যুদ্ধে মুসলমানরা অলৌকিক বিজয় লাভ করেন এবং কাফেররা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এতে কুরাইশদের ৭০ জন নিহত হয় এবং ৭০ জন বন্দী হয়। মুসলমানদের ১৪ জন সাহাবি শহীদ হন।

বদর যুদ্ধে শাহাদাত বরণকারী ১৪ জন সাহাবির নাম:

১) উমায়ের ইবনে আবি ওক্কাস (রা.)

২) যুশ শিমালাইন বিন আব্দে আমর (রা.)

৩) সাফওয়ান বিন ওয়াহব (রা.)

৪) মাহজা ইবনে সালেহ (রা.)

৫) আকীল ইবনু বুকাইর (রা.)

৬) উবাইদা ইবনুল হারিছ (রা.)

৭) সা‘দ ইবনে খাইছামা (রা.)

৮) মুবাশশির ইবনুল মুনযির (রা.)

৯) হারেছা বিন সুরাকা (রা.)

১০) রাফে ইবনে মুআল্লা (রা.)

১১) উমাইর ইবনুল হুমাম (রা.)

১২) ইয়াজীদ ইবনুল হারিছ (রা.)

১৩) মুআওয়িয ইবনুল হারিছ (রা.)

১৪) আওফ ইবনুল হারিছ (রা.)

রাসূল (সা.) বদরী সাহাবিদের প্রতি স্পষ্ট ভাষায় আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেনঃ বদরী সাহাবাদের জন্য জাহান্নাম হারাম। (মুসলিম শরীফ : ২৪৯৫)

অন্য হাদিসে বর্ণিত, আল্লাহ তায়ালা তাদের আগে পরের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। (মুস্তাদরাক : ৪/৮৭

যখন যুদ্ধ শেষ হলো, নবীজি (সা.) প্রথমে ঘোষণা করলেন, ‘তাদের হত্যা কোরো না।’ বদরের বন্দীদের সহজ শর্তে মুক্তিও দেওয়া হলো। তাদের অনেকেই ইসলামের অনুপম আদর্শে মুগ্ধ হয়ে মুসলমান হলো। মুক্তিপণের মূল্য ছিল ২ হাজার দিরহাম থেকে ১২ হাজার দিরহাম। গরিবদের বিনা পণেই মুক্তি দেওয়া হয়। শিক্ষিত বন্দীদের শিক্ষার বিনিময়ে মুক্তি দেওয়া হয়। একজন বন্দী ১০টি শিশুকে লেখাপড়া শেখালে তাকে মুক্তি দিলেন।

ইতিহাসের অনন্য নজির স্থাপন করা হয় বদর যুদ্ধে। ‘বদরের বন্দীদের প্রতি হজরত যে আদর্শ ব্যবহার দেখালেন, জগতের ইতিহাসে তার তুলনা মেলে না। হজরতের আদেশে মদিনায় আনসার এবং মুহাজিরগণ সাধ্যানুসারে বন্দীদিগকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়ে আপন আপন গৃহে স্থান দিলেন এবং আত্মীয় কুটুমের মতোই তাদের সহিত ব্যবহার করলেন।’

বন্দীদের আরজি, ‘মদিনাবাসীদিগের ওপর আল্লাহর রহমত নাজিল হোক। তারা আমাদিগকে উটে চড়তে দিয়ে নিজেরা পায়ে হেঁটে গেছে, নিজেরা শুষ্ক খেজুর খেয়ে আমাদিগকে রুটি খেতে দিয়েছে।’ (বিশ্বনবী, গোলাম মোস্তফা, পৃষ্ঠা: ১৬০)।

বদরের ঐতিহাসিক যুদ্ধে সাহস, ত্যাগ আর ঈমানী শক্তির বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী সাহাবিদেরকে আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here